kalerkantho

শনিবার । ৯ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৪ জুলাই ২০২১। ১৩ জিলহজ ১৪৪২

বয়স অল্প পুরস্কার অনেক

নাইমুর রহমান আপন ও আফরিন শিখা রাইসা। দুজনেই শিশুশিল্পী ক্যাটাগরিতে পেয়েছে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার-২০১৯। লিখেছেন মুনতাসির সিয়াম

১৪ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বয়স অল্প পুরস্কার অনেক

পিদিম থিয়েটারে নাচ ও গান শিখছিল আপন। ২০১৬ সাল। একদিন সেখানে এলেন নির্মাতা অমিতাভ রেজা চৌধুরী। উদ্দেশ্য রবির বিজ্ঞাপনের জন্য শিশুশিল্পী খোঁজা। সেই থিয়েটার থেকে অডিশনের জন্য আমন্ত্রণ পেল মোট ১২ জন। সেই দলে ছিল আপনও। ওর সংলাপ বলার ধরন ও এক্সপ্রেশন মনে ধরে অমিতাভ রেজার।

বয়সে ছোট হলেও আপনের আগেই ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়েছে রাইসা। ২০১৪ সাল। একটি বেসরকারি কম্পানির এলইডি লাইটের বিজ্ঞাপনের জন্য শিশুশিল্পী খুঁজছিলেন নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। তাঁকে একটি মেয়ের ছবি দেখান রাইসার এক চাচ্চু। হ্যাঁ, রাইসারই ছবি। পরদিনই ডাক পড়ে রাইসার। ওর অভিনয় পছন্দ করলেন ফারুকী।

 

ক্যামেরার সামনে

প্রথমবার ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে কিছুটা ভয়ের মধ্যে ছিল দুজনই। রাইসা বলল, ‘তখন আমার পাঁচ বছর বয়স। শুটিংয়ের জন্য গিয়েছিলাম চট্টগ্রামে। কিছুই বুঝতাম না ঠিকঠাক। ফারুকী আংকেল শটগুলো বুঝিয়ে দিতেন। “আমার অভিনয় দেখে ফারুকী আংকেল কী বলেছিলেন শুনবে? ‘টিভিসির জন্য যদি অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হতো, তবে এবার সেই অ্যাওয়ার্ডটা পেত রাইসা।’ টিভিসিতে আমার এক্সপ্রেশন আর কান্নার দৃশ্য দেখেই হয়তো কথাটা বলেছিলেন তিনি।”

শুরুতে ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে বুকটা দুরু দুরু করছিল আপনের। ডায়ালগ জড়িয়ে যাচ্ছিল। অমিতাভ রেজা চৌধুরী বারবার এসে বলছিলেন, ‘আরে বাহ্, এই তো হয়ে যাচ্ছে।’ এভাবে শট দিতে দিতেই ভয়টা কাটল আপনের।

 

ঝুলিতে তাদের অনেক পুরস্কার

এ পর্যন্ত মোট ১০টি বিজ্ঞাপন ও চারটি নাটকে অভিনয় করেছে আপন। একাধিক শর্টফিল্মও রয়েছে কাজের তালিকায়। ‘কালো মেঘের ভেলা’, ‘আয়নাবাজি’, ‘পোড়ামন ২’, ‘নোনা জলের কাব্য’সহ তার অভিনীত চলচ্চিত্রের সংখ্যা পাঁচটি। এদিক থেকে রাইসাও কম যায়নি। ৫০টির বেশি বিজ্ঞাপনে অভিনয় করেছে। নাটকের সংখ্যা ৩০টি। ‘ডুব’, ‘যদি একদিন’, ‘দহন’, ‘জ্যাম’, ‘বসন্ত বিকেল’সহ পাঁচটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছে সে। বয়স অল্প হলেও, আপন ও রাইসার পুরস্কারের ঝুলি কিন্তু বেশ ভারী। আপন প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করে ২০১৭ সালে। ‘ছিটকিনি’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য। ২০১৯ সালে এসে আবারও বাজিমাত করে। এবার ‘নোনা জলের কাব্য’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য। অন্যদিকে ‘মাখন মিয়ার উদার বউ’ নাটকে অভিনয়ের জন্য রাইসা আরটিভি স্টার অ্যাওয়ার্ড পায় ২০১৮ সালে। সম্প্রতি তার ঝুলিতে যোগ হয়েছে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার-২০১৯। মোস্তফা কামাল রাজ পরিচালিত ‘যদি একদিন’ সিনেমায় অভিনয়ের জন্য পুরস্কারটা পেয়েছে সে। প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে পুরস্কার গ্রহণ করতে পারেনি বলে কিছুটা আফসোসও রয়ে গেছে রাইসার। তবে আগেরবার প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে পুরস্কার গ্রহণ করেছে আপন। তখন প্রধানমন্ত্রী আপনকে বলেছিলেন, ‘ভালো মতো পড়াশোনা করো, পাশাপাশি অভিনয়টাও চালিয়ে যাও।’ সেই অনুপ্রেরণা থেকেই আপন চায় একদিন শাকিব খানের মতো অভিনেতা হতে। আর রাইসা চায় নুসরাত ইমরোজ তিশার মতো হতে। 

 

বড়রা সাহস দিয়েছেন

‘যদি একদিন’ চলচ্চিত্রে ‘রূপকথা’ গানের দৃশ্যে তাহসানের সঙ্গে সাইকেল চালানোর একটি দৃশ্য ছিল। এ জন্য সাইকেল চালানো শিখতে হয়েছে রাইসাকে। শুরুতে পরিচালক তাঁর অফিসের ছাদে সাইকেল চালানো শেখাতে চেষ্টা করেছেন। কিন্তু কাজ হয়নি। পরে রাইসার জন্য একটা সাইকেল কিনে আনলেন ওর বাবা। বাবা আর বড় ভাইয়ের চেষ্টায় কয়েক দিনের মাথায় সাইকেল চালানো রপ্ত করল রাইসা। বলল, ‘স্ক্রিপ্টটা এমন, সাইকেল চালাতে চালাতে পড়ে যাব আমি। তবে মিছেমিছি পড়ে যাওয়া, অভিনয় আর কী। কিন্তু শুটিংয়ের সময় আমি সত্যি সত্যিই পড়ে গেলাম। শটও ওকে হলো।’ রাজ মামা (মোস্তফা কামাল রাজ) বলেছিলেন, ‘খুব সুন্দর শট দিয়েছ।’ সত্যি সত্যিই যে পড়ে গিয়েছিলাম, সেটা আর বললাম না।

আরেকটি দৃশ্য ছিল শ্রাবন্তী (শ্রাবন্তী চ্যাটার্জি) আন্টির সঙ্গে সুইমিংপুলে। আমি তো সাঁতার পারি না। খুব ভয় লাগছিল। বুঝতে পেরে আন্টি আমাকে কোলে নিলেন। আমায় ‘পরী’ বলে ডাকতেন। বললেন, ‘পরী আমি তো আছি। একদম ভয় পেয়ো না।’

‘ছিটকিনি’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সময় শটগুলো দিতে একটু অসুবিধা হতো আপনের। আপন বলল, ‘আমার মায়ের ভূমিকায় ছিলেন রুনা (রুনা খান) আন্টি। তিনি অনেক কিছুই বুঝিয়ে দিতেন। শটের আগে রিহার্সালের সময় বলতেন, ‘এই শটটা এভাবে দেবে। কিংবা এই জায়গায় তোমার এক্সপ্রেশন এমন হলে রিয়েল মনে হবে।’

এরপরও আরো অনেক কাজ করেছি। তাই ‘কালো মেঘের ভেলা’য় অভিনয়ের সময় খুব একটা অসুবিধা হয়নি। তবে একটা দৃশ্য ছিল এমন—মা আমাকে ট্রেনে উঠিয়ে দূরে কোথাও পাঠিয়ে দিচ্ছে। আমি কাঁদতে কাঁদতে ডাকছিলাম মাকে। শটটা ঠিকঠাক হচ্ছিল না। পরে পরিচালক মৃত্তিকা গুণ আপু এসে কাঁধে হাত রাখলেন। বললেন, ‘আরে বোকা, ভয় পাওয়ার কী আছে; আমরা আমরাই তো।’ এরপর শটটা ওকে হয়ে গেল।

 

এখন তারা

এবার সপ্তম শ্রেণিতে উঠেছে রাইসা। ঢাকার গ্রিনল্যান্ড মডেল স্কুলের শিক্ষার্থী সে। আপন পড়ছে ঢাকার বেঙ্গলি মিডিয়াম হাই স্কুলে, দশম শ্রেণিতে। বলল, ‘পড়ালেখায় কখনোই ফাঁকি দিই না, তাই প্রধান শিক্ষক শুটিং চলার সময় ছুটি দিয়ে দিতেন। কাজেই পড়ালেখা ও অভিনয় সমানভাবে চালিয়ে যেতে অসুবিধা হয়নি।’ কিছুদিন আগেই একটি বিজ্ঞাপনের কাজ শেষ করল রাইসা। এ ছাড়া এনটিভির ‘হাউস নং ৯৬’ নামে একটি ধারাবাহিকে অভিনয় করছে। সামনে এসএসসি পরীক্ষা আপনের। পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অভিনয় থেকে আপাতত বিরতি নিয়েছে সে।