প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে অনেক সহজ করে দিয়েছে। তবে সুবিধার সঙ্গে আছে অনেক বিপদের হাতছানিও। প্রযুক্তির হাত ধরেই আমাদের গোপন ঘরে ঢুকে পড়ে চোর, হাতিয়ে নেয় টাকা-পয়সা। বিশ্বজুড়েই হ্যাকিং একটা বড় সমস্যা। ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিভিন্ন একাউন্ট ও ফোন নাম্বার হ্যাক হওয়ার ঘটনা এখন অহরহ। আগে দরজা ভেঙে চোর আসত ঘরে। এখন চোর নিজের ঘরে বসেই হাতিয়ে নিতে পারে আপনার তথ্য, আর সেই তথ্য ব্যবহার করে আপনার অর্থ। সাইবার যুগে চোরদের নামও এখন সাইবার চোর মানে সাইবার ক্রিমিনাল। তবে সাইবার চুরি করাটা অত সহজ নয়। আরেকজনের ফোন বা স্মার্ট ডিভাইস হ্যাক করতেও প্রতিভা লাগে। বলা যায় প্রতিভার অপব্যবহার করতে হয়।
বিশ্বজুড়ে অনেক প্রতিভাবান ড্রপআউটের গল্প অনুপ্রাণিত করে অনেককে। তেমন না হলেও ভারতে এক প্রতিভাবান ড্রপআউটের সন্ধান মিলেছে। তবে নিজের প্রতিভা সে ভালো কাজে না লাগিয়ে চুরির কাজে ব্যবহার করেছে। ১৮ বছর বয়সী রোহিত বীরেন্দ্র সিং শাক্য কলেজে ভর্তি হলেও শেষ করেনি। এখন তার পেশা হলো নকল ব্যাংকিং অ্যাপ্লিকেশন ও ম্যালওয়ার যুক্ত এপিকে ফাইল বানানো ও দেশজুড়ে সাইবার অপরাধীদের কাছে তা বিক্রি করা।
তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, অভিযুক্ত রোহিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং টেলিগ্রাম আপ ব্যবহার করে এমন জটিল ও অত্যাধুনিক টুল তৈরি করতো, যা বড় ধরণের সাইবার জালিয়াতিতে ব্যবহৃত হতো। এখন পুলিশের হাতে ধরা পড়লেও ১৬ বছর বয়স থেকেই রোহিত এআই টুল এবং টেলিগ্রামের সাহায্যে এই ক্ষতিকারক এপিকে ফাইলগুলো বানানো শুরু করে। এই অ্যাপগুলো যেকোনো মোবাইল ফোন হ্যাক করতে এবং সংবেদনশীল তথ্য চুরি করতে পারতো। তদন্তে পুলিশ জানতে পেরেছে, ঝাড়খণ্ডের জামতারা, হরিয়ানা এবং রাজস্থানের বেশ কয়েকটি সাইবার অপরাধী চক্র তার কাছ থেকে এই ভাইরাসযুক্ত অ্যাপ্লিকেশনগুলো কিনত।
ভারতের গুজরাটের সুরাটে দায়ের হওয়া একটি সাইবার জালিয়াতি মামলার তদন্ত করতে গিয়ে এই চক্রের সন্ধান পায় পুলিশ। ২০২৬ সালের মে মাসে এক ভুক্তভোগী হোয়াটসঅ্যাপে একটি এপিকে ফাইল পান, যা দেখতে হুবহু পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাংকের অফিসিয়াল অ্যাপ 'পিএনবি ওয়ান’এর মতো ছিল। সেটিকে আসল ভেবে ভুক্তভোগী অ্যাপটি তার মোবাইলে ডাউনলোড ও ইনস্টল করেন। ইনস্টল করার পরপরই তার মোবাইল ফোনটি হ্যাক হয়ে যায় এবং মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে প্রাইম কো-অপারেটিভ ব্যাংকে থাকা তার একাউন্ট থেকে ৫ লাখ টাকা ইউনিয়ন ব্যাংকের একটি একাউন্টে সরিয়ে নেওয়া হয়।
অভিযোগ পাওয়ার পর সুরাট সাইবার ক্রাইম সেল তদন্ত শুরু করে। এই তদন্তের সূত্র ধরেই পুলিশ মূল হোতার সন্ধান পায়। সাইবার ক্রাইম অফিসার এবং আইটি বিশেষজ্ঞদের একটি দল কানপুরের একটি হোটেলে অভিযান চালিয়ে রোহিতকে গ্রেফতার করে। পুলিশ তার ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন এবং অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইস জব্দ করেছে। জিজ্ঞাসাবাদে তদন্তকারীরা জানতে পেরেছে, রোহিত মূলত দুই ধরণের অ্যাপ্লিকেশন তৈরি করত। প্রথম অ্যাপটি ভুক্তভোগীর ফোনে ইনস্টল করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছিল, আর দ্বিতীয়টি কাজ করত 'অ্যাডমিন অ্যাপ্লিকেশন' হিসেবে। এই অ্যাডমিন অ্যাপের মাধ্যমে সাইবার অপরাধীরা রিয়েল-টাইমে ভুক্তভোগীর মোবাইলের ওটিপি, ব্যাংকিং তথ্য এবং অন্যান্য গোপনীয় বিষয় দেখতে পেতো।
তদন্তে তার এই ব্যবসার মডেলটিও সামনে এসেছে। পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্ত রোহিত একটি সাবস্ক্রিপশন-ভিত্তিক সিস্টেমে কাজ করত। সফটওয়্যারটি প্রথমবার সেটআপ করার জন্য সে ১৫ হাজার রুপি নিতো। পরবর্তীতে মাসিক চার্জ ছিল ১৫ হাজার রুপি করে। তদন্তকারীদের মতে, সে গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী ব্যাংক, সরকারি দপ্তর এবং বড় বড় কোম্পানির হুবহু নকল অ্যাপ্লিকেশন তৈরি করে দিত। এর মধ্যে পিএনবি, এসবিআই, অ্যাক্সিস ব্যাংক, ইউসিও ব্যাংক, বিগ বাস্কেট, আমেরিকান এক্সপ্রেস’এর ভুয়া অ্যাপ্লিকেশন ও পেমেন্ট লিঙ্ক ছিল, যা সে সাইবার অপরাধী চক্রগুলোর কাছে সরবরাহ করত।
পুলিশ জানিয়েছে, এই চক্রের সঙ্গে জড়িত অন্যান্য ব্যক্তিদের চিহ্নিত ও গ্রেফতার করার চেষ্টা চলছে।