kalerkantho

শুক্রবার । ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৭ নভেম্বর ২০২০। ১১ রবিউস সানি ১৪৪২

[ চ লো যা ই ]

কাজলদিঘি

২৩ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



কাজলদিঘি

কাজলদিঘির পাড়ে বসে ‘কাজলাদিদি’ পড়ছে ঋতুবর্ণা আক্তার রাশিকা। কাজলদিঘি কালিয়াগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী। ছবি : লেখক

২৭ নভেম্বরে তাঁর জন্ম। তিনি যতীন্দ্রমোহন বাগচী। তোমরা হয়তো মনে করতে পারবে না তাঁকে; কিন্তু তাঁর কাজলা দিদি তোমাদের অনেককেই নাড়া দিয়েছে। পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার কাজলদিঘি ঘিরে চালু আছে যে বাগচী মশাই এখানে বসেই লিখেছিলেন কাজলা দিদি। লুৎফর রহমান তোমাদের নিয়ে যাচ্ছেন কাজলদিঘিতে

দিঘিটি অনেক বড়। ইউনিয়নের নামও হয়েছে দিঘি থেকে—কাজলদিঘি, কালিয়াগঞ্জ। বাগচী মশাই এখানে বসেই কবিতাটি লিখেছেন তার কোনোই প্রমাণ নেই; কিন্তু পঞ্চগড়ের অনেকের কাছে শুনবে—হ্যাঁ, এখানেই তিনি লিখেছিলেন,

‘বাঁশ বাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ওই—

মাগো আমার শোলক-বলা কাজলা দিদি কই?’ কালিয়াগঞ্জের ছেলে-মেয়েরা এ নিয়ে গর্বিত ও আনন্দিত। আনন্দের দাম কম কিসে?

 

বেরিয়ে পড়ি চলো

পঞ্চগড় সদর থেকে  দক্ষিণ-পূর্বে মাত্রই ১৩ কিলোমিটার। দিঘিটির পারে  ৫৫ থেকে ৬০টি পরিবার থাকে। দক্ষিণ-পশ্চিমের কিছুটা জুড়ে হাট-বাজার। কিছুটা আবার কবরস্থান। চারধারেই অনেক রকম ফলের গাছ আর কাঠগাছ। বাঁশ বাগানও আছে অনেকটা জায়গাজুড়ে। লেবুগাছও আছে কয়েকটি। কবিতাটিতে আছে, ‘পুকুর ধারে নেবুর তলে, থোকায় থোকায় জোনাক জ্বলে।’ দিঘিটি ১৫ একর জায়গাজুড়ে আর পারের জায়গা ৬০ একর। খুব মনোরম পরিবেশ। গাছে গাছে পাখিদের ওড়াউড়ি। সন্ধ্যাও নামে পাখির ডাকে। দিঘির পারের মানুষ লুত্ফা বেগম। বয়স ষাটের বেশি। বললেন, ‘ছোটবেলায় আমিও ওই কবিতা পড়েছি। মনেও আছে লাইনগুলো।’ ঋতুবর্ণা আক্তার রাশিকা পড়ে চতুর্থ শ্রেণিতে। বলল, ‘কাজলা দিদি আমাদের বাংলা বইতেই আছে। প্রথম কয়েক লাইন তো আমরা সবাই পারি।’ অনেক গ্রাম থেকেই কিন্তু কাজলা দিদি হারিয়ে গেছে। এখনো হারায়। ছোট বোনটি তাঁকে শত বছর ধরে খুঁজে ফেরে।

 

কাহিনিটি দুঃখেরই

দিঘির চারপাশ জংলা ছিল আগে। বাঘ-ভালুকের উৎপাতও নাকি ছিল। দিনে দিনে মানুষ এসে বসতি গড়ে। পাকিস্তান আমলে দিঘির পারে ভূমিহীনদের আশ্রয় দেওয়া হয়। দিঘিটি কবে কে খনন করেছিলেন তা জানা যায় না। লোকমুখে কিছু কথা ফেরে। ড. নাজমুল হক সেই লোককাহিনি ধরেছেন তাঁর ‘পঞ্চগড় : ইতিহাস ও লোক ঐতিহ্য’ বইতে। ওখানে এক রাজা ছিলেন। রাজার রানি ছিলেন সাতজন। দিঘিটির দক্ষিণ পারেই ছিল রাজার বাড়ি। তাঁরা ছিলেন নিঃসন্তান। ছোট রানিকে এক সন্ন্যাসী তিনটি ফল খেতে দিলেন। বললেন, এই ফল খেলেই ছোট রানি সন্তান লাভ করবেন; কিন্তু সতিনরা ষড়যন্ত্র করে তার ফল খেয়ে নেয়। নিরুপায় ছোট রানি ফলের খোসাগুলোই খান। ভাগ্যক্রমে ছোট রানি এক কন্যাসন্তান লাভ করেন। পুরো রাজ্যে আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে। সেই রাজকন্যার নাম রাখা হয় কাজলিনী। সব কিছু ভালো মতোই চলছিল। হঠাৎ করে রাজ্যে দেখা যায় খরা, নেমে আসে দুর্ভিক্ষ। তীব্র পানির সংকট দেখা দেয়। রাজা আবার সেই সন্ন্যাসীর কাছে যান। সন্ন্যাসী রাজাকে একটি দিঘি খননের পরামর্শ দেন; কিন্তু অনেক গভীর করে খননের পরও পানি উঠল না। রাজা আবার গেলেন। সন্ন্যাসী বললেন, ‘জলদেবতাকে তুষ্ট করতে হবে, ডুবিয়ে দিতে হবে রাজকন্যাকে।’ রাজার বুক ফেটে যায়; কিন্তু প্রজাদের কষ্টের কথা চিন্তা করে রাজি হলেন। রাজার নির্দেশে কিশোরী রাজকন্যা পূজার উপকরণ নিয়ে নেমে গেল মাঝ পুকুরে। পূজা-অর্চনা করল ভক্তিভরে। পূজা শেষ করতেই চারপাশ দিয়ে কলকল শব্দে উঠে আসে জলধারা। অল্প সময়ের মধ্যে কাজলিনী তলিয়ে যায় পানিতে। হাহাকার ছড়িয়ে পড়ে পুরো রাজ্যে। রাজকন্যার স্মৃতি ধরে রাখতে রাজা দিঘিটির নাম রাখেন কাজলদিঘি। পরের অনেককাল নাকি গভীর রাতে কোনো এক কন্যার ক্রন্দন ধ্বনি শুনেছে দিঘির পারের লোকজন। এখনো বছরের নির্দিষ্ট দিনে অনেক লোক পূজা দিতে আসে।

এমন কথাও শোনা যায়, বাসনকোসন চাইলেই পাওয়া যেত দিঘি থেকে। আরো শোনা যায়, বিশাল এক গজার মাছ ছিল এখানে। সেটির কানে স্বর্ণের ঝুমকা ছিল। কেউ কেউ নাকি স্বর্ণের নৌকাও ভাসতে দেখেছে। একবার পুকুরটি পুনঃখননের সময় দেখা গেছে এর মাঝখানটা ইট বাঁধানো। কিছু ইটে কন্যার পায়ের ছাপও দেখেছে অনেকে। কাজলদিঘির বাসিন্দা আহম্মদ আলী বলেন, ‘রহস্যময় এই দিঘি। আগে বড় বড় মাছ ছিল। ৭০ কেজি পর্যন্ত ওজনের মাছও পাওয়া গেছে। আমি নিজেই বড়সড় এক গজার মাছ দেখেছি। সেটির কানে স্বর্ণের ঝুমকা ছিল।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা