kalerkantho

সোমবার ।  ১৬ মে ২০২২ । ২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ১৪ শাওয়াল ১৪৪৩  

কমিকসম্যান

নারায়ণ দেবনাথ। তোমাদের জন্য এঁকেছেন-লিখেছেন ‘নন্টে-ফন্টে’, ‘বাঁটুল দি গ্রেট’, ‘হাঁদা ভোঁদা’, ‘বাহাদুর বেড়াল’সহ অসংখ্য কমিকস। জন্ম ১৯২৫ সালের ২৫ নভেম্বর; কলকাতার হাওড়ায়। প্রিয় মানুষটি গত ১৮ জানুয়ারি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। নারায়ণ দেবনাথের সঙ্গে বেশ কয়েকবার দেখা হয়েছিল আশিক মুস্তফার। সে অভিজ্ঞতার কথাই লিখেছেন তিনি

২৪ জানুয়ারি, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



কমিকসম্যান

নারায়ণ দেবনাথের সঙ্গে বাঁটুল, আঁকা : মাসুম

অ্যাকোয়ারিয়ামের তেলাপিয়া মাছ। আর তা দেখে চক্ষু চড়কগাছ! বললাম, এই রে; অ্যাকোয়ারিয়ামে কেউ তেলাপিয়া পোষে? তিনি হেসে বলেন, ‘এটা অর্কের কাজ। যা করে না পাগলাটা!’ এই বলে ছোট্ট অর্ককে ডাকলেন। চোখে মোটা গ্লাসের চশমা পরা ভারিক্কি ভাব নিয়ে এলো অর্ক।

বিজ্ঞাপন

এসেই পরিচয় করিয়ে দিল অ্যাকোয়ারিয়ামে পোষা প্রিয় তেলাপিয়া মাছটার সঙ্গে। অর্ক প্রায়ই অ্যাকোয়ারিয়ামের মাছের সঙ্গে কথা বলে। কথা বলেন নারায়ণ দেবনাথও। কী বলেন? মনের কথা। এই মনের কথা বলা মানুষটা শুধু তাঁর নিজের নয়, বলতে পারতেন তোমাদেরও মনের কথা। তাই তো তিনি হাঁদা ভোঁদা, বাঁটুল দি গ্রেট, নন্টে ফন্টে, বাহাদুর বেড়াল, ডানপিটে খাঁদু আর তাঁর কেমিক্যাল দাদুসহ অসংখ্য কমিকস-গল্প লিখেছেন তোমাদের মনের কথা দিয়ে। মনের কথা বলা এই আঁকিয়ে নারায়ণ দেবনাথের বাড়ি কলকাতার হাওড়ার শিবপুরে। এই শিবপুরেই তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা। তবে তাঁর বাবা হেমচন্দ্র দেবনাথ আর মা রমলা দেবী বাংলাদেশের বিক্রমপুর থেকে কলকাতার হাওড়ার শিবপুরে যান দেশ ভাগের অনেক আগে। তাই বাংলাদেশের প্রতি তাঁর অন্য রকম টান। এখানেই যে নারায়ণ দেবনাথের দাদার বাড়ি। তিনি প্রায়ই দাদাবাড়ির গল্প করতেন আমার সঙ্গে। আমি কলকাতায় গেলে কী করে যেন খোঁজ পেয়ে যায় অর্ক। ও, অর্কের কথা তো বলাই হয়নি। অর্ক নারায়ণ দেবনাথের নাতি। দাদা নেওটে! দিনমান দাদার গায়ে গায়ে লেগে থাকে। এই অর্কই নারায়ণ দেবনাথকে খবর দেয় কলকাতায় গেলে। তিনি আমাকে ফোন দিতেন। কাঁপা স্বরে বাসায় ডাকতেন। তারপর রাজ্যের গল্প। একবার বললাম, আচ্ছা, হাঁদা-ভোঁদা মানে রোগা আর মোটা সমবয়সী দুই ছেলের আদলটা কোত্থেকে এনেছেন আপনি; আর এই মোটা-হ্যাংলার রহস্যটাই বা কি? তিনি বলেন, ‘আরে কোনো রহস্য-টহস্য না, বলতে পারো এখানে নিজের জীবনকেই তুলে ধরেছি। আসলে আমি ছোটবেলায় গোলগাল ছিলাম। তাই একটা চরিত্র আমার মতো করে আরেকটা পাতলা করে এঁকে দিলাম। ব্যস, হয়ে গেল। আর ছোটরা তো এমন মোটা-চিকনা চরিত্রেই আনন্দ পায়! তবে সত্যিই যে এত আনন্দ আর মজা পেয়ে যাবে, তা আমি ভাবতেও পারিনি!’

তোমরা যারা রোগা আর মোটা হাঁদা-ভোঁদার কাণ্ডকীর্তি এখনো পড়োনি, পড়ে নিতে পারো। তার আগে দুই বন্ধু নন্টে-ফন্টের কথা শোনো নারায়ণ দেবনাথের মুখেই, ‘পশ্চিম বাংলার কোনো এক অজানা মফস্বল শহরের একটা বোর্ডিং স্কুলে পড়ে নন্টে-ফন্টে। সেই বোর্ডিং স্কুলের ছোটখাটো মজার ঘটনা নিয়েই নন্টে-ফন্টে। তবে এই মফস্বল শহর পুরোই আমার কাল্পনিক শহর। এই শহরে যা করতে অপ্রস্তুত আমি, যা করার স্বাধীনতা নেই আমার; কল্পনার শহরে তার সবই আমার হাতের নাগালে, যা চাই তা-ই করতে পারি। এ যেন সব সম্ভবের এক শহর! আর সেই স্কুলের বিশাল বপুর অধিকারী সুপারিনটেনডেন্ট দেখতে যেমন, খেতেনও তেমন। রাতে ঘুমানোর আগে তিনি নিয়মিত এক বাটি দুধ খান এবং প্রায়ই প্রচণ্ড জোরে আছাড় খান। তার হাস্যরসাত্মক ছদ্মনাম—মি. হাতি। তিনি ভাতের মাড়ও খান বেশ। আবার বেশি খাওয়া স্বাস্থ্যের পক্ষে হানিকর— এমন উক্তিও দিতেন!’

নন্টে-ফন্টের পর বাঁটুলের কথা মনে করিয়ে দিতেই তিনি কাগজ-কলম নিয়ে বসে পড়লেন। বললেন, ‘চলো, আজ তোমায় বাঁটুল আঁকা দেখাব। ’ নারায়ণ দেবনাথের বয়স হয়েছে। হাত কাঁপছে। তবু তিনি কী সুন্দর বাঁটুল আঁকছেন। আমি দেখছি আর অবাক হচ্ছি। দেখো, তোমাদেরও নিশ্চয়ই ভালো লাগবে। আর হ্যাঁ, আশপাশের বইয়ের দোকানে খুঁজলেই পেয়ে যাবে নারায়ণ দেবনাথের কমিকস বইগুলো। প্রিয় এই আঁকিয়ের, প্রিয় এই লেখকের কমিক-গল্প পড়ে নিজেও শুরু করতে পারো কমিকস বানানোর কাজ!



সাতদিনের সেরা