kalerkantho

সোমবার  । ১২ আশ্বিন ১৪২৮। ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৯ সফর ১৪৪৩

অলিম্পিকে যত মজার কাণ্ড

সালটা এখন ২০২১। কিন্তু টোকিওতে চলছে অলিম্পিক ২০২০। মানেটা কী? আসলে গত বছর হওয়ার কথা থাকলেও করোনার কারণে হচ্ছে এক বছর পিছিয়ে। অলিম্পিকের ইতিহাসে এমন ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি। তবে অদ্ভুত ঘটনার কমতি নেই অলিম্পিকে। কয়েকটির কথা জানাচ্ছেন নাবীল অনুসূর্য

২ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



অলিম্পিকে যত মজার কাণ্ড

অঙ্কন : প্রসূন

অলিম্পিকে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয় ছেলেদের ১০০ মিটার দৌড় নিয়ে। এই ইভেন্টের বিজয়ী রীতিমতো বিশ্বতারকা বনে যান। ১৯৪৮ সালে তাতে স্বর্ণপদক জিতেছিলেন ফ্যানি ব্ল্যাংকার্স-কোয়েন। স্বাভাবিকভাবেই ডাচ এই দৌড়বিদকে নিয়ে শুরু হয়ে গিয়েছিল মাতামাতি। অথচ সেসব উত্তেজনা তাঁকে স্পর্শই করেনি। প্রতিক্রিয়ায় নিস্পৃহভাবে বলেন, ‘আমি আহামরি কিছু করিনি। দ্রুত দৌড়েছি কেবল। এ নিয়ে এত আলোচনার কী আছে বুঝতে পারছি না!’ আসলে এটাই হওয়ার কথা। আনন্দের জন্য খেলা। যেমনটা চেয়েছিলেন ব্যারন পিয়েরে দ্য কুবার্তো। যাকে বলা হয় আধুনিক অলিম্পিকের জনক। কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বিতার ডামাডোলে সে মন্ত্র যেন হারিয়েই গেছে। কারণ একজন ক্রীড়াবিদের কাছে অলিম্পিকে পদক জয়ের চেয়ে সম্মানের কিছু যে আর হতে পারে না! কাজেই তার উদযাপনও হওয়া চাই আনন্দঘন। যেমনটা করতেন উসাইন বোল্ট। বিগত কয়েক আসরে স্বল্পদৈর্ঘ্যের দৌড়ের ইভেন্ট মানেই ছিল এই জ্যামাইকানের জয়। আর তাঁর তীর ছোড়ার ট্রেডমার্ক উদযাপন।

কম যান না দূরপাল্লার দৌড়বিদরাও। যেমন ইতালির উগো ফ্রিগেরো। অবশ্য তিনি দৌড়ে নয়, প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতেন দূরপাল্লার হাঁটার ইভেন্টে। ১৯২০ ও ১৯২৪ সালে পর পর দুই অলিম্পিকে ১০ হাজার মিটার হাঁটায় জিতেছিলেন স্বর্ণপদক। এই প্রতিযোগিতার জন্য নির্ধারিত পথ শেষ হয় স্টেডিয়ামে এসে। ফ্রিগেরোর স্টেডিয়ামে প্রবেশের দৃশ্যগুলো ছিল দেখার মতো। ঢোকার সময় ব্যান্ড বাদকদের ইঙ্গিত করতেন বাজনা বাজাতে। তারপর তার তালে তালে হাত দোলাতে দোলাতে ছুঁতেন ফিনিশিং লাইন। একবার তো দৌড় থামিয়ে শুরু করে দেন তাদের নির্দেশনা দেওয়া!

বিপরীত উদাহরণও আছে। চেকোস্লোভাকিয়ার এমিল জাটোপ্যাক। দৌড়াতেন ৫ ও ১০ হাজার মিটারের ইভেন্টে। ১৯৪৮ ও ১৯৫২ অলিম্পিকে জিতেছিলেন চারটি স্বর্ণ। তবে তাঁকে নিয়ে বেশি আলোচনা হতো মুখভঙ্গির জন্য। দৌড়ানোর সময় মুখ-চোখ একেবারে কুঁচকে রাখতেন তিনি। হুসহুস করে শ্বাস নিতেন। মনে হতো যেন একটা গাড়ি চলছে! সে জন্য তাঁর নামেই হয়ে গিয়েছিল ‘এমিল দ্য টেরিবল’। এ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে উত্তর দিয়েছিলেন মজা করেই, ‘এতটা পথ দৌড়ানোর সময় মুখে হাসি ঝুলিয়ে রাখব, অত প্রতিভাবান আমি নই!’ দূরপাল্লার দৌড়ের জন্য সবচেয়ে বিখ্যাতদের একজন হেইলে গেব্রেসেলাসি। ইথিওপিয়ার কিংবদন্তি। ১০ হাজার মিটারে সোনা জেতেন ১৯৯৬ ও ২০০০ সালে। তাঁর দৌড়ানোর ভঙ্গিও বেশ অদ্ভুত। হাত দুটি সাধারণের তুলনায় অনেক বেশি ভাঁজ করে রাখতেন, বিশেষ করে বাঁ হাতটা। কারণ কী? বলেন, ‘ছোটবেলায় আমার বাসা থেকে স্কুলের দূরত্ব ছিল ১০ কিলোমিটার। প্রতিদিন দৌড়ে স্কুলে যাওয়া-আসা করতাম। বইপত্র নিতাম বাঁ হাতে।’ আর সেই থেকেই নাকি ওভাবে দৌড়ানোর অভ্যাস!

অলিম্পিকের আসরে দৌড়াতে গিয়ে ভজঘট পাকানোর ঘটনাও আছে। যেমনটা পাকিয়েছিলেন ফিনল্যান্ডের তারকা দৌড়বিদ ল্যাসে ভিরেন। ১৯৭২ ও ১৯৭৬ অলিম্পিকে ১০ হাজার মিটারে সোনা জেতেন। শুধু এক জায়গায়ই পিছিয়ে ছিলেন জাটোপ্যাকের থেকে। জিততে পারেননি ম্যারাথনে। ১৯৮০ অলিম্পিকে সেটাকেই করেন পাখির চোখ। অনেকেই বলেন, ম্যারাথনে অতিরিক্ত মনোযোগ দিতে গিয়েই সেবার হেরে গিয়েছিলেন ১০ হাজার মিটারে। আর ম্যারাথনে জিততে বাদ সাধে তাঁর পেট। খারাপ হয়ে যায় প্রতিযোগিতার দিন। তবু হাল ছাড়েননি। শুরু করেছিলেন দৌড়। যখনই প্রকৃতির ডাক আসছিল, আশপাশে ঝোপঝাড়ে সেরে নিচ্ছিলেন কাজ। কিন্তু ওভাবে আর কতক্ষণ! কয়েক কিলোমিটার হেঁটেই রণে ভঙ্গ দেন। কোনো পদক ছাড়াই শেষ করেন তাঁর শেষ অলিম্পিক।

আর্নল্ড জ্যাকসন ও ফিলিপ নোয়েল-বেকারের গল্পটা আবার ভিন্ন। ১৯১২ অলিম্পিকের সময় তাঁরা কেমব্রিজের ছাত্র। নরওয়ের স্টকহোমে গিয়েছিলেন ঘুরতে। সেখানেই বসেছিল সেবারের আসর। এখন অলিম্পিকে অংশ নিতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়। কিন্তু শুরুর দিকে এত কড়াকড়ি ছিল না। শখের বশে তাঁরা নাম লেখান দেড় হাজার মিটার দৌড়ে। এবং সেই সিদ্ধান্তে বদলে যায় তাঁদের জীবন। আর্নল্ড জেতেন স্বর্ণপদক। ষষ্ঠ হন ফিলিপ। এমন ঘটনা ঘটে ১৯২৮ অলিম্পিকেও। ১০০ মিটারে স্বর্ণপদক জেতেন কানাডার অখ্যাত দৌড়বিদ পার্সি উইলিয়ামস। রাতারাতি বনে যান জাতীয় বীর। তাঁর হোটেলের সামনে জড়ো হয় রাজ্যের কানাডিয়ান। তাঁকে একনজর দেখতে। অথচ তিনি দাঁড়িয়েছিলেন তাঁদেরই সঙ্গে। এতটাই অপরিচিত ছিলেন যে কেউ চিনতেই পারেননি তাঁকে!

শুধু দৌড়েই নয়, এমন ঘটনা আছে অন্যান্য খেলায়ও। এ বাবদে সবচেয়ে সৌভাগ্যবান বলতে হবে এডগার আবিয়েকে। এমনিতে ক্রীড়াবিদ হিসেবে তিনি খারাপ ছিলেন না। সাঁতারে ডেনমার্কের জাতীয় চ্যাম্পিয়ন ছিলেন। তবে ১৯০০ সালের অলিম্পিকে খেলোয়াড় হিসেবে নয়, গিয়েছিলেন সাংবাদিক পরিচয়ে! অলিম্পিকের ইতিহাসে শুধু সেবারই হয়েছিল দড়ি টানাটানির প্রতিযোগিতা। তাতে ডেনমার্ক ও সুইডেন অংশ নিয়েছিল যৌথভাবে। ফাইনালে তাদের প্রতিপক্ষ ছিল

স্বাগতিক ফ্রান্স। কিন্তু ইনজুরির কারণে দলে একজন কম পড়ে যায়। তখনই ডাক পড়ে আবিয়ের। জিতে নেন দলগত সোনা।

আবার মা ভক্ত ক্রীড়াবিদের দেখাও কম মেলেনি অলিম্পিকে। সবার ধারণা ছিল ১৯০৮ অলিম্পিকে পোল ভল্টের সোনা জিতবেন ওয়াল্টার ড্রে। সবাইকে অবাক করে দিয়ে তিনি অংশই নেননি অলিম্পিকে। কারণ তাঁর মায়ের ভয়। অত উঁচুতে লাফ দিতে গিয়ে যদি ছেলে ব্যথা পায়! মা ভক্তি অবশ্য মার্কিন বক্সার জর্জ ফোরম্যানের সোনা জয়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। ১৯৬৮ অলিম্পিকে হেভিওয়েট বক্সিংয়ের ফাইনালে তাঁর প্রতিপক্ষ ছিলেন সোভিয়েত ইয়োনাস চেপুলিস। বেশ কয়েকবার তাঁকে নক আউট করার সুযোগ পেয়েও ছেড়ে দেন ফোরম্যান। পরে কারণ জিজ্ঞেস করা হলে বলেন, ‘আমি কাউকে আঘাত করি, এটা আমার মায়ের পছন্দ না। এবং এই খেলাটা তিনি নিশ্চিত টিভিতে দেখেছেন। কাজেই...।’

তবে এই তালিকার সবচেয়ে মজার ঘটনাটা সম্ভবত ১৯৫২ অলিম্পিকের। সেইবার শট পুটে সোনা জিতেছিলেন মার্কিন প্যারি ও’ব্রায়েন। যে জামা পরে সেদিন খেলতে গিয়েছিলেন, সেটা পরে দেন সিম ইনেসকে। সেই জামা গায়ে দিয়ে তিনিও সোনা জেতেন। ডিসকাস থ্রোতে। তারপর সেটা পরেন সি ইয়ং। তিনি স্বর্ণপদক জেতেন জ্যাভলিন থ্রোতে। তারপর জামাটা দেন জ্যাক ডেভিসকে। কিন্তু জামার সৌভাগ্যে বিশ্বাস রাখেননি তিনি। সেটা না পরেই অংশ নেন ১১০ মিটার হার্ডলসে এবং হেরে যান। তাঁরই স্বদেশি হ্যারিসন ডিলার্ডের কাছে।    

 তথ্যসূত্র : ফার্স্টপোস্ট