kalerkantho

সোমবার । ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮। ১৭ মে ২০২১। ০৪ শাওয়াল ১৪৪

হালদা নদীর পাহারাদার

দক্ষিণ এশিয়ার মিঠাপানির একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদী। একে গেল বছর ‘বঙ্গবন্ধু মৎস্য হেরিটেজ’ ঘোষণা করা হয়েছে। ডলফিন ও মা মাছ রক্ষায় কিছুদিন আগে হালদার ৯টি পয়েন্টে বসানো হয়েছে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সিসিটিভি ক্যামেরা। মাছেদের মাঝে এই খবর কেমন চাঞ্চল্য তৈরি করল, সেটা কল্পনা করেছেন নূসরাত জাহান নিশা

১৯ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



হালদা নদীর পাহারাদার

আঁকা : প্রসূন

সাঁতরে ছুটছে রুই ছানা। এসে থামল বন্ধুদের কাছে। সন্ধ্যা হয়ে আসছে। মৃগেল ছানা বলল, ‘কী হলো তোর? এভাবে পাগলের মতো সাঁতরে এলি কেন?’ রুই ছানা বলল, ‘তোরা এখানে গল্প করছিস আর ওদিকে মা মাছেদের তিথির সময় হয়ে এসেছে। একটু পরে মা মাছেরা রওনা হবে।’ মাত্র কয়েক দিন বয়সী কালবাউশ ছানা বলে উঠল, ‘তিথি কী? মা মাছেরা কোথায় যাচ্ছে?’ মৃগেল ছানা বলল, ‘তিথি কী জানিস না?’ কার্প ছানা বলল, ‘ওর না জানারই কথা।’ ‘আরে বাপু কেউ এখন বলো ঘটনা কী?’ বলল, কালবাউশ ছানা।’ রুই ছানা বলা শুরু করল, ‘তিথি হলো মা মাছেদের ডিম ছাড়ার সময়। প্রতিবছর হালদা নদীতে মা মাছেরা ডিম পাড়ে। এই সময়টায় পূর্ণিমা বা অমাবস্যা থাকে। সাধারণত এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত। এই তিথির সময় প্রচণ্ড বজ্রপাতসহ বৃষ্টি হয়, সেই সঙ্গে পাহাড়ি ঢল। তাই নদীতে অনেক স্রোত। পানিও ঘোলা থাকে। এরপর জোয়ার বা ভাটার শেষে পানি স্থির হলে মা মাছ ডিম ছাড়ে। ‘আমি মা মাছেদের সঙ্গে যাব।’ বলল, কালবাউশ ছানা। কার্প ছানা ধমকে উঠে বলল, ‘কত সাহস দুই দিনের পুঁচকের!’ ‘এত ভয় পাচ্ছ কেন তোমরা? মা মাছেদের বলব ঝড়-বৃষ্টি কমলে যেতে।’ বলল, কালবাউশ ছানা। ভেংচি কেটে রুই ছানা বলল, ‘না, তা হবে না। ডিম ছাড়তে হলে এমন সময়ই লাগে।’

এবার চল মা মাছদের বিদায় দিয়ে আসি। যদি আর দেখা না হয়। অবাক হয়ে কালবাউশ ছানা ওদের দিকে তাকিয়ে রইল। মনে মনে ভাবল, কেন দেখা হবে না! ভাবতে ভাবতে বাকিদের সঙ্গে সাঁতরে চলল। গিয়ে দেখল, মা মাছেরা সবার কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছে। ওরাও বিদায় জানাল। কিছুক্ষণ পর ছুটতে ছুটতে চিতল দাদু এলো। বলল, ‘মা মাছেরা কোথায়? নদীর পারে চারকোনা অনেক বাক্স দেখা গেছে। নদীর দিকে খালি তাকিয়ে থাকে। রাতে ওদের সবুজ চোখ জ্বল জ্বল করে। ভয় পেয়ে মাছের ছানারা বলল, ওরা তো চলে গেছে!’

‘আমিও রওনা হলাম। ওদের জানাতে হবে।’ বলল চিতল দাদু। কালবাউশ ছানা দাদুকে বলল, ‘আমিও যাব।’ দাদু বলল ‘না! ওদিকে বিপদ আছে!’

আর কথা না বাড়িয়ে সাঁতরে চলল চিতল দাদু, হালদা নদীর দিকে। নদীটির উৎপত্তি খাগড়াছড়ির রামগড় উপজেলার পাতাছড়া ইউনিয়নের হাসুকপাড়া মৌজার হালদাছড়া থেকে। এটি চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি, রাউজান ও হাটহাজারী উপজেলার মধ্য দিয়ে মিলেছে কর্ণফুলীতে। এটি পৃথিবীর একমাত্র জোয়ার-ভাটার নদী; যেখান থেকে সরাসরি রুইজাতীয় মাছের নিষিক্ত ডিম সংগ্রহ করা হয়। জেলেরা সেই ডিম বিক্রি করে মাছ চাষিদের কাছে। চিতল দাদু নদীর বিভিন্ন বাঁক পার হয়ে হালদায় এলো। ‘কে, চিতল দাদু নাকি?’ বলল ডলফিন। চিতল দাদু বলল, ‘আরে গাঙ্গেয় ডলফিন যে!’ গাঙ্গেয় ডলফিন মানে নদীর ডলফিন। কিন্তু ধীরে ধীরে এর সংখ্যা কমে যাচ্ছে। কখনো জালে আটকে আবার কখনো মানুষ এদের ধরে মেরে ফেলছে।

গাঙ্গেয় ডলফিন বলল, ‘দাদু, খবর পেয়েছ? নদীর পারে চারকোনা বাক্সের মতো কী জানি বসিয়েছে!’ চিতল দাদু বলল, ‘সেটার খোঁজেই তো এলাম। মা মাছেরা এসেছে ডিম পাড়তে। বাক্স বসিয়েছে মা মাছ ধরার জন্য মনে হয়।’ ‘হ্যাঁ! তাই হবে দাদু। বাক্সগুলো নদীর দিকে ৩৬০ ডিগ্রিতে তাকিয়ে থাকে।’ বলল গাঙ্গেয় ডলফিন। ভালো খবর এনেছ তো ডলফিন। চলো, ঘুরে দেখা যাক কত দূর পর্যন্ত বাক্সগুলো আছে।

তারা নদীর কোল ঘেঁষে সাঁতরে চলল। গাঙ্গেয় ডলফিন বলল, ‘কত দূর এলাম দাদু?’ চিতল বলল, ‘মনে হচ্ছে সাত কিলোমিটার। ৯টি পয়েন্টে খেয়াল করেছ?’ ‘হ্যাঁ, মদুনাঘাট থেকে শুরু করেছি আমরা, আমতোয়া ঘাটে শেষ।’ বলল চিতল দাদু।

এদিকে তীব্র স্রোতে হালদা নদীর তলদেশে অনেক গভীর গর্ত হয়েছে। জোয়ার বা ভাটা শেষ। পানি স্থির হয়ে গেছে। মা মাছেরা সেই জায়গায় গেছে ডিম ছাড়ার জন্য। নদীর ঘোলা পানিতে আছে মাছের ডিমের জন্য সব পুষ্টি উপাদান। প্রথমে মা মাছ অল্প ডিম ছেড়ে দেখে ডিমের জন্য এই জায়গা ঠিক আছে কি না। যদি না থাকে তারা সে জায়গায় আর ডিম ছাড়ে না।

চিতল দাদু আর ডলফিন মিলে মা মাছেদের চারকোনা বাক্সের কথা জানাল। সতর্ক থাকতে বলে তারা চলে গেল তীরের কাছে। ঘাপটি মেরে রইল পানির নিচে। এভাবে তিন-চার দিন কেটে গেল।

চিতল দাদু বলল, ‘গাঙ্গেয় ডলফিন, কিছু বুঝলে?’ বুদবুদ করে ডলফিন বলল, ‘তেমন কিছু না।’ চিতল দাদু বলল, ‘একটা জিনিস দেখেছ, নদীতে নৌকা কম, মাছ ধরার জালও বেশি দেখছি না। আবার নদীর তলদেশ থেকে বালু তুলত কিছু নৌকা; কিন্তু কয়েক দিন ধরে দেখছি না। মাঝে মাঝে কিছু মানুষ এলো, বাক্সগুলো এদিক-ওদিক ঘোরালো। আর হাতের ওই যন্ত্রে কী জানি দেখল! আবার চলে গেল।’ ‘তার মানে দাদু এই চারকোনা বাক্স দিয়ে মানুষ কিছু দেখছে? কারণ এই যন্ত্র দিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো মা মাছ ধরা হয়নি।’ বলল গাঙ্গেয় ডলফিন। ঠিক এমন সময় একটা নৌকা ওদের ঠিক ওপরে পানিতে থামল। চুপ হয়ে গেল ওরা। চিতল দাদু ফিসফিস করে বলল, ‘কিছু শুনতে পাচ্ছ?’ গাঙ্গেয় ডলফিন বলল, ‘মানুষরা কথা বলছে।’ ‘চলো নৌকার কাছে যাই। কী বলছে শুনি।’ বলল চিতল দাদু। নৌকার খুব কাছে এলো। গাঙ্গেয় ডলফিন শুনল একজন বলছে, ‘এখন কেউ ডলফিনের ক্ষতি করতে পারবে না। মা মাছেরা থাকবে নিরাপদে।’ কান আরো খাড়া করল ডলফিন। পুরো কথা শুনে খুশিতে বিশাল এক লাফ দিল। নৌকায় থাকা মানুষ ডলফিন দেখে হাততালি দিয়ে উঠল। এদিকে চিতল দাদু ভয়ে শেষ।

এই বাক্স আসলে কী চিতল দাদু আর গাঙ্গেয় ডলফিন তা জানাল মা মাছেদের। তারা অপেক্ষারত বাকি মাছেদের কাছে ফিরল। চারকোনা বাক্সগুলো কী? চিতল দাদু শুরু করল। ‘তোমরা তো জানো, প্রতিবছর মা মাছেরা হালদা নদীতে ডিম ছাড়তে যায়। অনেকে মারা পড়ে। কিন্তু সব মানুষ দুষ্ট না। এখন ভালো মানুষকে নদীর পারে পাহারাদার বসিয়েছে। এই পাহারাদারগুলো দেখবে কোন দুষ্ট মানুষ মাছ ধরছে, বালি তুলছে কিংবা ডলফিনদের মারছে।

এই পাহারাদারের নামই হলো চারকোনা বাক্স।’ চিৎকার করে ডলফিন বলল, ‘দাদু, এগুলোর নাম সিসি ক্যামেরা! শুনলে না মানুষগুলো বলল। ওই সব মানুষ ঘরে বসে দেখবে সিসি ক্যামেরা দিয়ে, নদীতে কোনো দুষ্ট লোক এসেছে কি না। আমরা এখন নিরাপদ।’ মাছেরা হাততালি দিয়ে উঠল। কালবাউশ ছানা বলল, এইবার বুঝেছি, কেন তুমি আমায় নিতে চাওনি। দাদু, তুমি আর গাঙ্গেয় ডলফিন মিলে গোয়েন্দার কাজ করো, খুব ভালো হবে। অন্য মাছেরা হেসে উঠল। মা মাছেরাও ডিম পেড়ে নিরাপদে ঘরে ফেরা শুরু করল।