kalerkantho

রবিবার । ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ২৮ নভেম্বর ২০২১। ২২ রবিউস সানি ১৪৪৩

ধুন্ধুমার ক্রিকেট

এক অর্থে ক্রিকেট এখনো রাজার খেলাই আছে। রাজতন্ত্রে রাজার আইনই শেষ কথা। ক্রিকেটও অনেকটা সে রকমই। নইলে আর কোনো খেলা দুই রঙের পোশাকে হয়—সাদা ও রঙিন? আর কোনো খেলা তিন ফরম্যাটে হয়—পাঁচ দিন থেকে শুরু করে সর্বনিম্ন ২০ ওভারের? অদূর ভবিষ্যতে টি-১০ আইসিসির জুড়ি গাড়িতে উঠে পড়লে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। সে তিনি মাইকেল হোল্ডিং যতই টি-টোয়েন্টি থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখুন না কেন। তাঁর উত্তরসূরি, মানে বর্তমান সময়ের ক্রিকেটাররা মুখে টেস্ট ক্রিকেটের মহিমা-কথা বললেও আড়চোখে তাকিয়ে থাকেন ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের অকশনে।

সাইদুজ্জামান   

১৭ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ধুন্ধুমার ক্রিকেট

রাজার খেলা ক্রিকেট। একসময় পাঠ্য বইয়ে তাই লেখা থাকত। রাজা-বাদশাহরা অবসরে প্রাসাদের সবুজ উঠানে খেলতেন বলেই এমনটা লেখা হতো। এরপর অর্থমূল্য বাড়তে থাকায় খেলাটা প্রাসাদের সীমানা পাঁচিল ডিঙিয়ে পৌঁছে যায় ভদ্রসমাজে, নাম বদলে ক্রিকেট হয়ে যায় ভদ্রলোকের খেলা। এখন সেটির পরিধি আরো বিস্তৃত। এখন আর কোনো শ্রেণিভেদ নেই। বরং আধুনিক ক্রিকেট তারকাদের শৈশব ঘাঁটাঘাঁটি করলে পেলে-ম্যারাডোনার বেড়ে ওঠার গল্পের সঙ্গে মিল পাওয়া যায় বেশি। প্রলেতারিয়েতরা কষ্টসহিষ্ণুতা দিয়ে একালের রাজাধিরাজদের পাঠিয়ে দিয়েছে করপোরেট বক্সে। তাঁরা এখন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে বসে ক্রিকেট দেখেন।

তবু এক অর্থে ক্রিকেট এখনো রাজার খেলাই আছে। রাজতন্ত্রে রাজার আইনই শেষ কথা। ক্রিকেটও অনেকটা সে রকমই। নইলে আর কোনো খেলা দুই রঙের পোশাকে হয়—সাদা ও রঙিন? আর কোনো খেলা তিন ফরম্যাটে হয়—পাঁচ দিন থেকে শুরু করে সর্বনিম্ন ২০ ওভারের? অদূর ভবিষ্যতে টি-১০ আইসিসির জুড়ি গাড়িতে উঠে পড়লে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। সে তিনি মাইকেল হোল্ডিং যতই টি-টোয়েন্টি থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখুন না কেন। তাঁর উত্তরসূরি, মানে বর্তমান সময়ের ক্রিকেটাররা মুখে টেস্ট ক্রিকেটের মহিমা-কথা বললেও আড়চোখে তাকিয়ে থাকেন ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের অকশনে। বছরে গোটা তিনেক প্রাইভেট লিগে ডাক পেলে রুটি-রুজির জন্য আন্তর্জাতিক ক্রিকেট না খেললেও চলে। নামি কত কোচই তো ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের ঘেরাটোপে আড়াল নিয়েছেন। মাসখানেকের আয়ে যদি জীবন স্বচ্ছন্দে কাটে, তাহলে বছরজুড়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের চাপ কেন নেবেন পঞ্চাশোর্ধ্ব কেউ?

ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট অর্থনৈতিক নিরাপত্তা দিচ্ছে। দেবে জেনেই ইন্ডিয়ান ক্রিকেট লিগের (আইসিএল) ওপর নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে লোলিত মোদী ভিন্ন ব্র্র্যান্ডের ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল) চালু করেন। আইসিসিও সেই স্রোতে ভেসে ওয়ার্ল্ড টি-টোয়েন্টির নাম পাল্টে করেছে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। এরপর বিগ ব্যাশ, সিপিএল, বিপিএলের ধাক্কায় না আবার অবশিষ্ট ক্ষমতাও বিলুপ্ত হওয়ার মুখে টি-টোয়েন্টির বৈশ্বিক আসর মাঠে নামায় আইসিসি।

বৈশ্বিক আসর হলেও ওয়ানডে বিশ্বকাপের ‘মানহানি’ ঘটতে পারে, এই চিন্তা থেকে বৈশ্বিক টি-টোয়েন্টিকে ওয়ার্ল্ড টি-টোয়েন্টিতে ব্র্যাকেটবন্দি রেখেছিল আইসিসি। কিন্তু করপোরেট চাহিদা মেটাতে গিয়ে সেই ব্র্যাকেট তুলে দিয়ে এখন দুটি বিশ্বকাপ আয়োজন করছে আইসিসি—ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টির। ভাবা যায়, একই খেলার দু-দুটি বিশ্বকাপ! অবশ্য একই সমান্তরালে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ চালু করে ‘শুদ্ধ’ ক্রিকেটের পতাকাও ওড়ানো হচ্ছে। সব মিলিয়ে ক্রিকেটে বৈশ্বিক শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট তিনটি। আর কোনো খেলায় এমনটা আছে? তার ওপর হামেশাই নিয়ম বদলায়। এসব যেন রাজডিক্রির মতোই, যুক্তিতর্কের ঊর্ধ্বে!

অবশ্য ক্রিকেটের এই বিবর্তনে আমজনতা যথেষ্টই উত্ফুল্ল। পাঁচ দিনের ঘ্যানঘ্যানে টেস্টের চেয়ে ২০ ওভারের মারকুটে ক্রিকেট অনেক বেশি আকর্ষক। খুব দ্রুত হলেও টেস্ট ম্যাচের রং বদলাতে একটা সেশন লেগে যায়। সেখানে টি-টোয়েন্টিতে এখন একটা ছক্কা কিংবা ডট বলেও ওলটপালট হয় ম্যাচের ফল। এবারের আইপিএল কোয়ালিফায়ার টু-তে সাকিব আল হাসানের কলকাতা নাইট রাইডার্স তো সেটাই করে দেখিয়েছে। টেস্টের রোমাঞ্চকর সমাপ্তি উচ্চাঙ্গের হয়, কিন্তু টি-টোয়েন্টির রুদ্ধশ্বাস সমাপ্তি সব সময়ই বিস্ফোরক। এ নিয়ে ফিসফাস হয়, তবু বারুদের পোড়া গন্ধ শুঁকতে দর্শক উপচে পড়ে গ্যালারিতে।

অতঃপর শুদ্ধবাদীরা টি-টোয়েন্টিকে নীরবে বরণ করে নিয়েছেন। এর অর্থনৈতিক ভিত্তি যে মজবুত, সেটি প্রকাশ্যে স্বীকারও করেন। সেই দিন মনে হয় খুব দূরে নয়, যেদিন টি-টোয়েন্টির রঙিন জগতে জমায়েত হবেন শুদ্ধ ক্রিকেটচারীরাও।

এবারের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের কথাই ধরুন। ১৬ দলের আসর। আজ থেকে শুরু হচ্ছে প্রি-কোয়ালিফাইং রাউন্ড। চারটি করে দলের দুটি গ্রুপের একটিতে আছে বাংলাদেশ। গ্রুপের সেরা দুই দলের একটি হলে পরে মাহমুদ উল্লাহদের টিকিট মিলবে ‘আসল’ বিশ্বকাপের, সুপার টুয়েলভে। সেরা ১২ দল আবার দুই গ্রুপে লড়বে সেমিফাইনালে জায়গা পেতে। দুই গ্রুপের সেরা দুটি করে দল সেমির বাধা টপকে উঠবে ১৬ লাখ ডলারের শিরোপার জন্য। অথচ ভিন্ন নামে হলেও প্রথম টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপজয়ী ভারত আইসিসির তরফ থেকে কোনো প্রাইজ মানিই পায়নি। তবে ভারতীয় বোর্ড বিশ্বজয়ী মহেন্দ্র সিং ধোনির দলকে ৩০ লাখ ডলার বোনাস দিয়েছিল।

একটা সময় অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ দেখতে পেত। কিন্তু গত এক দশকে ভবিষ্যৎ দর্শনের দুরবিনটা মনে হচ্ছে ভারতের। ২০০৭ বিশ্ব টি-টোয়েন্টি ছিল অধিনায়ক ধোনির অভিষেক আসর। ফিটনেসের ঢোলে তারুণ্যের বোল তুলে কাপ জিতে ফিরেছিলেন তিনি। এখন তো দিব্যদৃষ্টিতে দেখা যাচ্ছে, এই ফরম্যাটেই সবচেয়ে বেশি ফিটনেস এবং এর সূত্র ধরে পাওয়ার দরকার। এই ফরম্যাটের ধাক্কায় আজকাল টেস্ট ম্যাচেও দুর্দান্ত ফিল্ডিং দেখা যায়। টি-টোয়েন্টির দক্ষ ফিল্ডাররা একেকজন চিতার মতো ক্ষিপ্র।

স্কিলের চেয়ে পাওয়ারের গুণগানই বেশি শোনা যায়। ভাবা যায়, ব্যাটার ছক্কা হাঁকানোর পর চোখ চলে যায় টিভি মনিটরের বাঁ দিকে। সেখানেই তো ভেসে ওঠে ওটা টুর্নামেন্টের কততম ছক্কা, কত দূরত্বে গিয়ে আছড়ে পড়েছে! এই ছক্কাগুলোর বেশির ভাগই আবার ব্যাকরণসিদ্ধ নয়, ভারী ব্যাটের কানায় লেগেও উইকেটরক্ষকের মাথার ওপর দিয়ে সীমানার ওপারে বল আছড়ে পড়ে। আর আন্দ্রে রাসেলের ব্যাটে-বলে ঠিকঠাক লেগে গেলে ১০০ মিটার পেরিয়ে যায় অনায়াসে। গা বাঁচাতে বোলারও এখন পরিস্থিতির ওপর নজর রাখেন বেশি। আগুনে ফাস্ট বোলিংয়ের চেয়ে এই ফরম্যাটে গতিবৈচিত্র্য অগ্রাধিকার পায়। বাউন্সারের চেয়ে ওয়াইড ইয়র্কারের কদর বেশি। উইকেট নয়, উদ্ধত ফাস্ট বোলারের কাছেও প্রধান চাওয়া ডট বল। রানের জন্য হাঁসফাঁস করতে থাকা ব্যাটার অধৈর্য হয়ে উইকেট তো দেবেই।

তাই টি-টোয়েন্টির রমরমা বিশ্ব আসরেও দুর্দান্ত বোলিং কিংবা ব্যাটিংয়ের প্রত্যাশা করাটা যার যার ব্যক্তিগত পছন্দ। এর জন্য কর্তৃপক্ষ, মানে খেলোয়াড়রা দায়ী নন! ক্রিকেটের এই আসরে আপনি চোখ রাখবেন শুধু ব্যাট-বলের ধুন্ধুমার লড়াইয়ে। আর্ট ফিল্ম নয়, অ্যাকশন মুভি। সিনেমায় তবু শেষমেশ নায়কের জয়ের আগাম নিশ্চয়তা থাকে। কিন্তু টি-টোয়েন্টির স্ক্রিপ্টটা আগাম বোঝা কঠিন। যখন আপনার মনে হবে, খেলা শেষ... দেখা গেল এরপরই সত্যিকারের খেলা শুরু হলো! টি-টোয়েন্টিতে এক বলেরও ভরসা নেই। এর চেয়ে নাটকীয় আর কী হতে পারে?

তাই আজ থেকে শুরু হওয়া টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচের শেষ বল না হওয়া পর্যন্ত টিভি সেট বন্ধ করবেন না। উপভোগ করুন, ক্রিকেটেও পাওয়ারের উদ্দাম জয়গান। এই ফরম্যাটে ইম্প্রোভাইজেশনই স্কিল, অ্যাবিলিটি হলো অ্যাথলেটিসিজম!



সাতদিনের সেরা