kalerkantho

মঙ্গলবার । ৩ কার্তিক ১৪২৮। ১৯ অক্টোবর ২০২১। ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

চিঠি লিখে বিশ্বসেরা

বিশ্ব ডাক সংস্থা ইউনিভার্সাল পোস্টাল ইউনিয়ন (ইউপিইউ) আয়োজিত ৫০তম পত্র লিখন প্রতিযোগিতায় স্বর্ণপদক লাভ করেছে নুবায়শা ইসলাম। সিলেট আনন্দ নিকেতন বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির এই ছাত্রীকে নিয়ে লিখেছেন ইয়াহইয়া ফজল

২০ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



চিঠি লিখে বিশ্বসেরা

ভারী ফ্রেমের চশমা চেহারায় এনেছে ভারিক্কি ভাব। কথা বলার ধরনও তা-ই। মেপে মেপে কথা বলে। নুবায়শা ইসলাম। সিলেটের আনন্দ নিকেতন বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী। মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম ও জেসমিন আক্তার দম্পতির একমাত্র সন্তান। কল্পনায় তার অনাগত বোনের উদ্দেশে করোনা পরিস্থিতি নিয়ে আবেগঘন এক চিঠি লিখেছে। ইংরেজিতে লেখা সেই চিঠি দিয়েই অংশ নিয়েছে ইউনিভার্সাল পোস্টাল ইউনিয়ন (ইউপিইউ) আয়োজিত ৫০তম আন্তর্জাতিক পত্র লিখন প্রতিযোগিতায়। হয়েছে সবার সেরা। জিতেছে স্বর্ণপদক।

 

যেভাবে অংশ নিয়েছিল

৯ থেকে ১৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থীরাই এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারে। প্রথমে নিজ নিজ দেশের ডাক বিভাগ আয়োজিত চিঠি লেখা প্রতিযোগিতায় প্রথম হতে হয়। তবেই দেশের হয়ে প্রতিনিধিত্বের সুযোগ আসে। এবার প্রতিযোগীদের বলা হয়েছিল, কভিড-১৯-এর অভিজ্ঞতা নিয়ে তোমার পরিবারের যেকোনো সদস্যদের কাছে পত্র লেখো। নিয়ম অনুযায়ী গত ৫ এপ্রিল বাংলাদেশ ডাক বিভাগে চিঠি পাঠায় নুবায়শা। সেখানে সেরা হয় তার চিঠি। এরপর বাংলাদেশ থেকে সেই চিঠি পাঠানো হয় ৫০তম আন্তর্জাতিক পত্র লিখন প্রতিযোগিতায়। আর তাতে নুবায়শার চিঠি হয় সবার সেরা। দ্বিতীয় হয়েছে নর্থ মেসিডোনিয়ার ব্রুনো ইভানোস্কি। তৃতীয় ভিয়েতনামের প্রতিযোগী ডাওআন থু। বাংলাদেশ ডাক বিভাগের পক্ষ থেকে নুবায়শার পরিবারকে সুসংবাদটি জানানো হয় ৯ আগস্ট। বলা হয়েছিল বিষয়টি গোপন রাখতে। এরপর ডাক বিভাগ নুবায়শাকে নিয়ে একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করে। তারা ১৩ আগস্ট সেটি সুইজারল্যান্ডের রাজধানী বার্নে ইউপিইউ সদর দপ্তরে পাঠায়। এরপর সেখান থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বর্ণপদক জয়ী হিসেবে নুবায়শা ইসলামের নাম ঘোষণা হয় ২৭ আগস্ট। নুবায়শার চিঠি পড়ে দারুণ উত্ফুল্ল ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার। বলেছেন, ‘এটি আমাদের মেধার বিশ্বস্বীকৃতি।’

 

নুবায়শার সেই চিঠি

প্রিয় আমল,

মা-বাবা যেদিন বললেন আমার একটা ছোট বোন হতে যাচ্ছে, আর সবার সব মনোযোগ চলে গেল তোমার প্রতি, আমার একটুও হিংসা হয়নি। এমনকি যেদিন আমার দোলনাটা তোমার জন্য নিয়ে নেওয়া হলো, যেখানে আমি জীবনের প্রথম দুটি বছর ঘুমিয়েছি, সেদিনও হিংসা হয়নি। কিন্তু যেদিন বুঝতে পারলাম, মাতৃগর্ভের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকায় তুমি বর্তমান পৃথিবীর ভয়াবহতা থেকে নিরাপদ আছ, অথচ আমি তা নই, সেদিন খুব হিংসে হয়েছিল।

আমার এখনো বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়, তুমি কেবল এসব কথা পড়েই বড় হবে। তুমি কখনোই বুঝবে না একটা সামান্য ব্যাপার কতটা ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে। মাঝ-বসন্তের দুই সপ্তাহের একটা ছুটির ঘোষণা যদি অবিরাম গৃহবন্দিত্বের রূপ নেয়, তখন কেমন লাগতে পারে। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে জীবন যখন এভাবে বদলে যায়, তখন সেটা হয়ে ওঠে আরো ভয়ংকর।

তুমি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ আমি কিসের কথা বলছি। ব্যাপারটা নিয়ে তুমি নিশ্চয়ই অসংখ্য বই পড়বে। তবে এটা একান্তই আমার গল্প। বোনের কাছে বলা বোনের গল্প। পেছন ফিরে তাকালে বুঝতে পারি, কী ভীষণ সহজ-সরল ছিলাম। অতিমারি, কোয়ারেন্টিন, সার্স—এসব কথা আগে শুনিইনি। যত বুঝতে লাগলাম, ভয়ে ততই আত্মা শুকিয়ে যেতে লাগল। প্রযুক্তির প্রতি আমার এমন অন্ধ আস্থা ছিল, বিশ্বাসই করতে পারিনি মহামারি এভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ১৯৩টি দেশ, ৭৯০ কোটি মানুষের বিপরীতে একটি মাত্র ভাইরাস! ভাবতে পারো? এটা কি আসলে প্রকৃতিমাতার [মাদার নেচার] ক্রোধ? উনি কি প্রতিশোধ নিচ্ছেন? পৃথিবীর প্রতি আমরা যে অন্যায় করেছি, প্রকৃতিকে ধ্বংস করেছি তার জন্য? মানে আমরা কি নিজেদের বাসস্থানেই বন্দি হয়ে পড়েছি? অথবা তিনি হয়তো আমাদেরকে সঠিক পথে ফেরাচ্ছেন। মনে করিয়ে দিচ্ছেন আমাদের নির্বোধের মতো করা কাজগুলোর কথা। যেভাবে মা আমাদের ভুল ধরিয়ে দেন। হয়তো সে কারণেই প্রকৃতি নারীরূপী। মানবসভ্যতার মাতা।

এই ভাইরাস প্রাণঘাতী। সেই সঙ্গে আমাদের আশাকেও মেরে ফেলছে। পৃথিবীর বর্তমান অবস্থা আমাকে হতবাক করে দিয়েছে। জানি না কী করা উচিত। প্রতিদিন মৃতের সংখ্যা শুনতে হচ্ছে। বড় বড় সব সংখ্যা। রংতুলিও আমাকে আকৃষ্ট করতে পারছে না আর। এই প্রথম আমি কোনো ছবি শেষ না করেই রেখে দিয়েছি।

আমি জানি না মা যখন হতাশায় ডুবে যায় তখন কী করা উচিত। উনি ঠিকমতো খেতে পারেন না, ঘুমাতে পারেন না। আমি স্রেফ তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকি। কিছু করতে পারি না। কেন করতে পারি না? আমি মায়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে পারতাম। তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলতে পারতাম, ‘চিন্তা কোরো না মা। সব ঠিক হয়ে যাবে।’ কিন্তু সত্যিটা হলো, আমি আসলেই জানি না সব কিছু ঠিক হবে কি না। আমি মাকে কোনো সাহায্য করতে পারি না। কেমন সন্তান আমি মায়ের?

একবার তৃতীয় শ্রেণিতে থাকতে ইংরেজির শিক্ষক আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আমি কী সবচেয়ে ভয় পাই। বলেছিলাম, বজ্রপাত আর মাকড়সা। এখন হলে বলতাম, মৃত্যু। আর কাউকে হারানোর ভয়। যখন মাত্র আমরা নতুন এই জীবনে অভ্যস্ত হয়ে উঠছিলাম, তখনই সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপারটা ঘটে। ফুফি মারা যান। সকালে হালকা অসুস্থ বোধ করলেন, বিকেল হতে হতে জীবন নিয়ে টানাটানি লেগে গেল, আর রাতেই মারা গেলেন। কভিড এমনই ভয়ংকর।

আমল, তোমাকে নিয়ে উনি যে কী উতলা হয়ে ছিলেন! ছোট্ট ছোট্ট নকশিকাঁথার লেপ বানাচ্ছিলেন। তার একটা আমি নিয়ে এসেছি। চারপাশে কালো সুতায় ফুলের নকশা করছিলেন। কিন্তু নিয়তির নির্মমতা তাঁকে সে কাজ শেষ করতে দিল না। তবে আমি করব। কারণ তুমি পৃথিবীতে আসবে জানুয়ারিতে। তখন প্রচণ্ড ঠাণ্ডা থাকবে। কিন্তু পৃথিবী থেমে থাকবে না। আপন নিয়মে চলতে থাকবে। অন্যের অসমাপ্ত কাজ তোমাকে শেষ করতে হবে। কঠিন সময়ে তোমাকে লড়াই করে যেতে হবে। ধৈর্য আর বিশ্বাসের সঙ্গে।

শিগগিরই আমি তোমার দেখা পেতে যাচ্ছি। আমল, তোমার নামের অর্থই হচ্ছে ‘আশা’। এবং সেটাই তোমাকে সবার থেকে আলাদা করেছে। তোমাকে ঘিরেই আমি নতুন দিনের আশায় বুক বাঁধছি।

গল্পটার এখানেই শেষ নয়। তুমি কখনোই জানতে পারবে না সামনের দিনগুলোতে জীবন তোমার জন্য কী নিয়ে অপেক্ষা করছে। তবে কখনোই আশা হারানো যাবে না আমল। কখনোই না।

তোমার বোন

নুবায়শা

(ঈষৎ সংক্ষেপিত, ভাষান্তর : নাবিল অনুসূর্য)



সাতদিনের সেরা