kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ১ ডিসেম্বর ২০২০। ১৫ রবিউস সানি ১৪৪২

কোরআন শরিফ অনুবাদের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

হাফেজ মুনির উদ্দীন আহমদ   

২ অক্টোবর, ২০১০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



কোরআন শরিফ অনুবাদের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

অনুবাদ বা ভাষান্তর এমনিতেই একটি জটিল বিষয়। কোরআনের মতো একটি আসমানি গ্রন্থের ব্যাপারে জটিলতার সঙ্গে স্পর্শকাতরতার বিষয়ও জড়িত। মানুষের তৈরি গ্রন্থের বেলায় বক্তার কথার হুবহু ভাষান্তর না হলে তেমন কী-ই বা আসে-যায়। বড়জোর বলা যায়, অনুবাদক মূল লেখকের কথাটার সঙ্গে যথাযথ ইনসাফ করতে পারেননি। কিন্তু কোরআনের ক্ষেত্রে বিষয়টি এতই গুরুত্বপূর্ণ যে অনুবাদের একটু হেরফের হলে স্বয়ং আল্লাহতায়ালার কথাই বিতর্কিত হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। এসব কারণেই মুসলমানদের মধ্যে কেউই দীর্ঘ সময় পর্যন্ত কোরআনের অনুবাদের ঝুঁকি নিতে চায়নি। এমনকি বিগত শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত মধ্য এশিয়ার আলেমরা ফতোয়ার মাধ্যমে তাতারি ভাষায় কোরআনের যাবতীয় অনুবাদ-প্রচেষ্টা বন্ধ রাখেন। আফ্রিকা মহাদেশে, বিশেষ করে নাইজেরিয়া ও নাইজারে হাউসা হচ্ছে আরবির পর সর্বাধিক সমৃদ্ধ ভাষা। এই ভাষার আলেমরা দীর্ঘদিন পর্যন্ত তাঁদের ভাষায় কোরআনের অনুবাদকে এই বলে বন্ধ করে রাখেন যে এতে কোরআনের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হবে। এই মহাদেশের ক্যামেরুনের সুলতান সাঈদ নিজেও আলেমদের প্রবল বিরোধিতার কারণে বামুম ভাষায় কোরআন অনুবাদের কাজ থেকে ফিরে আসেন। মুসলিম দুনিয়ায় শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ফতোয়া বোর্ডও তো এই সেদিন পর্যন্ত কোরআনের যাবতীয় অনুবাদকর্মের বিরোধিতা করে আসছিল। ১৯২৬ সালে তুরস্কে ওসমানী খেলাফত বিলুপ্তির পর তুর্কি ভাষায় কোরআন অনুবাদ-প্রচেষ্টার তারা বিরোধিতা করে। কোরআনের ইংরেজি অনুবাদক নওমুসলিম মার্মাডিউক পিকথল যখন কোরআনের অনুবাদ করার উদ্যোগ নেন, তখন হায়দরাবাদের শাসক নিজাম তাঁকে সর্বাত্মক সহযোগিতা দিলেও আল আজহার কর্তৃপক্ষ এ উদ্যোগের তীব্র বিরোধিতা করে। অবশ্য দীর্ঘদিন পর হলেও মক্কাভিত্তিক মুসলিম সংস্থা রাবেতা আল আলামে ইসলামী আয়োজিত বিশ্বের সর্বমতের ওলামারা কোরআন অনুবাদের একটি ঘোষণাপত্রে সই করে এ পথের যাবতীয় বাধা অপসারণ করেন। কিন্তু এটা তো ১৯৮১ সালের কথা, মাত্র সেদিনের ঘটনা। অবশ্য এরও বহু আগে ইংরেজ লেখক জর্জ সেল কোরআনের ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশ করেন। ১৭৩৪ সালে এই অনুবাদকর্মটির প্রথম খণ্ড প্রকাশিত হয়। ১৭৬৪ সালে তার পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ মুদ্রিত হয়। ১৮২৫ সালে এটি পুনর্মুদ্রিত হয়। আমরা যদি আজ কোরআনের ইতিহাস পর্যালোচনা করি তাহলে দেখতে পাব, কোরআন অনুবাদের এই মোবারক কাজটি স্বয়ং তাঁর হাতেই শুরু হয়েছে, যাঁর ওপর এই কোরআন নাজিল হয়েছে। আমরা জানি, আল্লাহর রাসুল তাঁর আন্দোলনের এক পর্যায়ে তৎকালীন বিশ্বনেতাদের কাছে ইসলামের দাওয়াত নিয়ে দূত পাঠাতেন। তাঁর পাঠানো এসব চিঠিতে অবশ্যই একাধিক কোরআনের আয়াত লেখা থাকত। যেসব দেশের রাজা-বাদশাহরা আরবি বুঝতেন না, রাসুলের দূত তাঁদের কাছে গোটা চিঠির সঙ্গে সেসব আয়াতের তরজমাও পেশ করতেন। এ কারণেই সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রনায়ক প্রিয় নবী (সা.) যে দূতকে যে দেশে পাঠাতেন, তাঁকে আগেই সে দেশের ভাষা শিখতে বলতেন। বেশির ভাগ নতুন এলাকায় তিনি পারদর্শী দোভাষীও পাঠাতেন। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সময়ের কোরআনের এসব আংশিক অনুবাদ ছিল অনেকটা মুখে মুখে। কোথাও লিখিত আকারে এগুলো কোরআনের আয়াতের অনুবাদ হিসেবে কেউ সংরক্ষণ করেননি। পরবর্তী সময়ে যখন কোরআনের বাণী নিয়ে আল্লাহর রাসুলের জানবাজ সঙ্গীরা দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়লেন, তখন এর প্রয়োজনীয়তা তীব্র হয়ে দেখা দিল। কোরআনের বিষয়বস্তু ও ভাষাশৈলীর স্পর্শকাতরতার কারণে এর গবেষকরা প্রথম দিকে নানা রকম আপত্তি উত্থাপন করলেও শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন ভাষায় কোরআন অনূদিত হতে শুরু করল। এভাবেই কোরআনের আবেদন মূল আরবি ভাষার পরিমণ্ডল ছাড়িয়ে বিভিন্ন ভাষায় ছড়িয়ে পড়ে। বাইরের পরিমণ্ডলে এসে সম্ভবত ফারসি ভাষায়ই সর্বপ্রথম কোরআন অনূদিত হয়েছে। প্রিয় নবী (সা.)-এর ইন্তিকালের প্রায় ৩৫০ বছর পর ইরানের সাসানি বাদশাহ আবু সালেহ মানসুর বিন নূহ কোরআনের পূর্ণাঙ্গ ফারসি অনুবাদ করেন। কোরআনের ফারসি অনুবাদের এই বিরল কাজের পাশাপাশি তিনি মুসলিম ইতিহাসের প্রথম পূর্ণাঙ্গ তাফসির গ্রন্থ ইমাম মোহাম্মদ বিন জারির আত তাবারির ৪০ খণ্ডে সমাপ্ত বিশাল আরবি 'তাফসির জামেউল বয়ান আত-তাওয়িলুল কোরআন'-এর ফারসি অনুবাদ করেন। আমাদের এ উপমহাদেশে শাহ ওয়ালী উল্লাহ মোহাদ্দেসে দেহলভী কোরআনের যে ফারসি অনুবাদ করেছেন, তা ছিল আরো ৮০০ বছর পরের ঘটনা। প্রায় একই সময়ে অর্থাৎ ১৭৭৬ সালে শাহ রফিউদ্দীন এবং ১৭৮০ সালে শাহ আবদুল কাদের কোরআনের উর্দু অনুবাদ করেন। বাংলা ভাষায় কোরআন অনুবাদের কাজটি আসলেই অনেক দেরিতে শুরু হয়েছে। এর পেছনে কারণও ছিল অনেক। প্রথমত, আমাদের এই ভূখণ্ডে যাঁরা কোরআনের ইলমের সঙ্গে সুপরিচিত ছিলেন, সেই কোরআনসাধকদের অনেকেরই কোরআনশিক্ষার প্রাণকেন্দ্র ছিল ভারতের উর্দুপ্রধান এলাকার ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি প্রতিষ্ঠান দেওবন্দ, সাহারানপুর, নদওয়া, জামেয়াতুল এসলাহ্, জামেয়াতুল ফালাহসহ উর্দু ভাষাভিত্তিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। এর সব কটির ভাষাই ছিল উর্দু কিংবা ফারসি। তাই স্বাভাবিকভাবেই এসব দ্বীনি প্রতিষ্ঠান থেকে যাঁরা উচ্চতর সনদ নিয়ে বের হন, তাঁদের কোরআন গবেষণার পরিমণ্ডলও সে ভাষার বাইরে ছড়াতে পারেনি। কে প্রথম কোরআনের বাংলা অনুবাদের সৌভাগ্যজনক এ কাজটি শুরু করেন, তা নিয়ে আমাদের মধ্যে বিভ্রান্তির অন্ত নেই। কে বা কারা আমাদের সমাজে এ কথাটি চালু করে দিয়েছে যে ব্রাহ্মধর্মের নব বিধানমণ্ডলীর নিষ্ঠাবান ধর্মপ্রচারক গিরিশ চন্দ্র সেন সর্বপ্রথম কোরআনের বাংলা অনুবাদ করেছেন। আসলে আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতিতে দীর্ঘদিন ধরে যাঁদের সর্বময় আধিপত্য বিরাজমান, তাঁরাই যে কথাটা ছড়িয়েছে, তাতে সন্দেহ নেই। দুঃখ লাগে, যখন দেখি আমাদের এ অঞ্চলের দু-একজন কোরআনের মুদ্রাকর ও প্রকাশকও তাঁদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থে ঐতিহাসিকভাবে অসমর্থিত এমন একটি কথা অবাধে প্রচার করে চলেন। অথচ কোরআন ও কোরআনের শিক্ষার প্রতিটি ছাত্রই জানেন যে তাঁর অনুবাদের পাতায় কোরআনের শিক্ষা সৌন্দর্য বাক-ধারার সঙ্গে ব্রাহ্মণ্যবাদের প্রচারনীতিতে কোরআনের প্রতি ক্ষমাহীন বিদ্বেষ ছড়ানো রয়েছে। গিরিশ চন্দ্র সেনের ছয় বছর আগে অর্থাৎ ১৭৭৯ সালে আরেকজন অমুসলিম রাজেন্দ্রলাল মিত্র কোরআনের প্রথম পারার অনুবাদ করেন। কলকাতার আয়ুর্বেদ প্রেস নামের একটি ছাপাখানা থেকে এক ফর্মার (১৬ পৃষ্ঠা) এই অনুবাদটি ৫০০ কপি ছাপাও হয়েছিল। ১৮৮৫ সালে গিরিশ চন্দ্র সেনের অনুবাদের প্রায় ৮০ বছর আগে অর্থাৎ ১৮০৮ সালে পূর্ব বাংলার রংপুর নিবাসী এক সাধারণ কোরআন-কর্মী মাওলানা আমীরুদ্দীন বসুনিয়া কোরআনের প্রথম বাংলা অনুবাদের কাজে হাত দেন। তিনি সে সময় কোরআনের আমপারার অনুবাদ সম্পন্ন করেন। এই ঐতিহাসিক তথ্যের সমর্থন রয়েছে ঢাকা ও কলকাতার প্রায় সব কজন কোরআন গবেষকের লেখায়। উভয় বাংলার প্রায় সব কটি কোরআন গবেষণা সংস্থা, প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানই এ ব্যাপারে একমত যে মাওলানা আমীরুদ্দীন বসুনিয়াই সে সৌভাগ্যবান মানুষ, যিনি বাংলা ভাষায় কোরআন অনুবাদের এই মহান কাজটির শুভ সূচনা করেছেন। এক দশকে আমাদের দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষায় কোরআন অনুবাদের ইতিহাসের ওপর যেসব পিএইচডি থিসিস লেখা হয়েছে, তাতেও এ তথ্য সমভাবে সমর্থিত হয়েছে। ১৮১৫ সালে বাংলা মুদ্রণযন্ত্রের ব্যবহারের পরপর কলকাতার মীর্জাপুরের পাঠোয়ার বাগানের অধিবাসী আকবর আলী এ কাজে এগিয়ে আসেন। তিনিও মাওলানা আমীরুদ্দীন বসুনিয়ার মতো শুধু আমপারা ও সুরা ফাতেহার বাংলা অনুবাদ সম্পন্ন করতে পেরেছিলেন। তাঁর অনূদিত অংশটি ছিল পুঁথির মতো। তাঁর এ অনুবাদটি কোরআনের কোনো মৌলিক অনুবাদও ছিল না। তিনি যেটা করেছেন, তা ছিল ১৭৮০ সালে অনূদিত শাহ আবদুল কাদেরের উর্দু অনুবাদের বাংলা। সরাসরি কোরআনের অনুবাদ নয় বলে সুধী মহলে এটা তেমন স্বীকৃতি লাভ করেনি। আসলে ব্যক্তি যত গুরুত্বপূর্ণই হন না কেন, তিনি যদি কোরআনকে কোরআন থেকে অনুবাদ না করেন, তাহলে তাকে কখনো কোরআনের অনুবাদ বলে চালিয়ে দেওয়া উচিত নয়। কোরআনের ব্যাকরণ, বিধি, বিশেষ বাক-ধারা, ভাষাশৈলী, শিল্প সৌন্দর্য_সর্বোপরি কোরআনের 'ফাছাহাত বালাগাত' না জেনে এর অনুবাদে হাত দেওয়া কারোই উচিত নয়। প্রথম অনুবাদক মাওলানা আমীরুদ্দীন বসুনিয়া কোরআনের পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ করে যেতে পারেননি। পরবর্তী সময়ে গিরিশ চন্দ্র সেনের পূর্ণাঙ্গ অনুবাদকর্ম, যেটা তখন বাজারে প্রচলিত ছিল, তাও ছিল নানা দোষে দুষ্ট। তাই তাঁর অনুবাদের মাত্র দুই বছরের মধ্যেই কোরআনের বিশ্বস্ত ও পূর্ণাঙ্গ অনুবাদকর্ম নিয়ে হাজির হয়েছেন বিখ্যাত কোরআন গবেষক মাওলানা নায়ীমুদ্দীন। এর আগে কলকাতার এক ইংরেজ পাদ্রিও কোরআনের অনুবাদ করেছিলেন। শোনা যায়, মাওলানা আমীরুদ্দীন বসুনিয়া থেকে গিরিশ চন্দ্র সেন পর্যন্ত, অর্থাৎ ১৮০৮ থেকে ১৮৮৫ সালের মধ্যে আরো ৯ ব্যক্তি কোরআন অনুবাদ করেছেন। আল্লাহতায়ালার শোকর, আল-কোরআন একাডেমী লন্ডন চলতি বছরকে বাংলা ভাষায় কোরআন অনুবাদের ২০০ বছর পূর্তি বছর হিসেবে উদ্যাপন করার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় এ বিষয়ে আরো অনেক অজানা তথ্য জনসমক্ষে আসতে শুরু করেছে। লেখক : মহাপরিচালক, আল-কোরআন একাডেমী, লন্ডন

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা