kalerkantho

সোমবার । ৭ আষাঢ় ১৪২৮। ২১ জুন ২০২১। ৯ জিলকদ ১৪৪২

চাঁদ মামা গেল কোথায়

ধ্রুব নীল

১১ মে, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



চাঁদ মামা গেল কোথায়

আঁকা : প্রসূন

মহাবিজ্ঞানী কর্কট চৌধুরীর মাথায় নেই একটা চুলও। রাগে নিজের চুল ছিঁড়তে না পারায় ছিঁড়ছেন বালিশের তুলা। তাঁর অ্যাসিস্ট্যান্ট গবুচন্দ্রের মাথাভর্তি কোঁকড়া চুল। সে একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে। বিজ্ঞানী যদি আবার তার চুলে টান দেন ভুল করে।

‘স্যার, বিপদের কথা শুনেছেন নিশ্চয়ই। আপনি ছাড়া...।’

‘একেবারে চুপ! তোমার কি ধারণা, আমি একটা ভেড়া?’

‘না স্যার, বলছিলাম, সামনে ঈদ। এমন সময় চাঁদ না দেখা গেলে কেউ মানবে না আপনি মহাকাশবিদ।’

‘বটে! বটে! নাসার চোখ কি কপালে ছিল রাখা? চাঁদের কি গজিয়েছে পাখা? দুম হয়ে গায়েব হয়ে গেল? গবুচন্দ্র, তোমাকেই বলছি! হ্যালো!’

‘অ্যাঁ, স্যার! আমি কী করে বলি। আমি না হয় চলি। আপনিই কথা বলুন বিজ্ঞান কাউন্সিলের সঙ্গে।’

গতকাল থেকে চাঁদের দেখা নেই। নেই মানে গায়েব। টেলিস্কোপে আতিপাতি করে খুঁজেও মিলছে না দেখা। পত্রপত্রিকায় হচ্ছে বিস্তর লেখা। আস্ত একটা চাঁদ আচমকা গায়েব হলো কী করে? ভেবে কূল পাচ্ছেন না বিজ্ঞানীরা। কবিরাও বিপদে। চাঁদ দেখা ছাড়া লিখতে পারছেন না কবিতা। সুযোগ বুঝে বাচ্চারাও ঘুমাবে না। কারণ তাদের কেউ আয় আয় চাঁদ মামা গেয়ে শোনাচ্ছে না। চাঁদটাকে তবে এলিয়েনরা ধরে নিয়ে গেল? নাকি একেবারে গিলেই খেলো?

বিজ্ঞানী কর্কট চৌধুরী। পেয়েছেন পুরস্কার ভূরি ভূরি। তেলাপোকার পাখা থেকে ব্যাটারি, করলার রস দিয়ে মশার কয়েল, পাখাওয়ালা পালকি, বানিয়েছেন আরো কত কী! তাঁর মেয়ে টুনিও হয়েছে বিজ্ঞানী। সে অবশ্য ছোটখাটো বিষয় নিয়ে ভাবে না। গবেষণা করে আলো নিয়ে। সারাক্ষণ খুটুরখাটুর। সময়মতো খাবে না।

‘আব্বাজান! আমার লাইট ম্যাটার হয়ে গেছে! এই দেখো!’

‘মামণি! আমার মাথা এখন খারাপ। আমি হয়ে যেতে পারি মানুষখেকো।’

‘কিন্তু আমি যে বানিয়েছি আলোর বল, নাম টুনটুনি।’

‘সেটা আবার কী শুনি?’

‘যত অন্ধকার হোক, আর যেখানেই রাখো, এ বল থেকে আলো ছড়াবেই, যা দিয়েই ঢাকো।’

‘বেশ বেশ। এবার তো তা হলে সূর্যের কাজও শেষ।’

‘কিন্তু চাঁদ যে আমাদের খুব দরকার। ওটা ছাড়া মনে হয় সব অন্ধকার।’

বড় বড় বিজ্ঞানী বসে আছেন অনলাইন সভায়। সবার মুখ ফ্যাকাশে। নাসা তাদের নভোযান পাঠিয়েছে মহাকাশে। তাতে দেখা গেছে, চাঁদ যেখানে থাকার কথা সেখানে একটা বস্তু আছে। কিন্তু সেটা দেখা যাচ্ছে না ভালো। একেবারে নিকষ কালো।

কথা বললেন বিজ্ঞান কাউন্সিলের সভাপতি জনাব অষ্টমাচার্য, ‘আমার মনে হয়, চাঁদ আছে চাঁদের জায়গায়। কোনো কারণে যাচ্ছে না দেখা। কী যে করি হায়!’

‘গবুচন্দ্র, কিছু পারলে বুঝতে? চাঁদটাকে পারবে খুঁজতে?’

‘আমার তো মনে হয়, চাঁদ গেছে ভূতের দখলে, যদি তাদের অনুরোধ করি সকলে...।’

রেগে গেলেন মহাবিজ্ঞানী কর্কট।

‘এখন চলে দুই হাজার পাঁচশত সাল। ভূতে বিশ্বাস করো? পিটিয়ে তুলে ফেলা উচিত পিঠের ছাল।’

‘স্যার, রিসিভারে একটা সংকেত পাচ্ছি। অনুমতি দিলে পড়তে পারি।’

সায় পেতেই পড়তে শুরু করল গবুচন্দ্র। ‘হাঁউ মাঁউ খাঁউ। তোঁমরা আমাদের সিঁগন্যাল পাঁউ?’

ভূতুড়ে সিগন্যাল শুনে নড়েচড়ে বসলেন বিজ্ঞানীরা। গবুচন্দ্রের কথায় দপদপ করছে তাঁদের শিরা-উপশিরা।

গবুচন্দ্র পড়ে গেল বার্তাটা। ‘প্রিঁয় পৃঁথিবীবাঁসী। চাঁদের আঁলো আঁমরা খুঁব ভাঁলোবাঁসি। এঁখন থেঁকে আঁমরা ইঁচ্ছেমতো খাঁবো চাঁদের আঁলো। তোঁমাদের আঁকাশে আঁজ চাঁদ না থাঁকাই ভাঁলো। চাঁদটাকে আমরা ঢেঁকে দিলাম, ডাঁর্ক ম্যাটারের চাঁদরে। চাঁদের আঁলো আর যাঁবে না পৃঁথিবীতে, মাঁনুষ তোঁমরা যঁতই এবার কাঁদোরে। তোঁমাদের রাঁস্তায় হাঁজার হাঁজার বাঁতি, চাঁদ ছাঁড়াই এঁবার তোঁমরা কাঁটাও দিঁবস রাঁতি।’

বিজ্ঞান কাউন্সিলে বসেছিল টুনি। ভূতদের বার্তা শুনে প্রথমে খুব খেপল। পরে কী যেন ভাবল। বাবার কানে কানে বলল, ‘উপায় একটা আছে আব্বাজান। লাগবে শুধু ছোট একটা নভোযান।’

বিজ্ঞানী কর্কট কিছু বলার আগেই, গবুচন্দ্র চালু করল রকেট। সঙ্গে কী যেন নিয়েছে টুনি, ফুলে আছে তার পকেট।

চাঁদের কাছাকাছি গেল দুজন। পথ আগলে দাঁড়াল ভূতের দল।

‘যঁতই কঁরো ফঁন্দি, লাঁভ হঁবে না। চাঁদ আমাদের হাঁতে বঁন্দি।’

বলল ভূতের দল। স্পেসস্যুট পরে টুনি নামল। হাতের ইশারায় ভূতদের থামাল। বলল, ‘ফন্দি নয়, করতে এসেছি সন্ধি। চাঁদ ফেরত দেবে আমাদের হাতে, বিনিময়ে তোমরা সুখে-শান্তিতে থাকবে পৃথিবীতে। রাজি কি না বলো। তবে আমাদের সাথে চলো।’

ভূতেরা ভাবল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, ‘ঠিঁক আঁছে। কিন্তু এঁই অঁন্ধকার চাঁদর সঁরানোর প্রঁযুক্তি যেঁ নেই আঁমাদের কাঁছে।’

হাসল টুনি একটুখানি। পকেট থেকে বের করল ছোট্ট বল টুনটুনি। বলল, ‘এটা নিয়ে যাও চাঁদের মাটিতে। অন্ধকারের চাদর সরে যাবে, তোমরাও যখন খুশি তখন আলো খেতে পাবে।’

কথামতো কাজ করল ভূতের দল। টুনির তৈরি আলোর বল চাঁদের মাটিতে রাখতেই কেটে গেল আঁধারের কম্বল।

ছোট খোকা উঠল ছাদে। আকাশে ফালি চাঁদ দেখেই চিৎকার করে উঠল, চাঁদ দেখা গেছে চাঁদ! ঈদ হবে কাল। চাঁদ ফিরে পেয়ে বিজ্ঞানীরাও নিশ্চিন্ত। আগে যদি তাঁরা টুনিকে চিনত! এদিকে ভূতেরাও খুব খুশি। আর বিজ্ঞানী কর্কট চৌধুরী? আয়েশ করে খাচ্ছেন ইসবগুলের ভুসি। মেয়েকে বললেন, ‘ভালো কথা, ভূতের দল এখন থাকে কোথায়?’ বলল টুনি, ‘আগে যেখানে থাকত, বটের আগায়, শ্যাওড়াগাছে আর বাঁশঝাড়ের পাতায়।’