kalerkantho

বুধবার । ১৩ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৮ জুলাই ২০২১। ১৭ জিলহজ ১৪৪২

কারখানায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব শ্রমিক ও পরিবেশে

বিজয় কুমার মহাজন, হেড অব প্ল্যান্ট অপারেশন, এইচএমসিএল নিলয় বাংলাদেশ লিমিটেড

ফিরোজ গাজী, যশোর   

২১ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



কারখানায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব শ্রমিক ও পরিবেশে

শ্রমিক ও পরিবেশবান্ধব কারখানা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে যশোরে অবস্থিত হিরো মোটরসাইকেল উৎপাদন কারখানাটি। এটি যশোর সদর উপজেলার শাঁখারীঘাতিতে যশোর-খুলনা মহাসড়কের পাশে বিভিন্ন বৃক্ষের সমারোহে মনোরম পরিবেশে অবস্থিত। হিরো মটকর্প লিমিটেড ইন্ডিয়া ও নিলয় মোটরস লিমিটেড বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় এইচএমসিএল নিলয় বাংলাদেশ লিমিটেডের কারখানাটি। এখানে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির দ্বারা কঠোর মান নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে মোটরসাইকেল তৈরি হওয়ায় দেশের মানুষের কর্মসংস্থান ও এসব যন্ত্রপাতির ব্যবহার সম্পর্কে দক্ষ হচ্ছে।

পাশাপাশি আমদানীকৃত মোটরসাইকেলের সমমানের মোটরসাইকেল কম দামে কিনতে পেরে লাভবান হচ্ছেন গ্রাহকরাও। কারখানাটিতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে শ্রমিক নিরাপত্তা ও পরিবেশ রক্ষায়। ১৬ একর জায়গা নিয়ে বর্তমানে বাংলাদেশে মোটরসাইকেল উৎপাদনকারী কারখানা এটি। কারখানাটির রয়েছে তিনটি আইএসও সনদ। এরই মধ্যে কারখানাটি পরিবেশবান্ধব শিল্প-প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিভাগীয় পর্যায়ে ২০২০ সালে অর্জন করেছে পরিবেশ অধিদপ্তরের পুরস্কার। একই বছর এনার্জি সেভিংয়ে অর্জন করেছে বিভাগীয় পুরস্কার। রক্তদান ও এলাকার মানুষের স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া ছাড়াও প্রতিষ্ঠানটির রয়েছে বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ড। 

সম্প্রতি কারখানার বিভিন্ন ইউনিট ঘুরে দেখা যায়, ধাপে ধাপে এখানে তৈরি হচ্ছে হিরো মোটরসাইকেল। এসব ইউনিট ঘুরে দেখালেন প্রতিষ্ঠানটির দুই কর্মকর্তা। তাঁদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল কারখানার বিভিন্ন খুঁটিনাটি।

তাঁরা জানান, ২০১৭ সালের মাঝামাঝি থেকে মোটরসাইকেল উৎপাদন শুরু হয় এখানে। বর্তমানে শ্রমিক, কর্মকতা-কর্মচারী মিলিয়ে কর্মরত রয়েছেন ৪৬৫ জন। কারখানার গ্রিন এরিয়া রয়েছে ৩১ শতাংশ। পাঁচ হাজার গাছের সমারোহ এখানে। যাতে রয়েছে আম, জাম, লিচু, কমলাসহ বিভিন্ন ফলদ ও বনজ গাছ। রয়েছে শোভাবর্ধনকারী গাছ। এ ছাড়া রয়েছে বিভিন্ন সবজি, যা পরিবেশবান্ধব হাইড্রোফনিক পদ্ধতিতে মাটি ছাড়াই উৎপাদন হয়। এখানে উৎপাদিত সবজি পরিবেশন হয় শ্রমিক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের খাবার টেবিলে। কারখানাটির বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও চমৎকার। শিল্প বর্জ্যসহ সব ধরনের বর্জ্য রিসাইকেল করে আবার কারখানাতেই ব্যবহার করা হয়। যে কারণে এসব বর্জ্য থেকে নেই পরিবেশদূষণের আশঙ্কা। এমনকি কারখানায় কর্মরতদের পানের পানিও উৎপাদন হয় কারখানার ভেতরে। যে জন্য রয়েছে নিরাপদ পানি উৎপাদন ইউনিট। এনার্জি সেভিং ডিজাইনে তৈরি কারখানাটির রয়েছে ৫০ কিলোওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনসক্ষমতা। এখানে উৎপাদিত সৌরবিদ্যুৎ যখন কারখানায় ব্যবহার বন্ধ থাকে তখন সেই বিদ্যুৎ যোগ হয় জাতীয় গ্রিডে।

যশোরে অবস্থিত হিরো মোটরসাইকেল উৎপাদন কারখানা।        কালের কণ্ঠ

 

এরই মধ্যে কারখানাটির প্রাপ্ত আইএসও সনদ তিনটি। সেগুলো হলো কোয়ালিটি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (QMS 90001), পরিবেশ ব্যবস্থাপনা (EMS 14001) ও স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা (OH&SMS 45001)।

মোটরসাইকেল উৎপাদনে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহারের মাধ্যমে শ্রমিক নিরাপত্তার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কারনে কারখানাটিতে আজ পর্যন্ত কোনো শ্রমিকের প্রাণহানি বা অঙ্গহানির মতো বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি। শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে রয়েছে মেডিক্যাল ইউনিট। রয়েছে নিজস্ব অ্যাম্বুল্যান্স সুবিধা। প্রতিষ্ঠানটি কারখানার শ্রমিক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাশাপাশি এলাকার মানুষদেরও বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে থাকে। যেমন—এলাকার কেউ অসুস্থ হলে কারখানার নিজস্ব অ্যাম্বুল্যান্স দিয়ে সহায়তা, ফাস্টএইড দেওয়া, মহাসড়কের পাশে কারখানা হওয়ায় এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনা ঘটলে অ্যাম্বুল্যাসে আহতদের দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়াসহ বিভিন্ন ধরনের সহায়তা। থ্যালাসেমিয়া রোগীদের জন্য রক্তদানও করে থাকেন এই কারখানার শ্রমিক-কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

কথা হয় কারখানার ফ্রেম এসেম্বল বিভাগে কর্মরত শ্রমিক মো. বাবুল আনসারীর সঙ্গে। শুরু থেকেই তিনি সেখানে কর্মরত। তিনি বলেন, ‘এই কারখানায় কাজ করার অনেক সুবিধা। কাজের সুন্দর নিরাপদ পরিবেশ। আমিসহ আমার পরিবারের বীমা করা আছে। প্রভিডেন্ট ফান্ড, চিকিৎসা সুবিধা, ডিউটির সময় খাবারসহ অন্য অনেক সুযোগ-সুবিধা পাই আমি এই কারখানা থেকে। আগে অন্য কারখানাতেও আমি কাজ করেছি। তবে এখানে সুযোগ-সুবিধা অনেক বেশি। আমি এই কারখানাতেই সব সময় কাজ করতে চাই।’

আরেক শ্রমিক মো. নাজিম উদ্দিন বলেন, ‘এই কারখানায় আমি অনেক ভালো আছি। বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা তো পাইই। এমনকি কারখানার বিভিন্ন যে ফলের গাছ আছে, সেখান থেকে ফলের সমান ভাগ পর্যন্ত আমরা পাই। এই রকম পরিবেশ থাকার কারণে আমি এই কারখানা থেকে অন্য কারখানায় যেতে চাই না।’