kalerkantho

শুক্রবার। ৩১ বৈশাখ ১৪২৮। ১৪ মে ২০২১। ০২ শাওয়াল ১৪৪২

মুসলিম দর্শনের ক্রমবিকাশ

এ এন এম নূরুল হক

   

৮ জুন, ২০১২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



মুসলিম দর্শনের ক্রমবিকাশ

এই নিবন্ধটির মূল প্রতিপাদ্য বিষয় মুসলিম দর্শন। মূল আলোচনা শুরু করার আগে দর্শন বিষয়ে একটা ভূমিকার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছি। কারণ ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হয়ে অনেকেই ধর্ম ও দর্শনকে পরস্পরবিরোধী দুটি বিষয় বলে মনে করেন। তাঁদের ধারণা- ধর্ম, সত্য, সুন্দর ও স্রষ্টার আরাধনার মাধ্যমে মানুষকে ইহলোকিক ও পারলৌকিক কল্যাণের পথে পরিচালিত করে। পক্ষান্তরে জীবন-জিজ্ঞাসার নানা জটিল যুক্তিতর্কের আবর্তে জড়িয়ে দর্শন মানুষকে ধর্মের প্রতি অবিশ্বাসী হতে উৎসাহী করে। আসল কথা হলো, ধর্ম-চেতনার মধ্যেই দর্শনের মূল তত্ত্ব নিহিত আছে। বিষয়টি সহজবোধ্য করার জন্য একটা উদাহরণ দিচ্ছি। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে দর্শনের জনক হিসেবে পরিচিত থালিস যেদিন ধর্মের আওতার বাইরে স্বাধীনভাবে ঘোষণা করলেন, মানুষ, জীবজন্তু, গাছপালা এসবের উৎপত্তি পানি থেকে, সেদিনই দর্শন জন্ম লাভ করে। কোরআনেও এ কথা সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে জীবন্ত সব কিছুই সৃষ্টি হয়েছে পানি থেকে। ধর্মের ওপর দর্শনের আধিপত্য এতটাই প্রবল যে ধর্ম থেকে দর্শনকে পৃথক করা আক্ষরিক অর্থে অসম্ভব। মুসলমানরা অন্যান্য ধর্মাবলম্বীর মতোই যুগ যুগ ধরে এক বিশেষ ধর্মাচরণের মাধ্যমে নিজস্ব জীবনদর্শন প্রণয়নের চেষ্টায় তৎপর ছিলেন। এই তৎপরতায় নিয়োজিত থাকাকালে তাঁদের চিন্তা ও কাজের অবলম্বন হিসেবে সব সময় কার্যকর ছিল কোরআন ও হাদিস। তাই মুসলিম দর্শনের মূলভিত্তি কোরআন ও হাদিসেই নিহিত। কোরআন ও হাদিস থেকে উৎপত্তি লাভ করলেও মুসলিম দর্শন পরবর্তীকালে আবির্ভূত বিভিন্ন ধর্মতাত্তি্বক সম্প্রদায়ের জগৎ ও জীবন সম্পর্কিত জিজ্ঞাসার ফলে ক্রমবিকশিত হয়েছে। অন্য যেসব বিষয় মুসলিম দর্শনের গতি-প্রকৃতি নির্ধারিত করেছিল, সেগুলোর মধ্যে গ্রিক দর্শনের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। দর্শন বলতে আজ আমরা যা বুঝি তার উন্মেষ, বিকাশ ও পরিপুষ্টি প্রাচীন গ্রিসেই ঘটেছিল। আরবদের কাছে খ্রিস্টান ধর্মযাজকের মাধ্যমে গ্রিক দর্শন পৌঁছে। এই ধর্মযাজকদের কেউ কেউ মুসলিম খলিফাদের রাজদরবারে উচ্চপদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। বিশেষত উমাইয়া শাসনামলে খ্রিস্টানরা মুসলমানদের ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে আসে এবং প্লেটো ও অ্যারিস্টটলের শিক্ষার আলোকে প্রবর্তিত খ্রিস্টধর্মের দর্শন মুসলমানদের মধ্যে বিস্তার লাভ করে। আরব জগতে গ্রিক দর্শনের প্রবেশের পর নবম শতাব্দীতে বাগদাদের খলিফা মামুন গ্রিক বিদ্যার গুরুত্বপূর্ণ বইগুলো আরবিতে অনুবাদ করান। ফলে শিক্ষিত আরবদের কাছে দর্শন, গণিত, চিকিৎসা ও জ্যোতির্বিদ্যা অধিগত বিষয়ে পরিণত হয়। গ্রিক দর্শনের প্রভাবে মুসলিম দর্শনে যেসব সম্প্রদায়ের উদ্ভট ঘটে, তাদের মধ্যে মুতাজিলা সম্প্রদায় বিশেষ উল্লেখ্য। তাঁদের মতে, এক ও অদ্বিতীয় হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহর ৯৯টি গুণবাচক নাম তাঁর একত্ব বিনষ্ট করে বহুত্ব প্রকাশ করে। বেহেশতবাসীরা আল্লাহকে চর্মচোখে দেখতে পাবেন, কোরআনে এরূপ সমর্থন থাকা সত্ত্বেও তা অস্বীকার করে মুতাজিলারা সুনি্ন মুসলমানদের বিরাগভাজন হয়েছেন। কোরআনে বর্ণিত আল্লাহর হাত, চোখ, মুখমণ্ডল এবং তাঁর বসার আরশবিষয়ক আয়াতগুলো মুতাজিলারা এড়িয়ে চলে। সংখ্যাগরিষ্ঠ সুনি্ন মুসলমানদের কাছে মুতাজিলারা আগাগোড়াই দুর্বোধ্য ছিল। ফলে আশারিয়াবাদ সুনি্ন মুসলিমদের প্রভাবশালী দর্শনে পরিণত হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে আব্বাসীয় শাসনামলে ইসলামে মরমি ভাবধারার উদ্ভবের ফলে সুফিবাদের তাত্তি্বক কাঠামোর ভেতরে মুসলিম দর্শন বিকাশ লাভ করে। সুফিরা ধর্মের গূঢ়তত্ত্বের বিষয়গুলো উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন বলে দাবি করেন। সুফিবাদী দর্শন এমন এক জীবন জিজ্ঞাসার ওপর প্রতিষ্ঠিত, যা ইসলাম ধর্মের গূঢ়তত্ত্বের উৎকর্ষকে আরো মহিমান্বিত করেছে। এই মরমি চিন্তার সাধক মনসুর আল-হাল্লাজের 'আনাল হক' বা 'আমিই সত্য' কিংবা তাপসী রাবেয়া বসরীকে নিয়ে যে কাহিনীর প্রচার হয়েছে, তা সুফিবাদীদের ধর্মীয় গূঢ়তত্ত্ব অনুধাবনে খুবই প্রাসঙ্গিক। আল্লাহর বৃহত্তর সত্তায় বিলীন হওয়াকে বলা হয় 'বাকা বিল্লাহ'। আল্লাহ যেহেতু বিমূর্ত সত্তা, তাই তাঁর মধ্যে বিলীন হওয়ার জন্য প্রয়োজন তাঁর প্রতি প্রেমোন্মাদনা। বেদান্ত দর্শন ও বৌদ্ধ দর্শনের সংস্পর্শে মুসলিম চিন্তায় সুফিবাদের উদ্ভব হয়েছে বলে অনেক চিন্তাবিদ মনে করেন। বিশ্বজগৎ যা আল্লাহর আপন রূপে (ওয়াজহু) গড়া, তাঁর কাছে তিনি নব নব রূপে আত্মপ্রকাশ করেন। একই কথা বেদান্তেও বলা হয়েছে : 'ব্রাহ্মণো রূপকল্পনা'- অর্থাৎ ব্রহ্ম আপনাকে নানা রূপে কল্পনা করেছেন। যেসব মুসলিম দার্শনিকের যৌক্তিক ও আধিবিদ্যক প্রচেষ্টার ফলে মুসলিম দর্শন বিস্তার ও বিকাশ লাভ করেছিল তাঁদের মধ্যে আল ফারাবি, ইবনে সিনা, ইমাম গাজ্জালি, ইবনে রুশদ, ইবনুল আরাবি, ইবনে খালদুন ও জালাল উদ্দিন রুমীর নাম বিশেষ উল্লেখযোগ্য। তাঁদের অনেকেই ছিলেন অ্যারিস্টটলের নিবেদিত সমর্থক ও শিষ্য এবং তাঁদের সময়কালকেই মুসলিম ধর্মীয় ভাবধারা ও দর্শনের স্বর্ণযুগ বলে অভিহিত করা যায়। এরপর মুসলমানদের ধর্মীয় ও দার্শনিক চেতনায় নেমে আসে এক দীর্ঘস্থায়ী দুঃখজনক স্থবিরতা। বহুধাবিভক্ত মুসলিম সমাজ ক্রমে অগ্রসর হয় পতনের দিকে। মুসলমানদের এই শোচনীয় অধঃপতন অনিবার্যভাবেই ভাবিত করে তোলে তৎকালীন কিছু মুসলমান চিন্তাবিদকে। এই দৈন্যদশা থেকে মুসলিম সমাজকে উদ্ধারের জন্য যাঁরা এগিয়ে এসেছিলেন, তাঁদের মধ্যে ওহাবি আন্দোলনের প্রবর্তক মোহাম্মদ ইবনে আবদুল ওহাব, জামাল উদ্দিন আফগানি, মিসরের মুফতি মোহম্মদ আবদুহু, ভারতের সৈয়দ আহমদ খান ও সৈয়দ আমীর আলীর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশে মুসলমানদের মধ্যে ইংরেজি শিক্ষা বিস্তারের মাধ্যমে তাঁদের সব রকম ধর্মীয় গোঁড়ামি দূর করার লক্ষ্যে যাঁরা সচেষ্ট হয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে নবাব আবদুল লতিফ, আবদুল আউয়াল জৌনপুরী, বেগম রোকেয়া, নবাব আবদুল করিম গজনবি ও খাজা সলিমুল্লাহর নাম বিশেষ উল্লেখ্য। তাঁদের কেউ কেউ আধুনিক শিক্ষার সঙ্গে ধর্মীয় মূল্যবোধকে জাগ্রত করতেও উৎসাহী ছিলেন। প্রশ্ন হতে পারে, ইসলামী দর্শন মুসলিম দর্শন থেকে আলাদা কোনো বিষয় কি না? সাম্প্রতিককালে কোনো কোনো চিন্তাবিদ মুসলিম দর্শন ও ইসলামী দর্শনের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয়ের জন্য সচেষ্ট হয়েছেন। কিন্তু উপরিউক্ত বিশ্বখ্যাত মুসলিম দার্শনিকদের চিন্তায় ও লেখায় সামগ্রিকভাবে বিষয়টি মুসলিম দর্শন হিসেবেই আলোচিত হয়েছে। 'ইসলাম দর্শন' নামে ১৯২০ সালে কলকাতা থেকে প্রকাশিত একটি মাসিক পত্রিকার মাধ্যমে ইসলাম দর্শন কথাটি পরিচিতি লাভ করে। এ পত্রিকাটি ছিল 'আঞ্জুমানে ওয়ায়েজীনে বাংলা' নামক একটি মুসলিম ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠনের মুখপত্র। ইসলাম ধর্ম ও সমাজবিষয়ক লেখাই এই পত্রিকায় ছাপা হতো। মোটকথা, এই যে 'মুসলিম দর্শন' কথাটির মধ্যে কোরআন ও হাদিসে বিধৃত দর্শন ছাড়াও সামগ্রিকভাবে মুসলিম চিন্তার আরো অনেক বিষয় এর আওতায় চলে আসে। অন্যদিকে 'ইসলাম দর্শন' বলতে শুধু কোরআন ও হাদিসের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ দার্শনিক ধারণাকে বোঝায়। বিষয়টি আরো সহজভাবে বলা যায়, মুসলিম দর্শনের বিস্তার ও ব্যাপ্তি বিশাল, পক্ষান্তরে ইসলামী দর্শনের ব্যাপ্তি কোরআন ও হাদিসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। মুসলিম দর্শন বা ইসলামী দর্শন যে নামেই একে আমরা অভিহিত করি না কেন, বাংলাদেশে দর্শনচর্চার ক্ষেত্রে যে ভাটা শুরু হয়েছিল, তা আজও চলছে। নতুন প্রজন্মের তরুণ-তরুণীরা দর্শনবিষয়ক ভাবনার ধার ধারে না। দর্শনের কথায় তারা নাক সিটকায়। কিন্তু মুসলমানদের ধর্মতাত্তি্বক ও দার্শনিক ঐতিহ্য পুনর্জাগরিত করতে হলে দর্শনচর্চায় অবশ্যই উৎসাহী হতে হবে। লেখক : কলামিস্ট ও তুলনামূলক ধর্ম বিষয়ের বিশ্লেষক