kalerkantho

সোমবার  । ১৯ শ্রাবণ ১৪২৭। ৩ আগস্ট  ২০২০। ১২ জিলহজ ১৪৪১

কামালপুর যুদ্ধ
(৩১ জুলাই-৪ ডিসেম্বর ১৯৭১)
জামালপুর

কামালপুর রণক্ষেত্রের কিছু স্মৃতি

হারুন হাবীব   

১৬ ডিসেম্বর, ২০১৪ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



কামালপুর রণক্ষেত্রের কিছু স্মৃতি

ময়মনসিংহ তখন বৃহত্তর জেলা। জামালপুর জেলা হয়েছে পরে। তারও পরে শেরপুর। এ দুই জেলার সর্বশেষ উত্তরে কামালপুর, পাকিস্তানি বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত চৌকি, গারো পাহাড়ের পাদদেশে। আমার মতো অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতির রণাঙ্গন কামালপুর, যে নাম আজও রোমাঞ্চিত করে।

এপ্রিল থেকে ডিসেম্বরের ৪ তারিখ পর্যন্ত কামালপুর ঘিরে পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে আমাদের লাগাতার যে লড়াই চলে, মুক্তিযুদ্ধের সম্মুখসমরের ইতিহাসে তা অবিস্মরণীয় এক অধ্যায়। একের পর এক ভয়ংকর, রক্তাক্ত লড়াই-অগণিত সব মৃত্যু। অগণিত নারীর আর্তনাদ, অগণিত ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ, অগণিত সহযোদ্ধার রক্তে ভেসেছে কামালপুরের মাটি। কত কবর খুঁড়তে হয়েছে সহযোদ্ধাদের জন্য, ভাবতে কষ্ট হয় আজও। এখানে মরেছে পাকিস্তানি বাহিনীর অসংখ্য সদস্য।

ছোটবড় অসংখ্য যুদ্ধের স্মৃতি আছে এই কামালপুরে। লাগাতার গোলাগুলি হয়েছে ধানুয়ার মুক্তিযোদ্ধা বাংকার এবং পাকিস্তানিদের কামালপুর ক্যাম্পের মধ্যে। ৩১ জুলাই হয়ে উঠেছিল একটি ভয়ংকর রাত। ক্যাপ্টেন সালাউদ্দিন মমতাজের নেতৃত্বে রাত গভীরে সন্তর্পণে এগিয়ে গেছে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল। পাকিস্তানি বিওপিতে আঘাত করে হানাদার বাহিনীকে হটাতে মরিয়া হয়ে অগ্রসর হচ্ছিলেন বেঙ্গল রেজিমেন্টের মুক্তিযোদ্ধারা। সে রাতের যুদ্ধটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের সম্মুখসমরের ভয়ংকর এক যুদ্ধ, যা ইতিহাসে স্থান পাওয়ার যোগ্য। যুদ্ধের একপর্যায়ে ক্যাপ্টেন সালাউদ্দিন পাকিস্তানি সেনাদের বাংকারে ঢুকে পড়লেন। অসমসাহসী এই মুক্তিযোদ্ধা হাতাহাতি যুদ্ধে লিপ্ত হলেন পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে। পরাস্ত করলেন অনেককে। শেষ পর্যায়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হলেন তিনি। শহীদ হলেন আরো দুজন, আহত হলেন বেশ কজন। সামরিক দিক থেকে সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ছিল কামালপুর। কামালপুর দখলে নিলে বকশীগঞ্জ, শেরপুর, জামালপুর, টাঙ্গাইল হয়ে ঢাকার দিকে অগ্রসর হওয়াটা ছিল কৌশলগতভাবে সহজ। সেক্টর কমান্ডার সেদিকটা বিবেচনায় রেখেই যুদ্ধ পরিকল্পনা করেছেন। মেজর আবু তাহের সশরীরে যুদ্ধ পরিচালনা করেছেন।

তাহেরের পরিকল্পনা ছিল নির্ভুল। গেরিলা পদ্ধতি অবলম্বন করে প্রচলিত যুদ্ধরীতির আমূল পরিবর্তন ঘটিয়েছিলেন তিনি। শুধু কামালপুর নয়, বৃহত্তর ময়মনসিংহের প্রতিটি জায়গায় ছোট ছোট গেরিলা দল পাঠিয়ে নাস্তানাবুদ করে তুলেছিলেন পাকিস্তানি সেনাদের। তাঁরই পরিকল্পনায় আঘাতের পর আঘাতে জামালপুর, শেরপুর, নেত্রকোনা, উলিপুর, চিলমারী, বাহাদুরাবাদ, দেওয়ানগঞ্জসহ নানা অঞ্চলের পাকিস্তানি বাহিনীকে পর্যুদস্ত করা হয়েছিল।

অক্টোবরের মাঝামাঝি এবং মূলত নভেম্বর থেকে যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি বদলে যায়। পাকিস্তানি অবস্থানগুলোতে আক্রমণের মাত্রা বাড়িয়ে দেওয়া হয়। ১৩ নভেম্বর রাত। সিদ্ধান্ত হলো, শেষরাতে কামালপুরের ওপর একযোগে আক্রমণ চলবে। আমার অবস্থান হলো কামালপুরের পশ্চিম পাশে খাসিরহাট গ্রামের একটি ধানক্ষেতে। ঐতিহাসিক এই যুদ্ধে যার যার দল নিয়ে তিন দিক থেকে কামালপুর আক্রমণ করেন কম্পানি কমান্ডার সৈয়দ সদরুজ্জামান হেলাল, হেলালুজ্জামান পান্না, লে. এম এ মান্নান, লে. মিজান, আবু সাঈদ খান, জয়নাল আবেদীন ও আখতার আহমেদ। আমি ছিলাম লে. মান্নান ও আবু সাঈদের সঙ্গে। এ ছাড়া থাকেন মেজর আবু তাহেরের বড় ভাই আবু ইউসুফ খান, তাহেরের দুই ছোট ভাই বাহার ও ওয়ারেসাত হোসেন বেলাল, এনায়েত হোসেন সুজা, মিজানুর রহমান খান মিঠু ও ইয়াকুব। আজ সবার নাম মনে করতে না পারায় আমি লজ্জিত।

রাত ৩টা ৪৫। শুরু হলো আক্রমণ। 'জয় বাংলা' স্লোগানের সঙ্গে চলতে থাকে বৃষ্টির মতো গোলাগুলি। অতর্কিত আক্রমণে হকচকিত হলো পাকিস্তানিরা। তারা পাল্টা গুলিবর্ষণ করে জীবন বাঁচাতে চেষ্টা করল। ভয়ংকর, হৃদয়বিদারক গোলাগুলির কানফাটা শব্দরাজি। নারকীয় সে সময়টিতে, কেন জানি না, আমার টেপরেকর্ডার চালু করে রাখি আমি। প্রতিমুহূর্তে মৃত্যু গা ছুঁয়ে যাচ্ছে। শত শত বুলেট উড়ে যাচ্ছে আশপাশ দিয়ে। মর্টার ফাটছে একের পর এক। আর্টিলারির শেলগুলো বিকট শব্দে ফেটে মাটি, গাছপালা উপড়ে ফেলছে। কিন্তু না, পিছিয়ে আসার সুযোগ নেই, মুক্তিযোদ্ধারা দুর্বার।

বিস্ময়কর যে ভয়ংকর আক্রমণের পরও পাকিস্তানিরা সেই রাতে আত্মসমর্পণ করল না। দ্রুত বাংকারে ঢুকে সেখান থেকে আত্মরক্ষার চেষ্টা করল ওরা। ব্যাপক হতাহত মেনে নিয়েও শেষরক্ষার চেষ্টা করল। এরই মধ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে চলে এলো শত্রুপক্ষের অনেকগুলো বাংকার, প্রচুর গোলাবারুদ। আনন্দে আত্মহারা আমরা। দেখলাম সূর্য উঠছে।

নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে আরেক পর্যায় শুরু হলো যুদ্ধের। ২৪ নভেম্বর থেকে ৩ ডিসেম্বর। এই ১১ দিন মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে অবরুদ্ধ থাকল রণক্ষেত্র কামালপুর। ভয়ংকর অবরোধ ভেদ করে পাকিস্তানি সেনাদের জন্য কোনো রকম সাহায্য-সরবরাহ লাভ করা সম্ভব হলো না। নানা দিক থেকে ওরা অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করল। সফল হলো না। বকশীগঞ্জ-কামালপুরের মধ্যে প্রতিটি সড়কে অ্যামবুশ বসানো হলো। পাকিস্তানিদের বহু যানবাহন ধ্বংস হলো। মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে অনেক পাকিস্তানি সেনা হয় মারা গেল, নয় ধরা পড়ল। ভয়ংকর এক হতাশার মধ্যে পড়ল হানাদার বাহিনী।

৩ ডিসেম্বর পাকিস্তান-ভারতের মধ্যে প্রত্যক্ষ যুদ্ধ শুরু হলো। সেদিনই গঠিত হলো বাংলাদেশ-ভারত যৌথ সামরিক কমান্ড। নেতৃত্বে থাকলেন ভারতীয় বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় প্রধান লে. জে. জগজিৎ সিং অরোরা। নাটকীয় পরিবর্তন ঘটল যুদ্ধের। শত শত ভারতীয় সামরিক যান আসতে শুরু করল সীমান্তে। ভারতীয় ৯৫ মাউন্টেন ব্রিগেডের অধিনায়ক ব্রিগেডিয়ার ক্লেয়ার নিজে এসে উপস্থিত হলেন। কোনো রকম লোকক্ষয় না করে মিত্র ও মুক্তিবাহিনী যৌথভাবে সিদ্ধান্ত নিল, কামালপুরের পাকিস্তানি সেনাদের আত্মসমর্পণ করাতে হবে।

৪ ডিসেম্বর আরেক স্মৃতিময় দিন আমাদের। উপস্থিত মুক্তিযোদ্ধাদের সামনে প্রস্তাব রাখা হলো : কে যাবে আত্মসমর্পণের চিঠি নিয়ে পাকিস্তানি ক্যাম্পে? হাতে থাকবে সাদা পতাকা, পকেটে আত্মসমর্পণের চিঠি। যৌথ বাহিনীর স্থানীয় কমান্ডার চিঠিতে লিখলেন : নির্ধারিত সময়ে আত্মসমর্পণ না করলে একযোগে আক্রমণ চলবে, এমনকি বিমান থেকে আঘাত করা হবে।

কিন্তু কে মেনে নেবে অবধারিত মৃত্যু? যে কামালপুরে ৯ মাস ধরে বিরামহীন রক্তপাত ও ধ্বংসযজ্ঞ চলছে, সেই কামালপুরে কে যাবে আত্মসমর্পণের চিঠি নিয়ে! কিন্তু সব উৎকণ্ঠা উপেক্ষা করে তরুণ বসির আহমদ রাজি হলো। অবধারিত মৃত্যু উপেক্ষা করে বসির যাত্রা শুরু করল কামালপুরের পথে। আমরা সেই দৃশ্য তাকিয়ে দেখলাম। সময় পেরিয়ে গেলেও বসির না ফেরায় এবার গেল আরেক দুঃসাহসী মুক্তিযোদ্ধা আনিসুল ইসলাম সঞ্জু। মিত্রবাহিনীর কর্মকর্তারা বিস্ময়ে হতবাক হলেন।

কিন্তু দীর্ঘক্ষণ সময় গেলেও কেউ ফিরে এলো না। আমরা মুষড়ে পড়ি। হয় পাকিস্তানিদের গুলিতে ওরা মারা গেছে, নয়তো মাইনে উড়ে গেছে ওদের শরীর। নির্ধারিত সময়ে কামালপুরের ওপর দিয়ে বেশ কয়েকবার বিমান উড়তে দেখা গেল। পাকিস্তানিরা প্রমাদ গুনল। হঠাৎ দেখা গেল, সঞ্জু ফিরে আসছে। বসির রয়ে গেল ক্যাম্পেই। এসে জানাল, পাকিস্তানি সেনারা আত্মসমর্পণে রাজি হয়েছে।

এরপর ঘটল ৪ ডিসেম্বরের ঐতিহাসিক আত্মসমর্পণ। বাংলাদেশের মাটিতে পাকিস্তানি নিয়মিত বাহিনীর প্রথম আত্মসমর্পণ। হাত তুলে লাইন বেঁধে কামালপুর থেকে বেরিয়ে আসতে থাকল পরাস্ত পাকিস্তানি সেনারা। পরাজয়ের গ্লানি সবার চোখে-মুখে। একজন ক্যাপ্টেনের নেতৃত্বে ১৫০ জনেরও বেশি নিয়মিত বাহিনীর সদস্য, ৩০ জনের ওপর রেঞ্জার ও মিলিশিয়াসহ বেশ কিছু স্থানীয় রাজাকার। লক্ষ করলাম, পাকিস্তানি সেনারা মুক্তিবাহিনীর কাছ থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকার চেষ্টা করছে। কিছুতেই কাছে ভিড়ছে না। সামনাসামনি তাকাতেও ভয় পাচ্ছে। ভারতীয় সেনারা জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী ওদের নিরাপত্তা বিধান করল।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেবে, কামালপুর রণক্ষেত্রের পতন মুক্তিযুদ্ধের সার্বিক বিজয়কে কতটা ত্বরান্বিত করেছিল। আশপাশের গ্রাম থেকে আসা হাজার হাজার মানুষ 'জয় বাংলা' স্লোগানে চারদিক প্রকম্পিত করে তুলল। ৬ ডিসেম্বর মুক্ত হলো দেওয়ানগঞ্জ, বকশীগঞ্জ ও শেরপুর। আমরা মুক্তিযোদ্ধারা মিত্রবাহিনীর সঙ্গে একযোগে যাত্রা করেছি শেরপুর, জামালপুরের পথে। ১০ ডিসেম্বর মুক্ত হলো জামালপুর। ক্যাপ্টেন আজিজের নেতৃত্বে অগ্রবর্তী অভিযানে চলে গেছে তিন মুক্তিযোদ্ধা-কম্পানি। টাঙ্গাইলের কাদের সিদ্দিকীর বাহিনীসহ ভারতীয় মিত্রবাহিনীর হাজার হাজার সেনা এরই মধ্যে পৌঁছে গেছে ঢাকার উপকণ্ঠে। পথে আহত হওয়ার কারণে ১৬ ডিসেম্বর রমনার রেসকোর্সের ঐতিহাসিক আত্মসমর্পণ দেখার সুযোগ আমার হলো না। আহত হয়ে পড়ে রইলাম ময়মনসিংহের হাসপাতালে। আমি ঢাকার আত্মসমর্পণ দেখিনি, সে এক বড় দুঃখ জীবনের, কিন্তু আমি রণক্ষেত্র কামালপুরে পাকিস্তানিদের প্রথম আত্মসমর্পণ দেখেছি।

 

মন্তব্য