kalerkantho

বুধবার । ৬ ফাল্গুন ১৪২৬ । ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৪ জমাদিউস সানি ১৪৪১

ভূতের সংজ্ঞা

ধ্রুব নীল

১৭ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ভূতের সংজ্ঞা

অঙ্কন : মাসুম

‘ওঁ স্যাঁর, চাঁদের আঁলো কঁত মজা। কিন্তু সূঁর্যের আঁলো গিঁলতে পাঁরি না কেঁন? সূঁর্যের আঁলোর ওঁজন বেঁশি?’

‘চোপ! নাঁকি নাঁকি সুরে কথা বললে নাঁ... ক কেঁটে দেঁব!’

‘খিঁক খিঁক... স্যাঁর... আঁপনি নিঁজেও... খিঁক খিঁক।’

শূন্যে একপাক গোত্তা খেয়ে আবার নিজের চেয়ারে বসে পড়লেন নেপাল চন্দ্র নাথ। মাথা নামিয়ে দিলেন টেবিলে।

শালিকপাড়া গ্রামের গোরস্তানের পাশে বাঁশঝাড় মাধ্যমিক বিদ্যালয়। সেখানে বিজ্ঞান পড়ান। পড়াতে এসে বেচারার অবস্থা খারাপ। মানুষ থাকতে ছিলেন বিজ্ঞানের শিক্ষক। ভূত-প্রেতে মোটেও বিশ্বাস করতেন না। মরে গিয়ে পড়েছেন বিপদে। হয়ে গেলেন ভূত। নিজেকে চাইলেও অবিশ্বাস করতে পারছেন না। সারা দিন মনে একটাই প্রশ্ন, ভূত কাকে বলে? ভূত কী দিয়ে গঠিত? ভূতের ভবিষ্যৎ কী?

‘স্যাঁর কিঁ আঁবার ঘুঁমিয়ে পঁড়লেন? ভূঁতুড়ে পঁরমাণুর গঁঠন তঁবে পঁড়াবেন না?’

একবার মাথা তুলে তাকালেন নেপাল চন্দ্র। আবার টেবিলে রাখলেন। মরে যাওয়ার পর প্রথম কয়েক বছর শুধু ভূতের সংজ্ঞা খুঁজে বেড়িয়েছেন। পাননি। এরপর চালু করেন স্কুল। ভূতদের মধ্যে যদি কেউ বড় হয়ে বড় বিজ্ঞানী হয়ে যায়, তবে সে হয়তো একদিন সংজ্ঞা বের করতে পারবে।

কিন্তু ভূতের ছানাগুলো বড্ড বেয়াড়া হয়ে যাচ্ছে দিন দিন। রসায়নের ল্যাবে সেদিন আরশোলার কঙ্কাল আর দুই ফোঁটা ফড়িংয়ের ডানার বাতাস মিশিয়ে বানিয়ে ফেলল হাসানো গ্যাস। গ্যাস ছড়িয়ে পড়ল গোটা ভূতপাড়ায়। ভূতদের সে কী হাসি! গোটা গ্রামে ভূতদের কথা জেনে যায় মানুষেরা। এতে কাজও হয়েছে। কেউ এখন সহজে গোরস্তানের কাছে ঘেঁষে না।

ক্লাস ছুটি দিয়ে নেপাল চন্দ্র চলে গেলেন নদীর পারের বাজারে। মধ্যরাতে সেখানে জেলেরা নৌকা ভেড়ায়। কেউ আসে মাছের দরদাম করতে। মানুষের বেশ ধরে চায়ের দোকান খুঁজতে লাগলেন নেপাল চন্দ্র। পেয়েও গেলেন। দোকানে তুমুল আড্ডা চলছিল। আলোচনার বিষয় যথারীতি ভূত।

‘মতিন ভাই! ভুলেও আর গোরস্তানের পথ ধরবা না! ও মাগো ভূতের দল যে হাসাহাসিটা করল!’

‘আমার গলায় মরিচ বাবার তাবিজ আছে। ভূতের বাপও কিছু করতে পারবে না।’

‘আমি শুনছি রসুনের মালা বানাইয়া পকেটে রাখলে নাকি...।’

‘তাই নাকি! আমার তো প্রতিদিন ওই পথ দিয়া বাড়ি যাইতে হয়। দরকার পড়লে রসুনের বস্তা নিয়া যাব।’

‘আচ্ছা, ভূত কাকে বলে জানেন কেউ?’

নেপাল চন্দ্রের বিনীত স্বরের প্রশ্ন শুনে সবাই হকচকিয়ে গেল। একজন বলল, ‘ওরা হইল বাতাস।’

‘আরে না, না! ভূত হইল আগুন। চোখে দেখা যায় না।’

গলায় মরিচ বাবার তাবিজ ঝোলানো মতিন বলল, ‘বাতাসও না, আগুনও না। কাউয়ার হাড্ডি আর মরা শকুনের গু মিশাইলে ভূত হয়। মানুষ মইরা ভূত হয় এটা ঠিক না।’

কাকের হাড় আর শকুনের বিষ্ঠার কথা শুনে নেপাল চন্দ্রের মেজাজ ভয়াবহ বিগড়ে গেল। তাঁর ইচ্ছা হলো মতিন ব্যাটাকে শূন্যে তুলে ছেড়ে দেন। চায়ের কাপ ফেরত দিয়ে দোকানিকে বললেন, ‘তোমার কাছে রসুন আর ওই মরিচ তাবিজ আছে?’

‘এই লন।’

নেপাল চন্দ্র একটা রসুন শক্ত করে চেপে চোখ বুজে দাঁড়িয়ে থাকলেন। কিছুই অনুভব করলেন না। ‘এই নাও! এর কোনো ক্ষমতাই নাই। যত্তসব ফালতু কথা।’

‘আরে না, না! এই মহাবিশ্বে কিছুই নহে ফালতু।’

ভ্রু কুঁচকে নেপাল চন্দ্র তাকালেন নতুন বক্তার দিকে। বুড়ো লোকটা কোন ফাঁকে এসে বসেছে টেরই পাননি। ঠোঁটের নিচে পুরু গোঁফ। হাসিটা শিশুদের মতো।

‘মশাইয়ের পরিচয়।’

‘আমি ভিনদেশি লোক বাপু। অনেক দিন হলো এই দেশে পড়ে আছি। থাকি পাশের বনপাড়া গ্রামে। গ্রামটার মায়া কাটাতে পারছি না। তা, লোকজন আমাকে আনু ভাই ডাকে। আপনি তো নেপাল চন্দ্র? স্কুলে বিজ্ঞান পড়ান?’

চমকে উঠলেন নেপাল চন্দ্র নাথ। তার পরিচয় এই বুড়ো আগন্তুকের জানার কথা নয়। ঢোক গিলে পাশের একটা টুলে বসলেন। পাঞ্জাবি আর লুঙ্গি পরা বুড়ো লোকটাকে চেনা চেনা মনে হচ্ছে। তার চেয়েও বড় কথা, লোকটা জানে তিনি ভূত। জেনেও চুপচাপ। ভয় পাচ্ছে না। বুড়ো লোকটাও ভূত?

‘আপনার কথা শুনেছি। আপনি নাকি ভূতের সংজ্ঞা খুঁজে বেড়াচ্ছেন?’ কৌতুকের স্বরে বললেন বুড়ো আনু।

‘ঠিক শুনেছেন।’

‘আমিও খুঁজতাম একসময়। এখন খোঁজাখুঁজি বাদ। কারণ ভূত হলো কাকের হাড় আর শকুনের ইয়ে...। হা হা হা।’

সঙ্গী পেয়ে খুশি মতিন মিয়া।

‘ঠিক কইসেন আনু ভাই। ভূতরে ডরানোর কিসু নাই। ভূত মানে হইল পুরনো জিনিস, অতীত।’

কথাটা পছন্দ হলো না নেপাল চন্দ্রের। ‘ভূত কী দিয়ে তৈরি তা জানেন? আজগুবি সব কথাবার্তা!’

উত্তর দিলেন আনু নামের বুড়ো লোকটা।

‘মানুষ কী দিয়ে তৈরি সেটাও তো কেউ জানে না। যদি বলো ভাই, মানুষ মানে কার্বন, হাইড্রোজেন, নাইট্রোজেন—এসব দিয়ে তৈরি, তা মানতে রাজি না বাপু।’

‘মানুষ কে বা আর ভূতই কে বা। সবই এক।’ কথাটা বললেন আরেক বুড়ো। তিনি নিজেও মানুষ। ঝিম মেরে নদীর দিকে তাকিয়ে আছেন।

নেপাল চন্দ্র ভ্রু আরো কুঁচকে বুড়োর দিকে তাকালেন।

‘আপনাকে চেনা চেনা লাগে।’

লোকটা উত্তর না দিয়ে হাসল। এবার হাসি দেখেই চিনে ফেললেন নেপাল চন্দ্র। মুহূর্তে মেজাজ হয়ে গেল ফুরফুরে। ছুটে এসে দুই হাত চেপে বললেন, ‘স্যার আপনি! বাংলা শিখলেন কবে!’

‘আরে! আমি তো সেই কবে এসেছি। হাতেও অফুরন্ত সময়। এর মাঝে কত কী যে শিখলাম!’

‘স্যার ব্ল্যাকহোল নিয়ে কিছু বলুন। মহাকাশ নিয়ে আপনার লেকচার শুনতে চাই। সবাইকে শোনান।’

অন্যরা এবার একটু সন্দেহের চোখে তাকাল বুড়োর দিকে।

‘আরে! এসব নিয়ে গবেষণা এখন বন্ধ। গতকাল শিখেছি ভাপা পিঠা বানানোর রেসিপি। চাইলে ওটা শেখাতে পারি।’

দুজনের দিকে হা করে তাকিয়ে আছে আড্ডার মানুষ সদস্যরা। এর মধ্যে বেশি হা করে আছে মতিন নামের লোকটা।

‘তা উনার পরিচয় কী? আনু ভাই বড় শিল্পী? নাটক করেন?’

নেপাল চন্দ্রের মুখে ক্রূর হাসি খেলে গেল। ক্রূর হাসি মানে ভিলেন টাইপ হাসি। এ হাসি দেখেও মতিনের ভাবান্তর নেই।

‘আপনি তো ভূতকে ভয় পান না, তাই না? ভূত মানে অতীত, পুরনো জিনিস?’

‘হ, ঠিকই তো!’

‘হুমমম। তাহলে উনাকে দেখেও ভয় পাওয়ার কথা না। ঠিক বলেছি না স্যার!’

বুড়ো আনু খিলখিল করে হাসলেন। হাসির দমকে খানিকটা শূন্যেও ভেসে গেলেন। বাকিরা চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। কেউ চুল পরিমাণ নড়তে পারছে না। নেপাল চন্দ্রও উৎসাহ পেয়ে শূন্যে ভেসে ভৌতিক হলদে আলো ছড়ালেন কিছুক্ষণ। গমগম করে বললেন, ‘হাঁদারামের দল। এসব রসুন আর মরিচের কবজে কিসসু হবে না। ভূতের ভয় কাটাতে হলে বিজ্ঞান পড়া চাই। কারণ বিজ্ঞানই বলতে পারবে ভূতের সংজ্ঞা। আর বিজ্ঞান শিখতে হলে ভূতের কাছেই যেতে হবে। কারণ মহাবিজ্ঞানী আইনস্টাইন তো তোদের সামনেই বসা! উ হা হা হা!’

বুড়ো আনু ওরফে আইনস্টাইন খানিকটা বিব্রত হয়ে ভয়ে কাঁপতে থাকা মানুষগুলোকে বললেন, ‘ইয়ে, ভাইসব। ভয় পাবেন না। ভয় পেলে ভূতকে বুঝতে পারবেন না। ভূত হলো অঙ্কের মতো। ভয় পেয়েছেন তো ফেইল করেছেন।’

‘স্যার, আপনার হাতে বেহালা শুনতে মন চাইছে খুব। এমন গভীর রাতে বাংলার নদীর তীরে মহাবিজ্ঞানী আইনস্টাইন বেহালা বাজাবেন, আহা! ভাবতেই শরীরটা আরো বায়বীয় হয়ে যাচ্ছে।’

মহাবিজ্ঞানী আইনস্টাইন শূন্যে তুড়ি বাজাতেই বেহালা হাজির। মতিন লোকটা কয়েকবার চিঁ চিঁ করে বলল, ‘আমি কালকাই ভূতের সংজ্ঞা মুখস্থ কইরা আসব স্যার! আমারে ছাইড়া দ্যান স্যার!’ কিন্তু বেহালার সুর যতক্ষণ শোনা গেল, ততক্ষণ দোকানে বসা লোকগুলো একচুলও নড়তে পারল না।

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা