kalerkantho

শুক্রবার । ৪ আষাঢ় ১৪২৮। ১৮ জুন ২০২১। ৬ জিলকদ ১৪৪২

কথাবলা গাছ

আবেদীন জনী   

৫ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



কথাবলা গাছ

আঁকা : মাসুম

ঝাঁকড়া একটা কাঁঠালগাছ। বেশ বড়। মোটাসোটা। কিন্তু গাছটিতে কাঁঠাল ধরে না। এর চেয়ে কম বয়েসি গাছে কয় বছর আগে থেকেই কাঁঠাল ধরছে। গাছভর্তি কাঁঠাল।

অনেক বছর আগে বাড়ির পাশে গাছটি বুনেছিলেন নূরু মিয়া। কাঁঠাল ধরে না বলে তাঁর মনে খুব কষ্ট। বড় শখের গাছটা। ভালো জাতের কাঁঠালের চারাটি তিনি জেনেশুনেই কিনে এনেছিলেন নার্সারি থেকে। সেই শখের গাছে কাঁঠালের দেখা নেই। কষ্ট তো লাগবেই। 

কষ্ট লাগলেও ধৈর্য আছে নূরু মিয়ার। আশায় বুক বেঁধে বলেন, ‘এবার কাঁঠাল ধরেনি, কিন্তু পরেরবার ধরতে পারে।’ এভাবে আশায় আশায় অনেক বছর গেছে। প্রতি মৌসুমেই শূন্য গাছ। একটা কাঁঠালেরও খবর নেই।

হঠাৎ রেগে গেলেন নূরু মিয়া। ‘এই গাছ আর রাখব না।’ বলেই কুড়াল নিয়ে কাটতে গেলেন গাছটি। কোপ দিতে যেই কুড়ালটি উঁচু করেছেন, অমনি কে যেন বলল, ‘থামুন।’

নূরু মিয়া সামনে-পেছনে তাকিয়ে দেখলেন, কোনো মানুষজন নেই। তাহলে কে কথা বলল?

ভাবল, এটা তার মনের ভুল।

আবারও কোপ দিতে গেলেন। আবারও একই কণ্ঠস্বর, ‘থামুন নূরু মিয়া।’

এবার নাম ধরে বলায় ভয় পেয়ে গেলেন। ভয় তো পাওয়ারই কথা। আশপাশে কাউকে দেখছেন না, তাহলে কথা বলছে কে? মনে মনে বললেন, ভূত না তো?

নূরু মিয়া ভূত বিশ্বাস করেন। ভয়ও পান খুব। ভূত শব্দটি মনে হলেই শরীরের লোমগুলো দাঁড়িয়ে যায়। আজও সে রকম হয়েছে। নূরু মিয়া দৌড় দেবেন দেবেন অবস্থা, এমন সময় তার কানে ভেসে এলো—আমি... কাঁঠালগাছ বলছি। ভয় পাওয়ার কিছু নেই।

নূরু মিয়া থতমত খেয়ে বললেন, ‘কয় কী! গাছেরা কথা বলতে পারে নাকি?’

কাঁঠালগাছ বলল, ‘পারবে না কেন? গাছদের প্রাণ আছে তো।’

—তা কী বলতে চাও?

—আমাকে কাটবেন না। আমি বেঁচে থাকতে চাই।

—যে গাছে কাঁঠাল ধরে না, সে গাছ রেখে আমি কী করব? এমনি এমনি জায়গা দখল করে আছ। কেটে চুলোর জ্বালানি বানালেও লাভ আছে। জায়গা খালি হলে অন্য একটা গাছ বুনতে পারব।

 

কাঁঠালগাছ অনেক দুঃখের সঙ্গে বলল, ‘আমি ফল দিতে পারি না বলে কেটে ফেলতে চান। হায়রে কপাল! এমন কপাল নিয়ে কেন জন্ম হলো আমার?’

গাছটি আরো বলল, ‘আচ্ছা নূরু মিয়া, আপনার তো একটা ছেলে আছে। ছেলেটা ইশকুলে গিয়ে কোনো দিনই পড়া বলতে পারে না। পরীক্ষায় গোল আলু পায়। এ জন্য আপনি আমার ছায়াতলে বসে বসে প্রায়ই দুঃখ প্রকাশ করেন। তাই না?’ 

নূরু মিয়া বললেন, ‘হ্যাঁ, তুমি ঠিকই বলেছ। আমার ছেলেটা লেখাপড়ায় একেবারেই গোল আলু মার্কা।’

—আমাকে কেটে ফেলতে চান, কাটুন। কিন্তু ওই আমড়া কাঠের ঢেঁকি ছেলেকে দিয়ে কী করবেন আপনি? শুধু শুধু হাঁড়ির ভাত ফুরিয়ে লাভ কী?

নূরু মিয়া ভীষণ উত্তেজিত হয়ে বললেন, ‘মুখ সামলে কথা বলো গাছ। আমার আদরের ছেলেকে নিয়ে আবোলতাবোল বললে তোমাকে এক্ষুনি কেটে ফেলব আমি। শোনো বোকা গাছ, আমার ছেলেটা লেখাপড়ায় ভালো না হলেও খুব সুন্দর সুন্দর ছবি আঁকতে পারে। গান গাইতে পারে। ক্রিকেটও খেলতে পারে। সেই ছেলেকে তুমি বলছ আমড়া কাঠের ঢেঁকি?’

কাঁঠালগাছ বলল, ‘আপনার রাগ দেখে আমি খুব ভয় পাচ্ছি। সুযোগ দিলে মরার আগে কিছু কথা বলতে চাই।’

—বলো, কী বলতে চাও?

—আপনার ছেলের মতো আমারও মাত্র একটা দোষ। কিন্তু অনেক গুণ আছে। দোষটা হচ্ছে, আমি ফল দিই না। আর গুণগুলো হচ্ছে, আমি মানুষের বেঁচে থাকার আক্সিজেন দিই। ছায়া দিই। আমার সবুজ পাতাগুলো পেড়ে আপনি মাঝেমধ্যেই গরু-ছাগলকে খাওয়ান। ঝরাপাতাগুলো জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করেন। চেয়ে দেখুন, আমার ডালে কয়েকটা পাখির বাসা। আমি পাখিদেরও উপকারে লাগি। তাহলে আমাকে কেটে ফেলতে চান কেন? ভালোবাসতে পারেন না? আমি তো কোনো ক্ষতি করিনি।

কাঁঠালগাছের কথা শুনে নূরু মিয়ার চোখ খুলে গেল। মায়া হলো গাছটির প্রতি। সঙ্গে সঙ্গে গাছটি কাটার সিদ্ধান্ত বাতিল করলেন তিনি। মনে মনে বললেন, গাছ ঠিক কথাই বলেছে। শুধু ফল দেওয়াই গাছের একমাত্র কাজ না। আরো অনেক কাজ আছে। অনেক অনেক উপকার করে গাছ।



সাতদিনের সেরা