kalerkantho

সোমবার । ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮। ১৪ জুন ২০২১। ২ জিলকদ ১৪৪২

সেই থেকে শিমের বিচিতে কালো দাগ

১৭ মে, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সেই থেকে শিমের বিচিতে কালো দাগ

আঁকা : প্রসূন

এক গ্রামে গরিব এক বুড়ি বাস করত। বুড়ি এতটাই গরিব ছিল যে ঠিকমতো খেতেও পেত না। এক দিন বুড়ি একটা ক্ষেত থেকে মালিকের ফেলে দেওয়া কিছু শিমের বিচি কুড়িয়ে নিয়ে এলো। ঠিক করল বিচিগুলো সিদ্ধ করে খাবে। খুব বেশি ক্ষিদে পাওয়ায় বুড়ির যেন তর সইছিল না। কয়লায় আগুন ধরানোর জন্য কিছু খড়ে আগুন ধরিয়ে চুলায় গুঁজে দিল। চুলায় বসানো হাঁড়িতে তাড়াহুড়া করে শিমের বিচি দেওয়ার সময় একটা বিচি মেঝেতে খড়ের পাশে গিয়ে পড়ল। বুড়ির সেটা চোখে পড়ল না। কিছুক্ষণ পর এক টুকরা কয়লা জ্বলন্ত চুলা থেকে লাফিয়ে মেঝের খড় আর শিমের বিচির মাঝখানে ঝুপ করে এসে পড়ল। এ ব্যাপারটাও বুড়ির চোখ এড়িয়ে গেল। তার সব মনোযোগ হাঁড়ির দিকে। বুড়ি যখন খাওয়ার চিন্তায় অস্থির, তখন মেঝের খড় ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘বন্ধুরা, তোমরা কে কোত্থেকে এলে বলো দেখি?’

কয়লা বলল, ‘বড় বাঁচা বেঁচে গেছি! চুলার আগুন থেকে পালিয়ে বেঁচেছি। নইলে এতক্ষণে পুড়ে ভাজা ভাজা হয়ে যেতাম।’ শিমের বিচি রিনরিনে গলায় বলল, ‘চামড়ায় আঁচ লাগবার আগেই পালাতে পেরে প্রাণে বেঁচেছি। বেচারা বন্ধুদের মতো না হলে আমাকেও বুড়ি হাঁড়িতে পুরত। আর আগুনের আঁচে গলে এতক্ষণে আমি স্যুপ হয়ে যেতাম।’ একটা লম্বা দম নিয়ে খড় বলল, ‘আমারও একই দশা হতো বন্ধুরা। বুড়ি যেভাবে চুলায় আমার ভাইদের ঠেসেঠুসে দিয়েছে, ওরা সব্বাই জ্বলেপুড়ে ধোঁয়া হয়ে গেছে। ভাগ্যিস বুড়ির আঙুলের ফাঁক গলিয়ে টুপ করে আমি নিচে পড়েছিলাম। নইলে আমিও এতক্ষণে ওদের মতো ধোঁয়া হয়ে বাতাসে মিলিয়ে যেতাম।’

কয়লা প্রশ্ন করল, ‘এখন আমরা কী করব বলো দেখি?’

ঠাণ্ডা মাথার শিমের বিচি ধীরস্থিরভাবে বলল, ‘ভাগ্যের জোরে যখন বেঁচে গেছি, তখন আমাদের তিনজনের একসঙ্গেই থাকা উচিত। তবে এখানে বেশিক্ষণ থাকলে নতুন কোনো বিপদ এসে হাজির হতে পারে। চলো, আমরা নিরাপদ কোথাও পালিয়ে যাই।’

শিমের বিচির প্রস্তাব অন্য দুজনের খুব পছন্দ হলো। তিন বন্ধু তখনই নিরাপদ জায়গার খোঁজে চটপট বেরিয়ে পড়ল। হাঁটতে হাঁটতে তারা ছোট্ট এক নদীর পারে এসে পৌঁছাল। কিন্তু নদী পার হওয়ার জন্য কোনো সেতু বা নৌকা—কিচ্ছু দেখতে পেল না। মহাচিন্তায় পড়ে গেল কয়লা আর শিমের বিচি। খড় তখন দুজনকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল, ‘অত্ত ভেবো না হে। আমার মাথায় একটা চমৎকার বুদ্ধি এসেছে। বলছি শোনো, আমি শুয়ে পড়ে শরীরটা নদীর এপার-ওপার পর্যন্ত ছড়িয়ে দেব। তোমরা এক এক করে নদীটা পার হয়ে যাবে।’

কথা মতো খড় সটান শুয়ে পড়ে নদীর এপার-ওপার পর্যন্ত নিজের শরীরটা ছড়িয়ে দিল। কয়লা বেশ একটা ভাব ধরে খড়ের তৈরি করা নতুন সেতুর ওপর দিয়ে রওনা দিল। কিন্তু মাঝ বরাবর গিয়ে সেতুর নিচে জলের স্রোতের শব্দ শুনল। সেদিকে তাকাতেই কয়লার আত্মা খাঁচা ছাড়ার উপক্রম। ভয়ে একেবারে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে গেল সে। কয়লার টুকরা এতই ভয় পেয়েছে যে সামনে এগোনোর জন্য আর কিছুতেই নড়তে-চড়তে পারছিল না। এদিকে জলন্ত কয়লা এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকার কারণে খড় বেচারার শরীর পুড়তে শুরু করল। পুড়তে, পুড়তে সে দুই টুকরা হয়ে নদীতে পড়ে গেল। খড় পড়ে যাওয়া মাত্রই কয়লাও হুড়মুড়িয়ে জলে পড়ল। জলন্ত কয়লা জলে পড়ে হিসহিস শব্দ তুলে শেষবারের মতো নিঃশ্বাস নেওয়ার চেষ্টায় খাবি খেতে খেতে মারা গেল।

নদীতীরে দাঁড়িয়ে চুপচাপ সব দেখছিল শিমের বিচি। দু্ই সঙ্গীর এমন করুণ পরিণতি দেখে শিমের বিচি বেদম হাসিতে ভেঙে পড়ল। থামতে পারে না এমন হাসি। হাসতে হাসতে ফট্টাশ করে শিমের বিচির পেট গেল ফেটে। খড় আর কয়লার মতো সে-ও আরেকটু হলে অক্কা পেতে যাচ্ছিল। কিন্তু নদীর পারে একটা গাছের ছায়ায় এক দর্জি বিশ্রাম নিচ্ছিল। দর্জি খুব দয়ালু। শিমের বিচির পেট ওভাবে ফেটে যেতে দেখে তার খুব মায়া হলো। সে তাড়াতাড়ি সুঁই-সুতা বের করে শিমের বিচির পেট সেলাই করে দিল। শিমের বিচি প্রাণে বাঁচল। জীবন বাঁচানোর জন্য দর্জিকে ধন্যবাদ দিতে অবশ্য ভোলেনি সে। কিন্তু দর্জি শিমের বিচির পেট কালো সুতায় সেলাই করেছিল বলে তার শরীরে একটা কালো দাগ হয়ে গেল। সেই থেকে কালো দাগটা সব শিমের বিচির গায়ে এখনো দেখা যায়।

গ্রিম ভাইদের রূপকথা ‘দ্য স্ট্র, দ্য কোল অ্যান্ড দ্য বিন’ অবলম্বনে মামুন সিরাজী