kalerkantho

শনিবার । ৯ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৪ জুলাই ২০২১। ১৩ জিলহজ ১৪৪২

ছিলাম গাছ হলাম পাখি

আবেদীন জনী   

১৪ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ছিলাম গাছ হলাম পাখি

আঁকা : মাসুম

ফেলে দেওয়া একটি কাগজের ঠোঙা। কখনো মাটির ওপর গড়াচ্ছে, কখনো বা উড়ছে। ভেতরে ঢুকেছে হাওয়া। সেই হাওয়া ওটাকে ঠেলে ঠেলে নিচ্ছে। কোথায় নিয়ে যাচ্ছে কে জানে।

গড়িয়ে যাওয়াটা মোটেই ভালো লাগে না ঠোঙার। তবে যখন উড়ে উড়ে যায়, তখন খুব মজা পায়। মনে মনে ভাবে, যদি পাখি হতে পারতাম, না জানি আরো কত মজা হতো!

ঠোঙা খুব ভাবনায় পড়ে গেল।  কখন যেন জীবনটা শেষ হয়ে যায়! গড়াতে গড়াতে ছিঁড়ে-ফেটে ধুলোর তলে চাপা পড়ার ভয়টা জেগে উঠল। কোনো জলাশয়ে পড়ে গেলেও রক্ষা নেই। ভিজে শেষ। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল—হায়রে জীবন, একটা স্বপ্নও পূরণ হবে না বুঝি!

ঠোঙার মলিন মুখ দেখে হাওয়া বলল, কিসের এত কষ্ট তোমার? ভালোই তো গড়িয়ে গড়িয়ে, উড়ে উড়ে যাচ্ছ।

ঠোঙা বলল, অনেক রকমের জীবন পাড়ি দিয়ে এসেছি আমি। মানুষ আমাকে যা ইচ্ছে তা-ই বানিয়েছে। যেমন খুশি তেমন রূপ দিয়েছে। এখন চলছে ঠোঙাজীবন। ব্যবহারের পর ফেলে দেওয়া একটা ঠোঙা আমি। যেদিকে ইচ্ছা সেদিকেই ঠেলে নিচ্ছে। কিন্তু আমারও তো স্বপ্ন থাকতে পারে।

হাওয়া বলল, তা হয়তো পারে। স্বপ্নের কথাটা পরে শুনি। আগে বলো, কী কী জীবন পাড়ি দিয়ে এসেছ তুমি?

ঠোঙা বলল, সে অনেক কথা। বলতে অনেক সময় লাগবে।

হাওয়া বলল, আমার তো বেশি সময় নেই। বহুদূর যেতে হবে। অনেক কাজ।  অতি সংক্ষেপে বলো।

ঠোঙা বলতে লাগল : আমার জন্ম সুন্দরবনে। আমি ছিলাম গেওয়াগাছ। ছোট থেকে বড় হয়েছি আনন্দে আনন্দে। বাঘ, ভালুক, সিংহ, হরিণ দেখেছি। বানর, হাতি, বুনো মোষ দেখেছি। আরো কতশত জীবজন্তু দেখেছি প্রতিদিন! আমার ডালে পাখিরা বসে ডাকাডাকি করত। কী মিষ্টি গানের গলা পাখিদের! ভালোই কাটছিল দিন। হঠাৎ একদিন এক কাঠুরে আমাকে কেটে ফেলল। আমি গাছ থেকে কাঠ হয়ে গেলাম। কাঠুরের কাছ থেকে কিনে একজন আমাকে নিয়ে গেল কাগজের কারখানায়। তারপর টুকরো টুকরো করা হলো। মেশিনে দিয়ে বানানো হলো মণ্ড। তারপর বানানো হলো কাগজ।

হাওয়া বলল, তারপর? তারপর?

আবার বলতে লাগল ঠোঙা : কাগজজীবন পেয়ে বুঝলাম, আরো অনেক দিন বাঁচব। তারপর কেনা-বেচার মাধ্যমে হাতবদল হতে হতে একদিন আমাকে কিনে আনল এক প্রকাশক। আমাকে দিয়ে বানানো হলো খোকা-খুকিদের বই। আমার পাতায় পাতায় ছাপানো হলো রঙিন ছবি আর বড় বড় লেখকের মজার মজার গল্প-ছড়া।

বইজীবন পেয়ে বেশ আনন্দ পেলাম। একদিন এক লোক আমাকে কিনে নিল, তার ছোট্ট মেয়ের জন্য। মেয়েটার ছিল খুব মিষ্টি চেহারা। খুব মজা করে পড়ত আমাকে। ছড়া পড়ত, গল্প পড়ত, আর বুকশেলফে যত্নে রেখে দিত। আমার কী যে ভালো লাগত! কিন্তু এক বছর পর মেয়েটা ওপরের ক্লাসে উঠে গেল। তার বাবা আমাকে বিক্রি করে দিল পুরনো সংবাদপত্রের সঙ্গে। হাতবদল হয়ে চলে গেলাম ঠোঙা কম্পানির কাছে। পেলাম ঠোঙাজীবন। এবার আমাকে কিনে নিল জিলাপি ও কদমার দোকানদার। আমার ভেতরে কদমা ভরে বিক্রি করল সে। ক্রেতা লোকটি বাসায় গিয়ে কদমাগুলো বয়ামে রাখল আর আমাকে ছুড়ে ফেলল জানালা দিয়ে। তার পর থেকেই গড়িয়ে গড়িয়ে, উড়ে উড়ে যাচ্ছি আমি।

ঠোঙার নানা রকম জীবনের নানা কাহিনি শুনে হাওয়া বলল, অনেক কিছু জানা হলো তোমার। এখন তোমার স্বপ্নের কথাটা বলো। দেখি, পূরণ করতে পারি কি না।

ঠোঙা বলল, কদিন পরই হয়তো থাকব না আমি। নাই হয়ে যাওয়ার আগে একটাই স্বপ্ন আমার, পাখি হতে চাই। আকাশের বুকে ডানা মেলে উড়ে যেতে চাই অনেক দূর।

হাওয়ার মায়া হলো ঠোঙার জন্য। বলল—আচ্ছা, ঠিক আছে। চিন্তার কিছু নেই, তোমার স্বপ্নটা এখনই পূরণ হবে।

তারপর চঞ্চল হাওয়া ঠোঙার ভেতরে গিয়ে চক্রাকারে ঘুরতে লাগল। ঠোঙাটা উড়তে থাকল। উড়তে উড়তে উঠে গেল অনেক ওপরে। ঠোঙার মনে হলো, তার পাখা গজিয়েছে। সে পাখি হয়ে উড়ছে আকাশে। উড়তে উড়তে আনন্দে হেসে বলল—হায়রে রঙিলা জীবন, ছিলাম গাছ, হলাম পাখি!