kalerkantho

শনিবার । ২৭ চৈত্র ১৪২৭। ১০ এপ্রিল ২০২১। ২৬ শাবান ১৪৪২

সেই সোনালি নারী অ্যাথলেটরা

ইকরামউজ্জমান   

৮ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সেই সোনালি নারী অ্যাথলেটরা

এখন থেকে ৬৬ বছর আগে ১৯৫৫ সালে ঢাকায় প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হয়েছিল পাকিস্তানের জাতীয় গেমস। আর সেই গেমসের দ্বিতীয় দিনে কামরুন নেছা গার্লস স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্রী জিনাত আহমেদ হাই জাম্পে চার ফুট আড়াই ইঞ্চি উচ্চতায় লাফিয়ে প্রথম বাঙালি নারী ক্রীড়াবিদ—যিনি স্বর্ণপদক অর্জন করেছিলেন। জিনাত আহমেদের এই কৃতিত্ব পূর্ব পাকিস্তানের ক্রীড়াঙ্গনে আলোড়ন সৃষ্টি করে। পাকিস্তানের জাতীয় গেমস শুরু হয়েছে ১৯৪৮ সাল থেকে। এই গেমস শুরু হওয়ার পর থেকে কোনো বাঙালি পুরুষ ক্রীড়াবিদ যা পারেননি, নারী ক্রীড়াবিদ জিনাত তা পেরেছেন।

তখনকার সামাজিক অবস্থা এবং নারীদের জন্য প্রচলিত রীতিনীতি কী ছিল। নারীরা কোন ধরনের সামাজিক অনুশাসনের মধ্যে ছিলেন। সেই সময় পূর্ব পাকিস্তানের নারী অ্যাথলেটের অসাধারণ সাফল্য—আর সেটি খেলার মাঠে।

পূর্ব পাকিস্তানের পক্ষে নারী এবং পুরুষ-ক্রীড়াবিদ-নির্বিশেষে প্রথম বিজয়ের মশাল প্রজ্বালন করেছেন জিনাত আহমেদ। সেই মশালের আলোতে উজ্জীবিত ও অনুপ্রাণিত হয়েই পরের বছর ১৯৫৬ সালে পশ্চিম পাকিস্তানের লাহোরে অনুষ্ঠিত জাতীয় গেমসে ৮০ মিটার হার্ডলসে নতুন জাতীয় রেকর্ড সৃষ্টিসহ স্বর্ণপদক জেতেন পুরান ঢাকার আরেক বাঙালি নারী অ্যাথলেট লুত্ফুন্নেছা বকুল। বাঙালি নারী অ্যাথলেটের ধারাবাহিকভাবে আরেকটি স্মরণীয় সাফল্য। এরপর বকুল ১৯৫৮ সালে পেশোয়ার গেমসেও ৮০ মিটার হার্ডলসে স্বর্ণপদক জিতেছেন। এই সাফল্য অনুসরণ করে ষাটের দশকের শুরু থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগ পর্যন্ত পাকিস্তানের গেমসে অংশ নিয়ে বাঙালি নারী অ্যাথলেটরা (পাকিস্তানের জাতীয় গেমসে বাঙালি নারী অ্যাথলেটরা যাঁরা বিভিন্ন সময়ে স্বর্ণপদক জিতেছেন, এই নিবন্ধে শুধু তাঁদের নিয়ে সংক্ষেপে কিছু বলা হচ্ছে। রৌপ্য ও ব্রোঞ্জ পদক অর্জন করেছেন আরো কয়েকজন নারী অ্যাথলেট—তাঁদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করছি) স্বর্ণপদক জিতে পাকিস্তানিদের অবহেলা, অবজ্ঞা এবং বঞ্চনার জবাব দিয়েছেন মাঠের পারফরম্যান্সের মাধ্যমে। জাগিয়ে তুলেছেন বাঙালি জাতীয়তাবাদ। স্বাধিকার আন্দোলনে রাজনৈতিক চেতনা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছেন।

জাতি স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী পালন করতে যাচ্ছে। ফিরে দেখছি ক্রীড়াঙ্গনে কোথায় ছিলাম, কোথায় এসে দাঁড়িয়েছি। কোথায় থাকা উচিত ছিল। পাকিস্তানের দিনগুলোতে ক্রীড়াঙ্গনে বাঙালি নারী অ্যাথলেটদের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা আছে। আছে সুবর্ণ অতীত—জাতির গর্ব করার মতো। ক্রীড়াঙ্গনের ইতিহাসে এই অধ্যায়টা (১৯৫৫ থেকে ১৯৭০ পাকিস্তানের জাতীয় গেমসে) অনেকটা অজানা রয়ে গেছে। বর্তমান প্রজন্ম ক্রীড়াঙ্গনের এই অধ্যায় সম্পর্কে খুব কমই অবগত। অথচ এই অতীত ইতিহাস জানার দরকার আছে। এই ইতিহাস সব সময়ের জন্য অনুপ্রেরণাদায়ক। স্বাধীন দেশের ক্রীড়াঙ্গনে নারী খেলোয়াড় ও ক্রীড়াবিদরা বিভিন্ন খেলায় একক এবং দলগতভাবে আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনেও সাফল্য প্রদর্শন করছেন। এই ক্ষেত্রে অর্জন ক্রমেই বাড়ছে। সময় এবং চাহিদা বুঝতে হবে।

পাকিস্তানের দিনগুলোতে প্রাদেশিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ছিল সবচেয়ে বড় এবং মর্যাদাসীন। তখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিযোগিতা ছাড়াও মহকুমা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে বার্ষিক ক্রীড়া মিট অনুষ্ঠিত হতো। এতে যাঁরা প্রাদেশিক মিটে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেতেন, তাঁরা কয়েকটি স্তর অতিক্রম করেই আসতেন। তখনকার দিনে প্রাদেশিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ছিল আকর্ষণীয় এবং জমজমাট। তিন-চার দিনব্যাপী এই প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর অনুষ্ঠান হাজার হাজার দর্শক উপভোগ করত। এখন জাতীয় অ্যাথলেটিকস মিট অনুষ্ঠিত হয় দর্শকশূন্য স্টেডিয়ামে। মিডিয়া তার কাজ করে।

পাকিস্তানের দিনগুলোতে যেসব সোনালি নারী অ্যাথলেট প্রাদেশিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ধারাবাহিকভাবে ভালো করেছেন, তাঁদের মধ্য থেকেই অ্যাথলেটরা ভালো করেছেন জাতীয় গেমসে। আর এই বিষয়টি মোটামুটি আগে আঁচ করা গেছে। পূর্ব পাকিস্তানে জাতীয় গেমস অনুষ্ঠিত হয়েছে ১৯৫৫, ১৯৬০, ১৯৬৪ ও ১৯৬৮ সালে। অন্যগুলো অনুষ্ঠিত হয়েছে পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রদেশে। পূর্ব পাকিস্তান থেকে প্রাদেশিক দল সেখানে প্রতিনিধিত্ব করেছে। আরেকটি বিষয় বলার দরকার আছে সেটি হলো, পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ক্লাব দলগুলো অংশ নিত। কাজী শামীমা (ওয়ান্ডারার্স), ডনিক্রুজ (ওয়ান্ডারার্স), সুলতানা আহমদ (ঢাকা মোহামেডান), রওশন আখতার ছবি (আজাদ স্পোর্টিং), ইসরাত আরা (মোহামেডান) প্রমুখ বিভিন্ন ক্লাব থেকে অংশ নিয়েছেন।

ঢাকার রোকনপুরের কাজী পরিবারের মেয়ে কাজী শামীমা। এই পরিবারের ভাই-বোন সবাই অ্যাথলেট। কাজী আবদুল আনিস সবার বড়। কাজী শামীমা ১৯৬০ সালে প্রথম প্রাদেশিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছেন। এরপর ১৯৬২ সালে লাহোরে অনুষ্ঠিত জাতীয় গেমসে তিনটি স্বর্ণপদক এবং একটি রৌপ্যপদক লাভ করেন। ১০০ ও ২০০ মিটার এবং ৮০ মিটার হার্ডলসে স্বর্ণপদক ছাড়াও লং জাম্পে রৌপ্যপদক পেয়েছেন। ১৯৬৪ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত জাতীয় গেমসে শামীমা কোনো স্বর্ণপদক পাননি।

অলরাউন্ডার অ্যাথলেট ডলি ক্যাথরিন ক্রুজ। অ্যাথলেটিকস ছাড়াও সাইক্লিং (জাতীয় গেমসে স্বর্ণপদকও জিতেছেন), বাস্কেটবল, ভলিবল, হকি, সাঁতার, হ্যান্ডবল, ব্যাডমিন্টন—সব খেলাই খেলেছেন। ১৯৫৫ সাল থেকে প্রাদেশিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছেন। ১৯৬২ সালে লাহোরে জাতীয় গেমসে সাইক্লিং ইভেন্টে তিনটি স্বর্ণপদক জিতেছেন। ১৯৬৪ সালে ঢাকায় জাতীয় গেমসে ডনিক্রুজ শটপুট ও জ্যাভেলিনথ্রোতে স্বর্ণপদক জয় করেন।

১৯৬৮ সালের ১২ থেকে ১৫ এপ্রিল ঢাকা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হয়েছে পাকিস্তানের জাতীয় গেমস। এটি পাকিস্তানের শেষ জাতীয় গেমস ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই গেমস বাঙালি জাতির ক্রীড়া ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে চারজন নারী অ্যাথলেটের অসাধারণ নৈপুণ্যে। সুলতানা আহমদ, রওশন আখতার ছবি, ইসরাত আরা ও সুফিয়া খাতুন যথাক্রমে লং জাম্প, ৮০ মিটার হার্ডলস, হাই জাম্প এবং ১০০ মিটার স্প্রিন্টে স্বর্ণপদক জিতেছেন। পাকিস্তানের আর কোনো জাতীয় গেমসে একসঙ্গে চারজন বাঙালি নারী অ্যাথলেট স্বর্ণপদক জেতেননি। সুলতানা আহমদ ও রওশন আখতার ছবি লং জাম্প এবং ৮০ মিটার হার্ডলসে নতুন জাতীয় রেকর্ডও সৃষ্টি করেছেন। ১৯৭০ সালে লাহোরে অল পাকিস্তান উইমেন্স অ্যাথলেটিক চ্যাম্পিয়নশিপে লং জাম্পে স্বর্ণপদক জিতেছেন সুলতানা আহমদ।

ক্রীড়াঙ্গনে অসাধারণ অবদান এবং ভূমিকা রাখার জন্য লুত্ফুন্নেছা হক বকুল (১৯৭৮) জিনাত আহমেদ (১৯৮০), ডনি ক্যাথরিন ক্রুজ (১৯৮১), সুলতানা কামাল (১৯৮৭), সুফিয়া খাতুন (১৯৯৬) ও রওশন আখতার ছবি (২০০১) জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার পেয়েছেন।

 

লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক

মন্তব্য