kalerkantho

শুক্রবার। ৩১ বৈশাখ ১৪২৮। ১৪ মে ২০২১। ০২ শাওয়াল ১৪৪২

[ যেভাবে এলো ]

বিশাখা থেকে বৈশাখ

মাসুম সায়ীদ

১২ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বিশাখা থেকে বৈশাখ

বৈসাবির দৃশ্য এঁকেছে সৃজনী চাকমা। সে রাঙামাটি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণিতে পড়ে

অনেক অনেক কাল আগে দক্ষ নামে এক রাজা ছিল। তার স্ত্রীর নাম প্রসূতি। তাদের ছিল অনেক মেয়ে। ২৪, ৫০, এমনকি কারো কারো মতে ৬০ জন। এদের মধ্য থেকে ২৭ জনকে রাজা বিয়ে দিয়েছিল চন্দ্রের কাছে। ওদিকে চন্দ্র থাকে আকাশে। কী আর করা? চন্দ্রের সঙ্গে ঘর করার জন্য রাজকন্যারা নক্ষত্র হয়ে চলে যায় আকাশে। চন্দ্র পালা করে একেক দিন একেক স্ত্রীর ঘরে থাকে। এভাবে ২৭ দিন পার করে বাকি তিন দিন চন্দ্র নিজের মতো একা থাকে। সেই থেকে এভাবেই কেটে যাচ্ছে চন্দ্রের দিন। তারপর সপ্তাহ, মাস পেরিয়ে বছর। কি দারুণ না গল্পটা?

এটা চালু হয়েছে মহাভারত থেকে। আর মহাভারত মানেই তো মুনি-ঋষিদের গল্প। আসলে মুনি-ঋষিরা ছিলেন খুব বুদ্ধিমান। তখনকার দিনের ধ্যান-ধারণা আর সমাজজীবনের নানা চিত্র বর্ণনা করেছেন গল্পের মাধ্যমে। গল্পের ছলে মহাকাশের অপরিচিত তারার জগৎকেও তাঁরা পরিচিত করে ফেলেছিলেন কয়েকটি নাম ও ছবির মাধ্যমে।

তখন তো আর ঘড়ি ছিল না। তারিখ দেখার জন্য ছিল না ক্যালেন্ডার। সময়, ক্ষণ আর দিন-তারিখ বোঝার জন্য মানুষ নির্ভর করত সূর্য-চন্দ্র আর গ্রহ-নক্ষত্রের ওপর। মাথার ওপর অসংখ্য গ্রহ-নক্ষত্র। সব চেনা এত সহজ ছিল না। এই কাজে পারদর্শী ছিলেন মুনি-ঋষিরা। তাঁরা লক্ষ করেছিলেন, এসব তারা দল ধরে থাকে। দল ধরেই চলে। এদের মধ্যে আছে সুন্দর শৃঙ্খলা। আস্তে আস্তে তাঁরা এক একটা দলকে এক একটা প্রাণীর আকৃতিতে কল্পনা করে সেই নামে ডাকা শুরু করলেন। এভাবে বুদ্ধিমান মানুষরা সূর্যের এক বছরের চলার পথে (কক্ষপথ) আবিষ্কার করে ফেললেন ১২টি তারকারাশি। এগুলোর নাম দেওয়া হলো—মেষ বা ভেড়া, বৃষ বা ষাঁড়, মিথুন বা যুগল মানুষ, কর্কট বা কাঁকড়া, সিংহ, কন্যা বা নারী, তুলা বা দাঁড়িপাল্লা, বিছা বা বিচ্ছু, ধনু বা ধনুক, মকর বা কুমির, কুম্ভ বা কলস ও মীন বা মাছ। জ্যোতিষীরা এগুলোর অবস্থান ধরেই রাশিফল নির্ণয় করেন। আর চন্দ্রের নিজের কক্ষপথে একবার ঘুরে আসতে সময় লাগে এক মাস বা সাড়ে উনত্রিশ দিন। গণনার সুবিধার জন্য যেটাকে ধরে নেওয়া হয়েছে ৩০ দিন বা এক মাস। এই এক মাসের ২৭ দিনে চন্দ্র দেখা পায় ২৭টা নক্ষত্রের। তাদের নাম হলো—অশ্বিনী, কৃত্তিকা, রোহিণী, মৃগশীর্ষ, আর্দ্রা পুনর্বসু, পূষ্য, আশ্লেষ, মঘা, পূর্ব ফাল্গুনী, উত্তর ফাল্গুনী, হস্ত, চিত্রা, স্বাতী, বিশাখা, অনুরাধা, জ্যেষ্ঠ, মূলা, পূর্বাষাঢ়, উত্তরাষাঢ়, শ্রাবণ, ধনিষ্ঠা, শতভিষজ, পূর্বভাদ্রপাদ, উত্তর ভাদ্রপাদ ও রেবতি। গল্পে বলা হয়েছে, এরা এক একজন রাজকন্যা। এদের মধ্যে ষোড়শ বা ষোলোতম মেয়ে বিশাখা। তার নামেই নাম হয়েছে বাংলা সনের প্রথম মাস বৈশাখের নাম। অন্য মাসের নামগুলোও এদের মধ্য থেকেই হয়েছে। আসলে কিন্তু এরা একা নয়। মানে বিশাখা একটি নয়—একগুচ্ছ তারার নাম। হবেই তো। রাজকন্যা বলে কথা। তারা তো আর সখী-দাসি ছাড়া একা থাকতে পারে না। আসলে তখনকার দিনে নক্ষত্র বলতে একগুচ্ছ তারাকেই বোঝানো হতো। তবে গুচ্ছভেদে তারার সংখ্যা কমবেশি আছে।

সাল গণনা করা হয় দুইভাবে। সূর্যের গতি অনুসরণ করে সৌর সাল। যেমন—গ্রেগরি বা খ্রিস্টীয় সাল। যেটাকে আমরা বলি ইংরেজি সাল। আর চন্দ্রের গতিপথ অনুযায়ী চান্দ্র সাল। যেমন—আরবি বা হিজরি সাল। বাংলা সাল করা হয়েছে সৌর সাল আর চান্দ্র সাল মিলিয়ে মোগল সম্রাট আকবরের সময়। এতে বৈশাখকে ধরা হয় বছরের প্রথম মাস হিসেবে। খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে ফসল কাটার সময়কে সামনে রেখে। তাই বাংলা সনকে একসময় ফসলি সন বা সালও বলা হতো।

আমাদের সাত দিনের নামও কিন্তু গ্রহ-তারার নামেই হয়েছে। রবি হয়েছে সূর্য থেকে। সোম চন্দ্রের নামে। বৃহস্পতি, শুক্র, শনি, মঙ্গল, বুধ সৌরজগতের পাঁচটি গ্রহের নাম।

আসলে গ্রহ-নক্ষত্রের জগৎ দারুণ এক রহস্যের জগৎ। এ সম্পর্কে জানতে চাইলে পড়তে পারো মোহাম্মদ আবদুল জব্বারের ‘তারা পরিচিতি’ বইটি। বিখ্যাত লেখক সৈয়দ মুজতবা আলী বইটিকে বাংলায় লেখা বিংশ শতকের সেরা বিজ্ঞানের বই বলে আখ্যায়িত করেছেন।