kalerkantho


কেমন হতে চলেছে তথ্যপ্রযুক্তি জগতের অদূর ভবিষ্যত?

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ২১:০৬



কেমন হতে চলেছে তথ্যপ্রযুক্তি জগতের অদূর ভবিষ্যত?

যুক্তরাষ্ট্রের লাস ভেগাসে চলতি বছরের জানুয়ারির নয় তারিখ থেকে বারো তারিখে হয়ে গেলো ইলেকট্রনিকস জগতের সবচেয়ে বড় প্রদর্শনী কনজিউমার ইলেকট্রনিকস শো। হরেক রকমের চোখ ধাঁধানো ইলেকট্রনিকস পণ্য নিয়ে হাজির হয়েছিলো পৃথিবীর অন্যতম বড় বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো। এই মেলাতেই আন্দাজ পাওয়া যায় প্রযুক্তি জগতের ভবিষ্যত কেমন হতে যাচ্ছে। নতুন টিভি, নতুন গাড়ি, নতুন সেলফোন, এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার টেবিল টেনিস প্লেয়ার, কী ছিল না সেখানে!

একদম নতুন একটা ফোন নিয়ে এসেছে চাইনিজ কোম্পানি ভিভো। অন্যান্য ফোনের সাথে এটার পার্থক্য হচ্ছে, অনেকদিন ধরে গুঞ্জন শোনা গেলেও এই প্রথমবারের মত স্ক্রিনের নিচেই ফিঙ্গারপ্রিন্ট সেন্সরের সফল বাস্তবায়ন করা হয়েছে। স্মার্টফোন দিনদিন স্মার্ট হচ্ছে। এবং নিঃসন্দেহে আগামীতে এই অন-স্ক্রিন ফিঙ্গারপ্রিন্ট সেন্সরসহ বেশ কিছু ফোন দেখা যাবে।

অনেক অদ্ভুত ধারণার প্রযুক্তিও পাওয়া যায় এখানে। কোম্পানিগুলো এমন করে থাকে, শুধুমাত্র এটা দেখানোর জন্য যে, এমন কিছুও সম্ভব। যেমন, এবারের মেলায় রেজর নিয়ে এসেছে এক বিশাল কীবোর্ড! এই কীবোর্ড হয়তো কখনো কেউ ব্যবহার করবে না। কিন্তু দেখলে একটু করে হলেও তব্দা খেতেই হবে। শুধু এটাই নয়, একদম স্বচ্ছ একটা কীবোর্ডও ওই মেলায় দেখা গেছে, যা আবার ভাঁজও করা যায়!

রেজর এমন একটা ল্যাপটপ নিয়ে এসেছে যাতে কোনো প্রসেসর বা র‍্যাম নেই। তবে সাধারণত যেখানে মাউস প্যাড থাকে, সেখানে একটা ফাঁকা জায়গা আছে। এখানে একটা ফোন বসিয়ে দিতে হয়। গেমিং ল্যাপটপের জগতে রেজর বিশ্ববিখ্যাত হলেও ফোনের জগতে রেজর একদমই নতুন। এখন পর্যন্ত ওরা একটাই ফোন বাজারে ছেড়েছে, তাও মাত্র কয়েকমাস হলো। সেই রেজর ফোনটা এখানে একদম নিখুঁতভাবে বসে যাবে। এরপর ফোনের প্রসেসর আর র‍্যাম দিয়েই চলবে এই ল্যাপটপ। কেউ আসলে জানে না, এই জিনিস আসলেই কখনো বাজারে পাওয়া যাবে কিনা। কারণ এই মেলা আসলে শুধুমাত্র নতুন প্রযুক্তির বাস্তবায়ন প্রদর্শনীর জন্য, সবার চোখ কপালে তুলে দেয়ার জন্য। আর সত্যিই, এই প্রযুক্তি আসলেই চোখ কপালে তুলে দেয়।

এই মেলার বাইরেও বেশ কিছু চমৎকার ঘটনা ঘটেছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির জগতে। ইলন মাস্কের কোম্পানি টেসলার দীর্ঘ প্রতীক্ষিত সৌরছাদের প্রোডাকশন শুরু হয়েছে বাফেলোতে। যারা ভাবছেন, এটা দিয়ে আসলে ছাদের ওপরে সৌর প্যানেল লাগানো বোঝাচ্ছে, তারা ভুল ভাবছেন। এটা আসলে সত্যিকারের ছাদ! যারা নতুন করে ছাদ এবং ছাদের ওপরে সোলার প্যানেল লাগানোর কথা ভাবছেন, তাদের জন্য এটা সুন্দর সমাধান হতে পারে। কারণ, ঐ দুটোর যৌথ খরচের চেয়ে এই সৌরছাদের খরচ কম পড়বে।

গত সপ্তাহে অস্ট্রেলিয়ার আকাশে উড়েছে এমন একটা প্লেন যার মধ্যে কোনো জীবাশ্ম জ্বালানি বা সাধারণ জেট ফুয়েল নেই। এটা পুরোপুরি বিদ্যুৎ দিয়ে চলবে। বিদ্যুৎ নিঃসন্দেহে জীবাশ্ম জ্বালানির চেয়ে অনেক বেশি পরিবেশবান্ধব। তবে এখনো প্রযুক্তি সেই জায়গায় পৌঁছায়নি, যাতে বৈদ্যুতিক প্লেন দিয়ে বিশাল দূরত্ব অতিক্রম করা যাবে। ধীরে ধীরে আমরা হয়তো সেদিনের কাছাকাছি পৌঁছাচ্ছি। এর জন্য প্রয়োজন প্রচুর পরিমাণে বিদ্যুৎ।

এবং ব্রিটেন সম্প্রতি বিদ্যুতের জগতে অভাবনীয় একটা সাফল্য দেখিয়েছে। ওদের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার যতটুকু কয়লা বিদ্যুৎ থেকে আসে, তার চেয়ে দ্বিগুণ আসে বায়ু থেকে, উইন্ড মিল থেকে। উইন্ড মিল থেকে আসা বায়ু বিদ্যুৎ বলতে গেলে সম্পূর্ণ দূষণমুক্ত, অন্যদিকে কয়লা থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ পরিবেশের জন্য বেশ ক্ষতিকর। নেদারল্যান্ড তো তাদের দেশের সকল ইলেকট্রিক ট্রেনের জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে বায়ুচালিত কলের মাধ্যমে।

গত সপ্তাহে বিজ্ঞানীরা ঘোষণা দিয়েছেন যে, ২০১৮ সালের মধ্যেই তারা প্রথমবারের মত কৃষ্ণগহ্বরের ছবি তুলতে সক্ষম হতে পারেন। এতদিন পর্যন্ত আপনারা ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণগহ্বরের যতগুলো ছবি দেখেছেন, সবগুলোই আসলে বিজ্ঞানীদের ধারণা অনুযায়ী আঁকা শিল্পীর কল্পনা। যেহেতু কৃষ্ণগহ্বরের ভেতর থেকে কিছুই বেরোয় না, এমনকি আলোও না, তাই এটার ছবি তোলা এতদিন পর্যন্ত অসম্ভব ছিলো। নতুন একটা টেলিস্কোপ, যার নাম ইভেন্ট হরাইজন, হয়তো সেটা পাল্টে দিতে যাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের এমআইটি বিশ্ববিদ্যালয় একটা নতুন যৌগের প্রদর্শনী করেছে যা লোহার চেয়ে ১০% বেশি শক্তিশালী, কিন্তু এটার ঘনত্ব লোহার চেয়ে ৯৫% কম। বেশ অভাবনীয় ব্যাপার! আপনারা সবাই হয়তো গত কয়েক বছরে গ্রাফিন নিয়ে বেশ খানিকটা মাতামাতি শুনে থাকবেন। নতুন এই যৌগটি গ্রাফিনের চেয়েও শক্তিশালী।

ইউরোপের ফ্রান্সে অবস্থিত ভূগর্ভস্থ লার্জ হেড্রন কোলাইডারে (LHC) তীব্রগতিতে পারমাণবিক কণাকে আঘাত করে পরীক্ষা করা হয়ে থাকে। সেসব সংঘর্ষ থেকেও চমৎকার সব নতুন কণা বা ঘটনার উদ্ভব ঘটে। যেমন গত বছরেই তারা এভাবে আবিষ্কার করেছে পাঁচটি নতুন কণিকাকে। অণু-পরমাণুর চেয়েও অতিক্ষুদ্র এই কোয়ান্টাম বলবিদ্যার জগতেও আরেক মহাবিশ্বের রহস্য লুকিয়ে আছে। এখানে চলে অন্য নিয়ম, অন্য ঘটনা।

যেমন ফোটন মাঝে কণার মত আচরণ করে, আবার মাঝে মাঝে তরঙ্গের মত। ফোটনের বা আলোর এই কণা-তরঙ্গ দ্বৈততার কথা তো সবাই জানেন নিশ্চয়ই। কিন্তু এটার রঙ নিয়ে কোনো বিতর্ক ছিলো না। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা একটা ফোটন তৈরি করেছেন যেটার মধ্যে কোনো সন্দেহ ছাড়াই দুটো রঙ আছে, অর্থাৎ দুটো তরঙ্গদৈর্ঘ্য আছে। চমৎকার, তাই না?

আজকাল স্মার্টফোনের কল্যাণে ভিডিও কলের সাথে তো সবাই পরিচিত আছেন। গত বছর ২৯ সেপ্টেম্বরে চীন এবং অস্ট্রিয়ার বিজ্ঞান একাডেমির বিজ্ঞানীরা তেমনই এক ভিডিও কল করলেন একে অপরকে। তবে এই ভিডিও কলটি করা হলো কোয়ান্টাম প্রযুক্তি ব্যবহার করে। কোয়ান্টাম জগতের অনিশ্চয়তার কারণে তথ্যগুলো পুরোপুরি সংরক্ষিত অবস্থায় এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাচ্ছিল। অর্থাৎ বাইরে থেকে কেউ যতই চেষ্টা করুক না কেন, এই কলের তথ্য চুরি করতে পারবে না। এমন নিরাপদ যোগাযোগই হবে ভবিষ্যতের মামুলি ব্যাপার।

সূত্র: লাইভ সায়েন্স


মন্তব্য