kalerkantho

রবিবার । ৪ আশ্বিন ১৪২৮। ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১১ সফর ১৪৪৩

মদিনা সনদ পৃথিবীর প্রথম লিখিত সংবিধান

মো. আবু সালেহ সেকেন্দার

   

২ নভেম্বর, ২০১২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



মদিনা সনদ পৃথিবীর প্রথম লিখিত সংবিধান

মহানবী (সা.) ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মক্কা থেকে তদানীন্তন ইয়াসরিবে (পরবর্তী সময়ে মদিনা) হিজরত করেন। তাঁর হিজরতের মাধ্যমে ইসলাম আধ্যাত্মিকতার জগতের পাশাপাশি রাজনীতির জগতে প্রবেশ করে। পি কে হিট্টি তাঁর 'হিস্ট্রি অব দি আরবস' গ্রন্থে হিজরতকে মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনের মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা বলে অভিহিত করেছেন। অন্যদিকে সৈয়দ আমীর আলী তাঁর 'দ্য স্পিরিট অব ইসলাম' গ্রন্থে এ ঘটনাকে মদিনাবাসীর জন্য নতুন শতাব্দীর সূচনা বলে মন্তব্য করেন। প্রিয় নবী (সা.) মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করার পর সমকালীন পরিস্থিতি বিবেচনা করে আনসার ও মুহাজিরদের মধ্যে একটি চুক্তি সম্পাদনের উদ্যোগ নেন। এই চুক্তিটিতে তিনি ইহুদিদেরও অন্তর্ভুক্ত করেন। অর্থাৎ আনসার-মুহাজির-ইহুদিসহ গোটা ইয়াসরিবের জনগণের জন্য তিনি একটি সনদ প্রণয়ন করেন। মহানবী (সা.) কর্তৃক ইয়াসরিব উপত্যকার সব মানুষের জন্য লিখিত এই সনদই ইতিহাসে 'মদিনা সনদ' নামে পরিচিত। ইসলামের ইতিহাসে ম্যাগনাকার্টারও আগে মদিনা সনদকে ঐতিহাসিকরা বিশ্বের ইতিহাসে সর্বপ্রথম লিখিত সংবিধান বলে স্বীকৃতি প্রদান করেছেন। ইয়াসরিববাসীর সঙ্গে স্বাক্ষরিত এই সনদের মাধ্যমে ইসলামী রাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপিত হয়। এই সনদই ইসলামের নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে নব প্রতিষ্ঠিত মদিনা রাষ্ট্রের সর্বময় কর্তৃত্ব প্রদান করে। এই সনদ স্বাক্ষরিত হওয়ার পর ইয়াসরিব উপত্যকার নাম পরিবর্তিত হয়ে মদিনাতুন্নবী বা নবীর শহর নাম ধারণ করে। পরবর্তী সময়ে এই শহর মদিনা নামেই জগৎময় পরিচিতি লাভ করে। ইবনে ইসহাক (রা.) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ (সা.) মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে একটি চুক্তিপত্র লিখে দেন এবং এতে ইহুদিদেরও এ চুক্তির অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এ চুক্তিতে তাদের ধর্ম ও ধন-সম্পদের নিরাপত্তা প্রদান করা হয়, তাদের অধিকারগুলোর নিশ্চয়তা প্রদান করা হয় এবং তাদের ওপর কিছু শর্ত শরায়েতও আরোপ করা হয়।' প্রায় সমসাময়িক ইতিহাসবিদ ইবনে হিশাম (র.) তাঁর 'সিরাতুননবী (সা.)' গ্রন্থে এ সনদের ৫৩টি ধারার বর্ণনা করেছেন। [দ্র. ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ থেকে বাংলা ভাষায় অনূদিত এই গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডের (ঢাকা : ১৯৯৪, পৃ. ১৬৩-১৭১।)] তবে উইলিয়াম মন্টেগোমারি ওয়াট তাঁর 'মুহাম্মদ অ্যাট মদিনা' গ্রন্থে এই সনদের (পৃ. ২২১-২২৫) ৪৭টি ধারা উল্লেখ করেছেন। যা-ই হোক, এই সনদের মাধ্যমেই মহানবী (সা.) ধর্ম, বর্ণ, জাতি, উপজাতি- নির্বিশেষে সবাইকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন। তিনি যে রাষ্ট্রব্যবস্থার কাণ্ডারি ছিলেন, সেই রাষ্ট্রে সব মানুষের সমান অধিকার সুনিশ্চিত হয়েছিল। তিনি ছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনার মূর্ত প্রতীক। তিনি সবার সমন্বয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করতেন। এই সনদে মদিনাবাসী ইহুদি, খ্রিস্টান, মাজুসি, অগ্নি উপাসক অর্থাৎ সনদে স্বাক্ষরিত সব সম্প্রদায় উম্মাভুক্ত বলে ঘোষণা করা হয়। এই সনদের ১ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে- 'তারা সবাই মিলে সব জাতি থেকে পৃথক একটি উম্মাহ।' আর উম্মাহভুক্ত সব ধর্ম ও বর্ণের মানুষের মদিনা উপত্যকায় বসবাসের অধিকার রয়েছে। এই বিষয়টি সনদের ৪৩ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে। এই ধারার মাধ্যমে মূলত তিনি মদিনাকে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পে বিষাক্ত হওয়া থেকে রক্ষা করেছেন। তিনি মদিনা রাষ্ট্রে বসবাসকারী সবাইকে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব অর্পর্ণ করেছেন। তিনি এই সনদের ২৫, ৩৯ ও ৪২ ধারায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে মুসলিমদের পাশাপাশি ইহুদিরাও যুদ্ধের ব্যয়ভার বহন করবে। অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা রক্ষা করা শুধু মুসলিমদের দায়িত্ব নয়; বরং রাষ্ট্রের সব নাগরিকের দায়িত্ব। শেখ মুহাম্মদ লুৎফর রহমান তাঁর 'ইসলাম : রাষ্ট্র ও সমাজ' গ্রন্থে বলেন, 'কোরাইশদের সম্ভাব্য আক্রমণ থেকে মদিনা রক্ষার দায়িত্ব জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে মদিনার নাগরিকদের ওপর অর্পণ করা হয়।' সব নাগরিকের ওপর যেমন মদিনা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব অর্পিত হয়, তেমনি সব নাগরিককে সমান সুযোগ-সুবিধা প্রদানের বিধানও রাখা হয়েছে। এই সনদের ২৭ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে- 'বনু নাজ্জার গোত্রের ইহুদিদের জন্য যা প্রযোজ্য, বানু আউফ গোত্রের ইহুদিদের জন্যও তা-ই প্রযোজ্য।' এ ছাড়া এই সনদের ১৬ নম্বর ধারায় ইহুদিদের মুসলমানদের মতো ন্যায্য অধিকারপ্রাপ্তির ইঙ্গিত রয়েছে। আল্লামা শিবলী নোমানী তাঁর 'সীরাতুন নবী' গ্রন্থে উল্লেখ করেন যে তিনি মনে করেন, 'এ সনদের মাধ্যমে ইহুদি ও মুসলিমরা পরস্পর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করে।' এই সনদে মদিনা রাষ্ট্রের সবার জন্য ন্যায্য আইন প্রচলন করা হয়। মুসলিমরা অন্যায় করলে তাদের জন্য যেমন শাস্তির বিধান রাখা হয়েছিল, তেমনি অন্য ধর্মের অনুসারীরাও যদি অপরাধ করতেন, তাদের জন্যও সাজা পাওয়ার বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। তবে এই সনদের ২৪ ও ৪৬ নম্বর ধারা নিয়ে অসাম্প্রদায়িকতার (!) মশাল উড্ডয়নকারী কোনো ব্যক্তি যদি কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করেন, তবে বিনীতভাবে জনাবের জ্ঞাতার্থে বলতে চাই, সমকালীন সময়ে মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন মদিনা রাষ্ট্রে তথা আরবের বিচারকের পদে আসীন হওয়ার মতো সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তি। এ ছাড়া মদিনা রাষ্ট্রে উম্মাহভুক্ত ব্যক্তিদের নিজ নিজ ধর্মগ্রন্থ অনুসারে বিচার পাওয়ার অধিকার ছিল। যেমন : একদিন মদিনার বানু কুরাইজা গোত্রের ইহুদিরা তাদের রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধের জন্য বিচারের সম্মুখীন হয়। তখন তারা মুহাম্মদ (সা.)-এর কাছে একটি আবেদন করে। ওই আবেদনে তাঁরা বলে, তাদের নিজ ধর্মগ্রন্থ অনুসারে বিচার করা হোক। মহানবী (সা.) তাদের এই আবেদন মঞ্জুর করেন। উপরন্তু তারা মহানবী (সা.)-এর পরিবর্তে তাদের বিচারক হিসেবে তাওরাত কিতাবে পণ্ডিত হজরত সা'দ-বিন-মুয়াজকে নিযুক্ত করার আবেদন করেন। মুহাম্মদ (সা.) তাদের এই আবেদনও গ্রহণ করেন। অর্থাৎ হজরত সাদ-এর ওপর তাওরাত কিতাব অনুসারে ইহুদিদের বিচারের ভার অর্পিত হয়। অন্যদিকে এই সনদে উম্মাহভুক্ত সব ধর্মের অনুসারীকে স্বাধীনভাবে স্ব-ধর্ম পালনের অধিকার প্রদান করা হয়। এই সনদের ২৬ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে- '...ইহুদিরা তাদের ধর্ম পালন করবে আর মুসলমানরা তাদের ধর্ম পালন করবে। এই বিধান তাদের মাওয়ালিদের ওপরও প্রযোজ্য হবে।...' প্রকৃতপক্ষে মদিনা সনদে আইনের ভাষায় সব নাগরিককে সমান অধিকার প্রদান করা হয়েছে। মহানবী (সা.) একজন ধর্ম প্রবর্তক হয়ে নিজের অনুসারীদের বিশেষ কোনো সুবিধা প্রদান না করে সব ধর্মাবলম্বী নাগরিকের ধর্ম পালন, সামাজিক ব্যবস্থা, রাজনীতি, আইন, বিচার, অর্থনীতি তথা সর্বক্ষেত্রে সমান অধিকার প্রদান করেন। এ জন্যই হারুন খান শেরওয়ানি তাঁর 'স্টাডিজ ইন মুসলিম পলিটিক্যাল থর্টস অ্যান্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন' গন্থে বলেন ...the prophet gave a charter of freedom