kalerkantho

বুধবার । ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২ । ১৩ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

হাসির জাদুঘর

মাসুম মাহমুদ   

২৭ জুন, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



হাসির জাদুঘর

অলংকরণ : সারা টিউন

হাসির জাদুঘর দেখতে যাবে ওরা। বুড্ডির জন্য বেরোতেই পারছে না। দরজায় পা বাড়ালেই বুড্ডি এসে মেঝেতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। সেও ওদের সঙ্গে যেতে চাইছে নাকি? হতে পারে! সকালে বাবা যখন তামিমকে হাসির জাদুঘর দেখাতে নিয়ে যাবে বলছিল, পাশেই চুপটি মেরে বসে ছিল দুষ্টু বুড্ডি।

বিজ্ঞাপন

নিশ্চয় ওদের সব কথা শুনেছে। শুনলেই কী! বুড্ডিকে সঙ্গে নেওয়া যাবে না, অনেক দুষ্টামি করে সে; গিয়ে জাদুঘর একেবারে তছনছ করে ফেলবে। সে জন্যই বুদ্ধি করে বুড্ডিকে পাশের ঘরে মাছ খেতে দিয়ে ওরা চুপিচুপি বেরিয়ে পড়ে।

কিন্তু এ কী কাণ্ড! বুড্ডি ওদের আগেই এসে হাজির। দেখে তামিমের বাবা মিটিমিটি হাসে। বলে, ‘দুষ্টু বুড্ডি ওই যে পুরনো ট্রাংকটার ওপর বসে আছে দেখছ, ওটাই হাসির জাদুঘর। ’

‘কিন্তু এখানে হাসি কোথায়, বাবা?’

‘এখন আমরা জাদুঘরে প্রবেশ করব। এখনই দেখতে পাবে কত কত হাসি। ’

তামিমের বাবা বুড্ডিকে কোলে নিয়ে ট্রাংকের ঢাকনা খোলে, ভেতর থেকে একটা খাতা বের করে। অনেক দিনের পুরনো খাতাটা দেখে তামিম জানতে চায়, ‘এই খাতায় কী আছে?’

‘এই খাতার ভাঁজে ভাঁজে ডাকটিকিট আছে। ’

‘ডাকটিকিট হাসে, বাবা!’

‘ডাকটিকিট হাসে না, কিন্তু ডাকটিকিটে হাসি আছে। ’

‘ডাকটিকিটে হাসি কেমন করে হয়?’

‘ডাকটিকিটে হাসি কেমন করে হয়! এই দেখো,’ বলেই খাতার পাতা ওল্টায় বাবা। ভেতরে নানা ধরনের ডাকটিকিট দেখে তামিমের ছানাবড়া চোখ, ‘কত্ত ডাকটিকিট!’

‘হ্যাঁ! ডাকটিকিটে যে ছবিগুলো দেখছ, এরা সবাই মজার মানুষ। ’

খাড়া খাড়া চুলের একটা হাসিমুখের ছবি দেখে তামিমও হাসে, ‘হিহি, এটা কার ছবি, বাবা?’

‘এটা আলবার্ট আইনস্টাইনের ছবি, বিরাট বড় বিজ্ঞানী। এই যে আরেকটা হাসিমুখের ছবি দেখছ, তার নাম এলভিস প্রিসলি, সে গানও গাইত আবার অভিনয়ও করত। ’

‘এই দুইটা কোন দেশের ডাকটিকিট?’

‘একটা ইতালির, আরেকটা আমেরিকার,’ বাবা বলল।

পরের পাতায় চোখ রেখে সে কী আনন্দ তামিমের—‘হুররররররে! শচীন টেন্ডুলকার!’

‘এই ডাকটিকিটটা কিছুদিন আগে সংগ্রহ করে এখানে রেখেছি, তোমার জন্য। ’

‘আমার জন্য!’ তামিম অবাক।

‘হ্যাঁ, তুমিও শচীন টেন্ডুলকারকে পছন্দ করো তাই। ’

‘এই টিকিট নিয়ে মাঠে খেলা দেখা যাবে, বাবা?’

‘তামিমের কথা শুনে বাবা হাসে, ‘হা হা হা। ’ বলে, ‘এই টিকিট দিয়ে মাঠে খেলা দেখা যায় না, এটা হলো ভারতের ডাকটিকিট। এটা দিয়ে ভারতের মানুষ চিঠি পোস্ট করতে পারে। ’

‘চিঠি! তুমিও চিঠি লেখো?’

‘চিঠি লিখতে খুব ভালো লাগে আমার, ছোটবেলায় আমি যখন শহরে থেকে লেখাপড়া করতাম, তখন গ্রামে তোমার দাদার কাছে অনেক চিঠি লিখে পাঠিয়েছি। তুমিও চিঠি লিখবে?’

‘আমি! কাকে চিঠি লিখব?’

‘বুড্ডিকেও লিখতে পারো!’

‘বুড্ডি তো পড়তেই পারবে না। ’

‘তাইতো! এখন তাহলে উপায়?’

‘বুড্ডির জন্য একটা টিচার রেখে দাও বাবা। টিচারের কাছে ও পড়তে শিখবে। ’

‘ঠিক বলেছ। কিন্তু বুড্ডি যা দুষ্টু! বাঘ মামা ছাড়া কারো কাছে পড়তেই চাইবে না। এখন বাঘ মামাকে কোথায় পাব? সে তো থাকে সুন্দরবনে। ’

বাঘ মামাকে নিয়ে কী যেন একটা বলতে চাইল তামিম, অমনি একটা ডাকটিকিটে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবি দেখে লাফিয়ে ওঠে। জানতে চায়, ‘এটা কোন দেশের ডাকটিকিট, বাবা?’

‘এটা হলো ভারতের ডাকটিকিট। ’

‘দেখো না! ভারতের ডাকটিকিটে রবি দাদু হাসছেই না। ’

‘কী করে হাসবে? তুমি আজ রবি দাদুর একটাও ছড়া পড়েছ?’

‘না তো!’

‘সে জন্যই দাদু হাসছে না। ’

আরেকটা ডাকটিকিটে মোরগের ছবি দেখে তামিমের খুব কৌতূহল, ‘মোরগের ছবি দিয়েও ডাকটিকিট হয়?’

বাবা বলল, ‘হয়। এটা বনমোরগের ছবি। এই যে দেখো, বাংলাদেশের ডাকটিকিটে ইলিশ মাছের ছবি আছে, প্রজাপতি আছে, বালিহাঁসের ছবি আছে, বাঘ মামার ছবিও আছে। ’ ডাকটিকিটগুলো দেখাতে দেখাতে বাবা বলল, ‘এরা সবাই কী সুন্দর হাসছে, তাই না?’

‘প্রজাপতি, মাছ, হাঁস এরাও বুঝি হাসে? আমি তো এদের কারোর মুখেই হাসি দেখছি না, বাবা। ’

‘আমি তো সবার মুখেই হাসি দেখি, বেটা। পাহাড়ের মুখে, সমুদ্রের মুখে, নদীর মুখে, ফুলের মুখে, পাখির মুখেও। আরেকটু বড় হয়ে তুমিও নিশ্চয় দেখবে,’ বাবা বলল। ’

‘বাংলাদেশের ডাকটিকিটে মানুষের ছবি নেই?’

‘খাতার পৃষ্ঠা ওল্টাও। দেখবে পল্লীকবি জসীমউদ্দীন, ভাষাশহীদ আব্দুল জব্বার, বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন, এ কে ফজলুল হক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, আরো কত কত মানুষের ছবি আছে।

তোমাকে একদিন এই মহান মানুষগুলোর গল্প শোনাব। ’

‘এত ডাকটিকিট কোথায় পেলে তুমি?’

‘জমিয়েছি। আমি যখন তোমার মতো ছোট, তখন থেকেই ডাকটিকিট সংগ্রহ করার শখ আমার। তোমার দাদাও ডাকটিকিট সংগ্রহ করতেন। তুমিও করবে?’

‘আমি! হ্যাঁ, করব। ’

‘বুড্ডির কাছে লেখা তোমার চিঠি পোস্ট করতে কাল সকালে আমরা যখন ডাকঘরে যাব, তোমার জন্য ডাকটিকিট সংগ্রহ করব। ওটা দিয়েই জমাতে শুরু করবে, কেমন!’ এই কথা শুনে তামিমদের বাড়ির বিড়াল বুড্ডি ধিন ধিন করে নেচে উঠল।

সকালে ডাকঘরে চিঠি পোস্ট করতে এসে তামিম আর ওর বাবা দেখে—এ কী! দুষ্টু বুড্ডি এখানেও এসে হাজির! ডাকবাক্সের টাক মাথায় বসে কী সুন্দর গোঁফে তা দিচ্ছে সে। দেখে ওরা হাসছে। ওদের সঙ্গে সঙ্গে ডাকবাক্সও হাসছে মুখ হাঁ করে।



সাতদিনের সেরা