kalerkantho

বৃহস্পতিবার ।  ১৯ মে ২০২২ । ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ১৭ শাওয়াল ১৪৪৩  

পিছুটান নেই, আছে অবলম্বন

মাসুদ পারভেজ   

১৭ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



পিছুটান নেই, আছে অবলম্বন

আন্দাজে ঢিল ছুড়ে লক্ষ্যভেদের চেষ্টার দিনগুলোই বোধ হয় ভালো ছিল। তখন জানা-বোঝার এত সুযোগই ছিল না কোনো। নেমে পড়তে হবে, তাই নেমে পড়েছিল বাংলাদেশও। তেমন কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই নেমে পড়ায় অন্ধকার দেখার ঝুঁকি ছিল বেশি।

বিজ্ঞাপন

সেই ঝুঁকির মধ্যেই অল্প হলেও দেখা দিয়েছিল সাফল্যের আলোক রেখা।

সেই রেখা পরে আরো উজ্জ্বল এবং স্পষ্টই হওয়ার কথা। যেহেতু সময়ে আরো বুঝে-শুনে এবং জেনে-বুঝে নেওয়ার অবারিত সুযোগ উন্মুক্ত ছিল, কিন্তু হলো উল্টো। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের অবস্থা হয়ে গেল বিস্তর পড়াশোনা করে পরীক্ষার হলে গিয়ে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যাওয়া সেই ছাত্রের মতো। যে উত্তর জানে, কিন্তু লিখতে পারে না। পারে না বলেই দিনের শেষে জোটে ফেল করা ছাত্রের তকমা। অথচ আন্দাজের ওপর উত্তরপত্র লিখে আসা সেই ছাত্র সব বিষয়ে হয়তো পাস করেনি, তবে একটিতে করেছিল।

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত এক বিষয়েই পাস করা সেই ছাত্রটি ২০০৭-এর বাংলাদেশ। তখনো আসরটির সঙ্গে ‘বিশ্বকাপ’ শব্দটি জুড়ে দেওয়া হয়নি। নাম ছিল ওয়ার্ল্ড টি-টোয়েন্টি। এর আগের বছরই মাত্র এই সংস্করণটি খেলতে শুরু করা দলের কাছে বড় কিছুর আশাও ছিল না তেমন। কুড়ি-বিশের ধরন-ধারণের সঙ্গে সেভাবে পরিচিত না হয়েই বিশ্ব আসরে যাওয়া দলটি তাক লাগিয়ে দেয় নিজেদের প্রথম ম্যাচেই। তাদের কাছে মাথানত করে এই সংস্করণের পরাশক্তি ওয়েস্ট ইন্ডিজও।

হৈচৈ ফেলে দেওয়া শুরুর পর দিনকে দিন আরো উন্নতিই করার কথা বাংলাদেশের, কিন্তু এরপর আরো পাঁচটি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ হয়ে গেলেও তারা পড়ে আছে ব্যর্থতার ঘূর্ণাবর্তেই। এমনই সে চক্কর যে ২০০৭ সালে ক্যারিবীয়দের হারানোটাই বরং এত দিনে অলৌকিক এক গল্পগাথা হয়ে উঠতে চলেছে। আসরের ১৪ বছরের ইতিহাসে সেটিই মূল পর্বে পাওয়া বাংলাদেশের একমাত্র জয় হয়ে আছে এখনো।

যে জয়ে আরো বড় কিছুর স্বপ্নে বুকের ছাতি ফুলে গিয়েছিল প্রথম বিশ্ব আসরে বাংলাদেশের অধিনায়ক মোহাম্মদ আশরাফুলেরও, ‘আমাদের তখনকার ব্যাটাররা প্রায় সবাই খুব মারতে পছন্দ করত। যেমন তামিম, আমি, আফতাব, সাকিব ও অলক কাপালি—আমরা সবাই মারতে পছন্দ করতাম। এ জন্যই মনে হতো, এই সংস্করণে আমরা তাড়াতাড়ি বিশ্ব ক্রিকেটে নাম করতে পারব, কিন্তু দুর্ভাগ্য যে...। ’

পরের পাঁচটি আসরেও খেলেছেন সেই দলের তামিম-সাকিবরা। তাঁদের সঙ্গে আরো কতজন যে যোগ দিয়েছেন! কিন্তু ভাগ্য বদলায়নি। অথচ মাঝের সময়ে ব্যর্থতার চক্র ভেদ করা নিয়ে গবেষণা কম তো হয়নি। ক্রিকেটারদের পরিশ্রম করার মানসিকতায়ও পরিবর্তন এসেছে। আরো বেশি পেশাদার হয়েছেন তাঁরা। বেড়েছে তাঁদের সুযোগ-সুবিধাও। কোচ-উপদেষ্টা কোচ থেকে শুরু করে সাপোর্ট স্টাফের সংখ্যার দিক থেকেও জাতীয় দল এখন এমন টইটুম্বুর যে এত দিনেও সাফল্যের পথ খুঁজে না পাওয়াটা বিস্ময়করই। যদিও অনেকেই ক্রিকেটীয় যুক্তি দিয়ে এই বিস্ময়ও খণ্ডন করতে চাইবেন। মারকাটারি ক্রিকেটের যুগে নিজেদের পাওয়ার হিটার নেই বলে বাংলাদেশ দলও যখন প্রায়ই হা-হুতাশ করে, তখন সেই যুক্তিও ফেলে দেওয়া যায় না।

খেলাটির ধরনের সঙ্গে অনেক ব্যাটারের বেমানান স্ট্রাইক রেট নিয়েও আলোচনা হয় নিত্যই। ২০০৭ সালে মারতে অভ্যস্ত কাউকে কাউকে এখন বলক্ষয়ী ইনিংস খেলার জন্য নিয়মিতই সমালোচনায় বিদ্ধও হতে হয়। বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক মাহমুদ উল্লাহ অবশ্য স্কিল হিটিং দিয়ে বিগ হিটিংয়ের অক্ষমতা পুষিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছেন। পরের পাঁচ আসরে মূল পর্বে বিক্ষিপ্তভাবে কিছু ম্যাচে জয়ের তীর দেখতে পাওয়া পারফরম্যান্স ছাড়া যখন বলার মতো কিছু নেই, তখন অধিনায়কের কথায় ভরসা কয়জনে রাখছেন কে জানে!

যদিও এবার মাহমুদের বড় স্বপ্নে অবলম্বন ঠিকই আছে। যেমন ছিল ২০০৭-এর আসরের অধিনায়ক আশরাফুলেরও। একই বছর ওয়েস্ট ইন্ডিজে অনুষ্ঠিত ওয়ানডে বিশ্বকাপের সুপার এইটে খেলা ছিল তাঁর দলের বড় অনুপ্রেরণা। সেই সাফল্যের টাটকা স্মৃতি নিয়ে যাওয়া আশরাফুলরা দক্ষিণ আফ্রিকায়ও গিয়েছিলেন সুপার এইটে খেলার লক্ষ্য স্থির করেই। বলা বাহুল্য, ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়ে সেই লক্ষ্যের নাগাল তাঁরা পেয়েও ছিলেন। এবারের বিশ্বকাপে প্রথম পর্বের মোড়কে হতে যাওয়া বাছাই পর্ব পেরোলে যে সুপার টুয়েলভ, তাতে কি জয়ের আনন্দে বিলীন হবে গত ১৪ বছরের না পাওয়া?

টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে নিজেদের অবস্থানগত উত্তরণে সে সম্ভাবনার ঝিলিক কিন্তু দেখা যাচ্ছে। এত দিন নিজেদের ভালো দল বলে দাবি করেও ঠিক পাত্তা পাওয়া যেত না। কারণ আইসিসির র‌্যাংকিংয়ে এর প্রতিফলন ছিল না। এবারও যেমন ‘কাট অফ টাইম’-এর মধ্যে র‌্যাংকিংয়ের সেরা আটে থাকতে না পারায় প্রথম পর্ব খেলতে হচ্ছে। তবে ১৭ সেপ্টেম্বর মাসকাটের আল আমরাত স্টেডিয়ামে স্কটল্যান্ড ম্যাচ দিয়ে আরেকটি বিশ্বকাপ অভিযান শুরুর দিন মাহমুদ উল্লাহর মধ্যে আর সেই ‘ইনফেরিওরিটি’ থাকছে না নিশ্চিত। এই প্রথম যে নিজেদের ইতিহাসে র‌্যাংকিংয়ের সেরা অবস্থানে থেকে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে নামছে বাংলাদেশ!

আগেও ভালো করার তাড়না থাকত, কিন্তু পেছন থেকে আত্মবিশ্বাসে থাবা বসাত শেষের সারিতে অবস্থানের ব্যাপারটিও। সেখান থেকে উঠে আসা বাংলাদেশ ওয়ানডে সংস্করণকেই নিজেদের সবচেয়ে স্বাচ্ছন্দ্যের এবং পছন্দের বলে দাবি করে থাকে। যেখানে র‌্যাংকিংয়ে তাদের অবস্থান এখন ৭ নম্বরে। মাহমুদ উল্লাহর টি-টোয়েন্টি দল ছাড়িয়ে গেছে সেটিকেও। দেশের মাটিতে পর পর অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজ জয় বাংলাদেশকে এই সংস্করণের র‌্যাংকিংয়ে এক লাফে পৌঁছে দিয়েছে  ৬ নম্বরে।

সফরকারী দুই দলের দুর্বলতা এবং মিরপুরের ধীরগতির উইকেটই এসব সাফল্যে কৃতিত্বের ভাগ নিয়ে নিচ্ছে বেশি। আলোচনা অন্তত তেমনই। সেই সঙ্গে নিজেদের চেনা কন্ডিশনে ব্যাটারদের সংগ্রাম করতে দেখেও অনেকে সামনের কাঁটা বিছানো পথ অনুমান করে নিচ্ছেন। তবু জয় তো জয়ই। ২০০৭-এর ওয়ানডে বিশ্বকাপের আগে স্কটল্যান্ড এবং সমপর্যায়ের দলের বিপক্ষে প্রচুর ম্যাচ খেলে জেতার বিশ্বাস যদি সুফল এনে দিয়ে থাকে, তাহলে এবার কেন নয়? অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড তো আর নিশ্চয়ই স্কটল্যান্ড নয়! তা ছাড়া যাওয়ার আগে টানা তিনটি সিরিজ জেতার (জিম্বাবুয়ে সফরেও একটি) বিশ্বাস নিয়েও বাংলাদেশ কোনো দিন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে যায়নি, যায়নি র‌্যাংকিংয়ে কখনো অস্ট্রেলিয়া ও ওয়েস্ট ইন্ডিজকে পেছনে ফেলেও।

এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্নে তাই এবার পিছিয়ে থাকার পিছুটানও নেই। আন্দাজে ঢিল ছুড়ে লক্ষ্যভেদ করা সাফল্যের দিন ছাপিয়ে নতুন গল্পগাথা লেখা হলো বলে...!



সাতদিনের সেরা