kalerkantho

শুক্রবার । ৩ বৈশাখ ১৪২৮। ১৬ এপ্রিল ২০২১। ৩ রমজান ১৪৪২

[ গল্প ]

চালাকুর আত্মবিশ্বাস

আহমেদ রিয়াজ   

১ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



চালাকুর আত্মবিশ্বাস

অলংকরণ : মাসুম

সবে স্কুলে ভর্তি হয়েছে চালাকু। মানে চালাকু খান। তো একদিন চালাকুর বাবা বললেন, ‘চলো তো চালাকু, আমরা যোগ করা শিখব।’

মুখটা ভার করে ফেলল চালাকু। বলল, ‘আমার যে গণিত ভালো লাগে না!’

অবাক হলেন বাবা। জানতে চাইলেন, ‘কেন?’

‘ভয় লাগে। মনে হয়, আমি পারব না।’

বাবা বললেন, ‘গণিত খুব সহজ। বিশ্বাস হচ্ছে না? আচ্ছা, বলো তো দুই আর দুইয়ে কত হয়?’

চালাকু জবাব দিল চটপট, ‘চার।’

‘বাহ!’ খুব খুশি হলেন বাবা। ‘দেখেছ? তুমি পেরেছ। ভয়ের কিছু নেই। আত্মবিশ্বাস থাকলে সবই সম্ভব।’

এবার পরের ধাপে এগোলেন বাবা। জানতে চাইলেন, ‘তিন আর এক-এ কত হয়?’

‘চার।’

আরো খুশি হলেন বাবা। চালাকুর পিঠ চাপড়ে দিলেন। তারপর আবার জানতে চাইলেন, ‘দুই আর তিন-এ কত হয়?’

‘চার।’

‘চার!’ বাবা অবাক। বোঝাতে লাগলেন চালাকুকে, ‘ধরো, তোমার কাছে দুটো কলা আছে। আমি দিলাম তিনটা। তাহলে কয়টা কলা হবে?’

‘চারটা।’

‘উঁহু। চারটা নয় চালাকু, পাঁচটা হবে।’

চালাকু অবাক হয়ে বলল, ‘তাই নাকি! পাঁচটা হবে? কেন পাঁচটা হবে? চারটা হলে কী অসুবিধা?’

নাহ! সোজা পথে চালাকুকে গণিত শেখানো যাবে না। পথটা একটু বাঁকা করতে হবে।

সেদিনই বিকেলে একটা চকোলেটের বয়াম আনলেন বাবা। ওই যে দোকানে চকোলেট সাজিয়ে রাখে যে ধরনের বয়ামে, তেমনি একটা কাচের বয়াম আর কি! বয়ামটা এনে চালাকুর সামনে রাখলেন। জানতে চাইলেন, ‘এটা কী বলো তো!’

চটপট জবাব দিল চালাকু, ‘চকোলেটের বয়াম, কিন্তু বয়ামে একটাও চকোলেট নেই কেন?’

‘কারণ, চকোলেট শেষ হয়ে গেছে তাই।’

বয়ামের গায়ে একটা কাগজ আটকে দিলেন। কাগজে লেখা ‘আত্মবিশ্বাস’।

লেখাটা শব্দ করে পড়ল চালাকু, ‘আত্মবিশ্বাস।’ তারপর জানতে চাইল, ‘আত্মবিশ্বাস কী?’

‘আত্মবিশ্বাস মানে নিজের ওপর বিশ্বাস। যেকোনো কাজে আত্মবিশ্বাস থাকতে হয়।’

এরপর বয়ামের ঢাকনায় সুন্দর একটা ছিদ্র করলেন বাবা। মাটির ব্যাংকে যে রকম ছিদ্র থাকে, ঠিক সে রকম।

বয়ামটা দেখিয়ে চালাকুর কাছে জানতে চাইলেন বাবা, ‘বলো তো এটা কী?’

চালাকু বলল, ‘ওটার গায়েই তো লেখা রয়েছে, আত্মবিশ্বাস।’

বাবা মুচকি হেসে বললেন, ‘না, এটা ব্যাংক। আমরা এই ব্যাংকে টাকা জমাব। অনেক টাকা হলে তুমি কী করবে?’

চালাকু বলল, ‘আমার অনেক দিনের ইচ্ছা একটা ফুটবল কিনব। তারপর সবাই মিলে খেলব।’

‘খুব ভালো ইচ্ছা। এবার তোমার ইচ্ছা পূরণ হবে চালাকু।’

চালাকু অবাক। চকোলেটের খালি বয়াম, থুক্কু আত্মবিশ্বাস, আরে ধ্যাৎ, ব্যাংক দিয়ে কিভাবে ইচ্ছা পূরণ হবে—ওর মাথায় ঢুকছে না। হঠাৎ চালাকুর চোখের সামনে পকেট থেকে দুই টাকার একটা নোট বের করলেন বাবা। তারপর সেটা ভাঁজ করে ব্যাংকের ভেতর ঢুকিয়ে দিলেন। বললেন, ‘এই আমি ব্যাংকে দুই টাকা জমা রাখলাম।’

পকেট থেকে আরো একটা দুই টাকার নোট বের করলেন। সেটা চালাকুর হাতে দিয়ে বললেন, ‘তুমিও রাখো।’

টাকাটা ভাঁজ করে ব্যাংকের ভেতর ঢুকিয়ে দিল চালাকু।

বাবা জানতে চাইলেন, ‘তাহলে আমরা আজ কত টাকা রাখলাম ব্যাংকে?’

চালাকু হিসাব করে বলল, ‘চার টাকা।’

‘এবার খাতায় লিখে রাখো। প্রতিদিন যত টাকা ব্যাংকে রাখবে, লিখে রাখবে। তাহলেই তুমি বুঝতে পারবে ব্যাংকে কত টাকা জমেছে।’

এর পর থেকে কেউ ওকে টাকা দিলেই হলো, আগের মতো এটা-ওটা কিনে খায় না। ব্যাংকে রাখে চালাকু। এটা-ওটা খাওয়ার চেয়ে একটা ফুটবল খুব দরকার ওর। আর ব্যাংকে যত টাকা রাখে সেটা খাতায় লিখেও রাখে। কিন্তু...?

সব মিলিয়ে কত হলো! এটা জানার কৌতূহল হয় ওর। আর ওই কৌতূহল থেকে লিখে রাখা টাকার অঙ্কটা যোগও করে রাখে। শুরুতে যোগ করতে একটু কষ্টই হতো চালাকুর। এখন আর কষ্ট হয় না; বরং যোগ করতে ওর বেশ ভালো লাগে। আর ভালো লাগে বলেই যোগটা বেশ সহজ হয়ে গেছে ওর কাছে।

দিন যায়, চালাকুর ব্যাংক ভরতে থাকে। যোগফলও বাড়তে থাকে।

তারপর একদিন...

চালাকুর ব্যাংকটা ভরে যায়। একেবারে ঠাসা। ব্যাংক দেখে বাবা মুচকি হেসে বললেন, ‘কত টাকা জমেছে চালাকু?’

ওর নাম চালাকু খান। ও প্রতিবারই টাকা রাখার পর যোগ করে রেখেছে। কাজেই ও জানে কত টাকা জমেছে। মুচকি হেসে হিসাবের খাতা বের করল চালাকু। তারপর মোট যোগফলটা জানাল, ‘হুররে। অনেক টাকা হয়ে গেছে। ছয় শ টাকা!’

চোখ দুটো কপালে তুলে দিয়ে বাবা বললেন, ‘ছয় শ টাকা! বাহ! ‘সত্যিই অনেক টাকা হয়েছে চালাকু। এবার চলো!’

‘কোথায়?’

‘ফুটবল কিনবে না? তোমার ফুটবল তুমি কিনবে। আমি দেখব। কারণ ওটা তোমার নিজের টাকা।’

হৈহৈ করে বাবার সঙ্গে দোকানে গেল চালাকু। বড়সড় একটা ফুটবল পছন্দ করল। বাবা দরদাম করলেন। তারপর ফুটবল কিনে ঘরে ফিরল চালাকু। আজ নতুন ফুটবল নিয়ে মাঠে যাবে। বন্ধুদের সঙ্গে খেলবে। খুব খুশি ও। ফুটবল নিয়ে যে-ই বাইরে যাবে, অমনি হঠাৎ বাবা বললেন, ‘এটা কী চালাকু?’

বাবার হাতের দিকে তাকাল চালাকু। বলল, ‘ব্যাংক।’

বাবা বললেন, ‘উঁহু। এটা আত্মবিশ্বাস। এই

আত্মবিশ্বাসই তোমাকে একটা ফুটবল উপহার দিয়েছে। আর এই আত্মবিশ্বাসের কারণেই তুমি যোগ করা শিখে গেছ।’

তাই তো! এভাবে ‘আত্মবিশ্বাস’ ওকে যোগ করা শিখিয়ে দেবে, চালাকু কিন্তু ভাবেওনি। আরো বেড়ে গেল চালাকুর খুশি। আরো আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠল ও। কিন্তু!

ফুটবল কেনার পরও কিছু টাকা রয়ে গেল। চালাকু বলল, ‘টাকাগুলো কী করব বাবা?’

বাবা বললেন, ‘ব্যাংকে রেখে দাও। নতুন কিছু করার আত্মবিশ্বাস তৈরি হবে।’

বিড়বিড় করল চালাকু, ‘নতুন কিছু। নতুন কিছু।’

পরদিন।

খেলার মাঠের পাশে একটা দোকান খুলে বসেছে চালাকু। দোকানে সারি সারি বয়াম রাখা। চালাকুর বন্ধুরা এলো দোকানে। এক বন্ধু জানতে চাইল, ‘বয়ামগুলো খালি কেন চালাকু?’

চালাকু বলল, ‘কোথায় খালি?’

‘কাচের বয়াম, বাইরে থেকেই তো দেখা যাচ্ছে খালি।’

ডানে আর বাঁয়ে মাথা নাড়ল চালাকু। বলল, ‘এগুলো খালি নয়। ভরা। তবে চোখে দেখা যায় না।’

‘বুঝেছি। এগুলো বাতাস দিয়ে ভরা। বাতাস তো চোখে দেখা যায় না, তাই না?’

চালাকু বলল, ‘শুধু বাতাস নয়, আরো একটা জিনিস আছে বয়ামগুলোয়। আর সেগুলোই আমি বিক্রি করব।’

‘কী জিনিস?’

বুক ফুলিয়ে জবাব দিল চালাকু, ‘আত্মবিশ্বাস। লাগবে কারো?’

মন্তব্য