kalerkantho

শুক্রবার । ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৫ জুন ২০২০। ১২ শাওয়াল ১৪৪১

উম চিকি চিকি চিকি

বাবলু ভঞ্জ চৌধুরী

৩ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



উম চিকি চিকি চিকি

অঙ্কন : মাসুম

হিমেল জোছনায় ঘুমোচ্ছে খাজার মাঠ। ওই মাঠের মাঝখানে একটা বাবলাগাছ। ওই গাছের মগডালে তোসোদের বাড়ি। মায়ের পেখমের তলায় শুয়ে আছে তোসো। মা ঘুমোচ্ছে। তোসোর ঘুম আসছে না। নড়ছে। নড়তে নড়তে টুপ করে মাথা বের করে দিল বাইরে।

‘অত নড়ছ কেন তোসো?’

‘কই! নড়ছি না তো!’

‘দুষ্টুমি কোরো না! ঘুমোও! অনেক রাত হয়েছে।’

‘মা, আমি উড়ব!’

মা কিছু বলে না। মা আবার ঘুমিয়ে পড়েছে।

‘ও মা শুনছ?’ পেখমে ধাক্কা দিয়ে বলে তোসো।

মা ঘুম চোখে উত্তর দেয়, ‘হু!’

‘আমি উড়ব!’

‘তুমি এখনো উড়তে শেখোনি,’ বলে মা।

‘এখনই তো শেখার সময়, মানুষেরা কেউ নেই, ধরে নিয়ে যেতে পারবে না।’

‘তুমি পড়ে যাবে, আমি তুলতে পারব না, ঘুমোও তো! বড় হলে উড়ো!’ মায়ের নাক ডাকছে।

তোসো খরখর করতে করতে ঠোঁটটা বের করে দেয়। তারপর খানিকক্ষণ চুপ হয়ে দেখে নেয় মা ঘুমোচ্ছে কি না। না, মা ঘুমোচ্ছে। তোসো গলা ঠেলে চোখ বের করে।...বাহ! কী সুন্দর! মেঘরা উড়ছে! হাসছে! ...আরে! নিচে জলার মধ্যে একটা ব্যাঙ! জলে ডুবে মুখ বের করে আছে!

তোসো ভাবে, ‘মেঘদের পাখা নেই, তবু তারা ওড়ে, আমি কেন পারব না? চাঁদ ঝুলে থাকে আকাশে, পড়ে যায় না, তবে আমি কেন পড়ে যাব? ব্যাঙ ডুবে আছে জলে, শীত লাগে না, তবে আমার কেন লাগবে?’

তোসো মাকে চট করে দেখে নেয়। নাহ্! মায়ের নাক সেই ভাবেই ডাকছে!

‘যাই! এই ফাঁকে একটু খেলা করে আসি,’ ভেবেই তোসো উড়ে বসতে গেল সামনের ডালে।

কিন্তু তোসোর তো এখনো ডানা হয়নি। ডাঁটার মতো হয়েছে সবে। তাই দিয়ে কি ওড়া যায়? ভাসতে পারে না। ডাল থেকে ডালে পড়ে। পড়তে পড়তে ঘাড়-মুখ গুঁজে একেবারে ঘাসের মধ্যে গিয়ে পড়ল। বুকটা ধুকধুক করছে। হাঁপাচ্ছে। ঠোঁটটা হাঁ। অন্ধকার মিশে আছে ঘাসে। নতুন জায়গা। সব অচেনা। ওড়ার সুখ ভুলে গিয়ে মনটা খারাপ তোসোর। মায়ের বারণটা মনের মধ্যে বাজে। বাড়িটা কই? ওই তো মগডাল দেখা যাচ্ছে। না, মা এখনো বুঝতে পারেনি। কত উঁচু! কী করে ফেরা যায়! ‘উড়ে ফিরতে হবে, মা দেখবে—আমি উড়তে পেরেছি, উড়তে আমাকে হবেই, আমি ওড়ার জাত, ওড়ার শক্তি আমার রক্তে, আমার কিসের ভয়? মা বলেছে—আমি বড় হলে উড়তে পারব, আমাকে আজকের মধ্যেই বড় হতে হবে, অথবা ওড়া শিখতে হবে, শিখতে আমাকে হবেই!...উম্ চিকি চিকি চিকি,’ বলেই শূন্যে একটা লাফ দিল তোসো; কিন্তু ঝটপট করতে করতে কিছু দূর গিয়েই পড়ে গেল। ‘বাহ্ ! অনেকটা পেরেছি,’ আবার ‘উম চিকি চিকি চিকি’ বলে ডানা ঝাপটাল তোসো। বেশিক্ষণ ভেসে থাকতে হবে বাতাসে। তাই জোরে জোরে ডানা ঝাপটায়। ডানা না, ডানার ডাঁটা; কিন্তু পড়ে যাচ্ছে তোসো। পড় পড় করতে করতে পড়ল গিয়ে জলার মধ্যে, জলের ধারে। সেখানকার ব্যাঙটা আঁতকে উঠল। মাথা উঁচু করে বলল, ‘অ্যাই অ্যাই আর এগিয়ো না! জলে পড়ে যাবে!’

তোসো দাঁড়াতে পারছে না। জলার পাড় ঢালু। গলাটা কাদা-মাটিত ঠেকানো। ক্যা-ক্যা করে বলল, ‘আমি উড়তে শিখছি, জল দেখে ভয় পেলে কী হবে?’

‘তুমি তো পাখি, উড়তে পারবেই, এর আবার শেখার কী? সময় হলে পারবে, কিন্তু এখন উড়তে গেলে জলে পড়বে!’

‘তোমার তো কিছু হচ্ছে না! তুমি তো জলে ডুবে আছ।’

‘জল তো আমার জায়গা, তোমার তো নয়।’

ব্যাঙের কথায় তোসোর মনে নানা চিন্তা এলো।

‘আমরা উড়তে পারি, এটাই আমার মনের শক্তি, এই শক্তিই আমাকে উড়িয়ে নেবে, আমি কিন্তু অনেক দূর উড়েও এসেছি।’

‘হ্যাঁঁ, মনের শক্তি বড় জিনিস, কিন্তু তোমার পালক গজায়নি, তুমি বাসা থেকে পড়ে গেছ?’

‘না, আমি ইচ্ছা করেই পড়েছি, আমার বিশ্বাস—আমি উড়তে পারব, সেই বিশ্বাসে আমি চেষ্টা করার জন্য নেমেছি।’

তোসোর কথায় ব্যাঙের মুখে হাসি এসে যায়। এ ব্যাঙ সাধারণত হাসে না। সে মধ্য বয়সী; কিন্তু গায়ে প্রচণ্ড শক্তি। তার একটি বিশেষ ক্ষমতা আছে। সে চাঁদের সঙ্গে কথা বলতে পারে। আকাশে যখন চাঁদ থাকে, তার শক্তি দ্বিগুণ হয়। চাঁদ তার গ্রাভিটি দিয়ে তার শক্তি বাড়িয়ে দেয়। ব্যাঙ মাথা কাত করে চাঁদকে দেখে। চাঁদ বলে, ‘তোসো আমার মায়ায় মুগ্ধ হয়ে উড়তে নেমেছে, ওর কোনো দোষ নেই।’

তোসো মগডালের দিকে তাকায়। ডালটা নড়ছে। ‘মা কি জেগে গেছে? আমাকে না জানি মা কত্তো চিন্তা করছে!’ এই ভেবে ‘উম চিকি চিকি চিকি’ বলে অন্ধকারে উড়াল দিল তোসো। জলা পার হতে বেশ বাকি। গায়ের সব শক্তি ঢেলে ডানা ঝাপটাচ্ছে; কিন্তু গতি নিচের দিকে নামছে, জলের দিকে যাচ্ছে। তাই দেখে ব্যাঙ আঁতকে উঠল। ‘সর্বনাশ!...জলে পড়ে যাচ্ছে! মরে যাবে!’

আকাশের চাঁদ সঙ্গে সঙ্গে ব্যাঙকে বলল, ‘আমি সাহায্য করছি, তুমি এগিয়ে যাও! জলদি!’

তোসো জল থেকে মাত্র হাতখানেক ওপরে আছে। এক্ষুনি পড়ে যাবে। ওর ডানা ঝাপটানোর শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে জলার চারদিকের দেয়ালে। ব্যাঙ আর দেরি না করে চার হাত-পা ছুড়ে ডুবসাঁতার কেটে বিদ্যুেবগে চলে গেল তোসোর ঠিক নিচে। তারপর ডিগবাজি খাওয়ার মতো মাথাটা জলের তলায় ঘুরিয়ে পেছনের পা দুটি জলের ওপর ছুড়ে দিল তীব্র বেগে। আর তা লাগল পড়ন্ত তোসোর গায়ে। তোসো তো হালকা! ব্যাঙের ওই প্রাণ বাঁচানো ধাক্কায় তোসোর উড়তে সুবিধা হলো। চোঁ করে উঠে গেল বাবলাগাছের মগডালে। একবারে বাসার কাছে। গলা দিয়ে ডাল আঁকড়ানোর চেষ্টা করছে। সেই শব্দে মায়ের ঘুম গেল ভেঙে। মা খপ করে ঘাড় ধরে টেনে নিল পেখমের নিচে।

‘নড়েচড়ে আবার বাইরে গেছ তুমি! পড়ে গেলে সাপখোপে খেয়ে ফেলবে!’ ঘুম ঘুম চোখে রেগে বলল মা। তোসো বলল, ‘সাপখোপে খাবে কী মা, আমি তো উড়তে শিখেছি!’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা