টানা বৃষ্টি ও পাহাড় থেকে নেমে আসা পানির ঢলে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার সোনাইছড়ি এলাকায় ২০০টিরও বেশি বাড়িঘর প্লাবিত হয়েছে। এই বিপর্যয়ের জন্য স্থানীয় বাসিন্দারা সীতাকুণ্ডে অবস্থিত আবুল খায়ের স্টিল মিলকে দায়ী করছেন।
ভুক্তভোগী মানুষের অভিযোগ, কম্পানিটি তাদের শিল্পাঞ্চলের চারপাশের প্রাকৃতিক খাল ও জলাধারের গতিপথ বদলে দিয়েছে এবং পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ করে দিয়েছে। এর ফলে পাহাড়ের পানি সরাসরি লোকালয়ে ঢুকে পড়েছে।
এদিকে এই জলাবদ্ধতা দূর এবং ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা মেরামতের দাবিতে গতকাল রবিবার (১২ জুলাই) সকালে কারখানার প্রধান ফটকে ব্যারিকেড দিয়ে বিক্ষোভ করেছেন শত শত বাসিন্দা।
আরো পড়ুন
ছাতকে বিপৎসীমার ওপর সুরমা নদীর পানি
স্থানীয় গ্রামবাসীরা জানিয়েছেন, সারা রাতের ভারি বর্ষণে সোনাইছড়ি ও খামারবাড়ি গ্রামের বাগুলা বাজার থেকে খামারবাড়ি এলাকা পর্যন্ত প্রায় দেড়শ পরিবারের বাড়িঘর ডুবে গেছে। এর মধ্যে নিকটবর্তী ত্রিপুরা আদিবাসী বসতির আরো ৫০টি পরিবার চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক ঘরের ভেতরে কোমর পর্যন্ত পানি উঠে যাওয়ায় আসবাবপত্র, খাবার ও গৃহস্থালীর জিনিসপত্র নষ্ট হয়ে গেছে।
শনিবার (১১ জুলাই) রাত থেকে অনেক পরিবার রান্নার সুযোগ পাননি। তারা ঘরে আটকে আছেন। এর ওপর বন্যার পানি আর ঘন কাদার কারণে পুরো এলাকায় যাতায়াত ব্যবস্থা এক প্রকার ভেঙে পড়েছে।
এলাকাবাসীর স্পষ্ট অভিযোগ, এটি কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং একটি ‘মানবসৃষ্ট বন্যা’। অতীতে এই এলাকায় কখনো এমন বন্যা হয়নি। কিন্তু আবুল খায়ের শিল্প কমপ্লেক্সের সম্প্রসারণের সময় রেললাইনের পাশের একটি সরকারি খালের গতিপথ বদলে দেওয়া হয় এবং পানি যাওয়ার নালাগুলো মাটি দিয়ে ভরাট করে ফেলা হয়। এমনকি শনিবার রাতে কারখানার ভেতরে জমে থাকা বিপুল পরিমাণ পানি স্থানীয় জনবসতির দিকে ছেড়ে দিয়ে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ করে তোলা হয়েছে। এছাড়া কারখানার ভারী ট্রাক ও লরি চলাচলের কারণে সামনের প্রধান সড়কটিতে গভীর কাদার স্তর তৈরি হয়েছে, যা পথচারী ও স্কুলপড়ুয়া শিশুদের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। পাশাপাশি কারখানার কারণে শুষ্ক মৌসুমে বায়ুদূষণ এবং বর্ষায় বন্যার কারণে স্থানীয়দের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে।
আরো পড়ুন
অন্ধ্র প্রদেশে এক পরিবারে ৮৩ সদস্য, ছয় প্রজন্মের অনন্য ঐতিহ্য
দীর্ঘদিনের এই ক্ষোভ থেকে রবিবার ভোরে বাসিন্দারা কারখানার রাস্তায় ব্যারিকেড সৃষ্টি করলে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এর আগে এলাকাবাসী সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে লিখিতভাবে ১৫ দফা দাবি জমা দেন। এসব দাবির মধ্যে ছিল ভরাট করা খাল ও নালা খনন করা, পাহাড় কাটা বন্ধ করা, রাসায়নিক বর্জ্য ও ধূলিকণা ছড়ানো বন্ধ করা এবং স্থানীয়দের কর্মসংস্থানে অগ্রাধিকার দেওয়া।
যদিও সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফখরুল ইসলাম জানিয়েছেন, এই সংক্রান্ত কোনো লিখিত চিঠি এখনো তার দপ্তরে পৌঁছেনি। পরে অবরুদ্ধ কারখানার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে এসে দ্রুত পানি নিষ্কাশন এবং রাস্তা মেরামতের আশ্বাস দিলে বাসিন্দারা অবরোধ তুলে নেন। তবে স্থায়ী সমাধান না হলে আরও কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।
আরো পড়ুন
মাভাবিপ্রবিতে ‘সিইজিআইএস উপস্থাপিত ভবিষ্যৎ ডেটা বিশ্লেষক চ্যালেঞ্জ-২০২৬’ অনুষ্ঠিত
অন্যদিকে, সব অভিযোগ অস্বীকার করে আবুল খায়ের স্টিল প্ল্যান্টের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার ইমরুল কায়েস ভূঁইয়া বলেন, এটি তাদের কারণে সৃষ্ট কোনো মানবসৃষ্ট বন্যা নয়। অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে চট্টগ্রামের বিভিন্ন অঞ্চলের মতো সোনাইছড়িতে তাদের কারখানার ভেতরের অনেক অংশও পানিতে তলিয়ে গেছে। তবে খালের গতিপথ পরিবর্তন বা পুকুর ভরাটের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ নিয়ে কম্পানিটি আলাদা কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি।
এই বিষয়ে সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সত্যতা যাচাইয়ের জন্য ঘটনাস্থলে একটি তদন্ত দল পাঠানো হচ্ছে এবং কারখানার কারণে এই বন্যা হয়েছে বলে প্রমাণিত হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।