kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৮ জানুয়ারি ২০২০। ১৪ মাঘ ১৪২৬। ২ জমাদিউস সানি ১৪৪১     

মুরগি লাগে গা আণ্ডা লাগে গা

১৯৭১ সালে অনেক শিশু ছিল, যারা ছদ্মবেশ ধারণ করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ক্যাম্পে গিয়ে তাদের ভেতরের খবর মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছে। এমনই দুজনের সাহসের গল্প শোনাচ্ছেন ফখরে আলম

১৩ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ক্লাস সিক্সের ছাত্র আবুল কালাম আজাদ। বয়স ১১ বছর। বাবার নাম মৌলভি মকবুল আহমেদ। গ্রাম নিয়ামতপুর, থানা চৌগাছা, যশোর। একাত্তরে আজাদ শত্রুঘাঁটির সংবাদ পৌঁছে দিয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে। এ জন্য সে মুরগি নিয়ে হাজির হতো হানাদারদের ঘাঁটিতে। গ্রামের হাফপ্যান্ট পরা উদোম শরীরের এই শিশু মুরগির ডিম বিক্রির ছদ্মবেশে ‘রেকি’ করে বেড়াত। জেনে নিত কোথায় বাংকার। কোথায় শত্রুর অস্ত্র লুকানো রয়েছে। যখন গুরুত্বপূর্ণ কোনো খবর পেত সঙ্গে সঙ্গে জানিয়ে দিত মুক্তিযোদ্ধাদের। তারই তথ্যের ভিত্তিতে মুক্তিযোদ্ধারা অভিযান চালিয়ে শত্রু খতম করতেন। দখল করে নিতেন একের পর এক শত্রু ঘাঁটি।

চৌগাছার ডাকবাংলোয় ছিল পাকিস্তানি সৈন্যদের ক্যাম্প। এই ক্যাম্পে বাংকার করে সৈন্যরা মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাত। আজাদ মুরগি নিয়ে এই ক্যাম্পে হাজির হয়ে ‘মুরগি লাগে গা, আণ্ডা লাগে গা’ বলে এগিয়ে যায় পাঞ্জাবি মেজরের কাছে। সস্তায় মুরগি বিক্রি করে। কায়দা করে দেখে ফেলে শত্রুর ঘাঁটির ভেতরের দৃশ্য। তারপর চৌগাছা সীমান্তবর্তী বয়রা ক্যাম্পে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের জানায় সব কিছু। সাব-সেক্টর কমান্ডার মেজর হুদাকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়ে সহায়তা করে। এই আজাদের ইনফরমেশনের ভিত্তিতে অক্টোবর মাসে মুক্তিযোদ্ধারা ব্যাংদা, বয়রা থেকে চৌগাছার ডাকবাংলো শত্রু ঘাঁটিতে শেল মারে ও ঘাঁটিটি দখল করে নেয়। একদিন আজাদ খবর পায়, হানাদার বাহিনী গাড়িতে করে চৌগাছা থেকে মাশিলা ক্যাম্পে যাবে। সে এই রাস্তার দীঘলসিংহ গ্রামে রেকি করে। সকাল ১০-১১টার দিকে তার খবরের ওপর নির্ভর করে মুক্তিযোদ্ধারা রাস্তার পাশে জঙ্গলে অ্যাম্বুশ করে বসে থাকেন। শত্রু এলেই গুলি ছোড়েন। শুরু হয় দুই দলের মধ্যে তুমুল সংঘর্ষ। আজাদও এই অভিযানে মুক্তিযোদ্ধা বাতেনের সঙ্গে ছিল। এই যুদ্ধে কয়েকজন খানসেনা নিহত হয়। শহীদ হন ফরিদপুরের মুক্তিযোদ্ধা আবু তাহের।

 

নূরুজ্জামানের বয়স ছিল তখন ১০ বছর। ক্লাস ফোরে পড়ত। যশোরের চৌগাছা থানার দীঘলসিংহ গ্রামে বাড়ি। বাবা আনসার আলী ছিলেন দরিদ্র কৃষক। স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে নূরুজ্জামান বললেন, ‘যুদ্ধের সময় পাঞ্জাবিরা চৌগাছার ব্রিজ ঠিক করার জন্য আমাদের গ্রাম থেকে লোক নিয়ে আসত। আর এই লোক আনার কাজে সহায়তা করত গ্রামের সরজেদ দফাদার। সে ছিল পাকিস্তানিদের দালাল। আমার বাবাকে সারা দিন কাজ করিয়ে কোনো খাবার কিংবা পয়সা দিত না। এ জন্য আমি একদিন সরজেদ দফাদারকে গালি দিই। বাবা-চাচারা এতে ভয় পেয়ে যান। বলেন, সরজেদ তোকে মিলিটারির হাতে তুলে দেবে। আমিও খুব ভয় পাই। কী করি, কী করি! একপর্যায়ে ক্ষেত থেকে ছয় সের মরিচ তুলে বয়রা বাজারে ১০ টাকায় বিক্রি করি। সেই টাকা নিয়ে হেঁটে ভারতের বনগাঁ চলে যাই। দেখি বনগাঁয় অনেক লোক। পিটি প্যারেড করছে। কেউ কেউ ট্রাকে করে কল্যাণী চলে যাচ্ছে। আমিও ট্রাকে লাফিয়ে উঠি। অনেকের সঙ্গে কল্যাণী চলে যাই। ৮-১০ দিন পর আবার একইভাবে ট্রাকে করে বনগাঁ আসি। বনগাঁ থেকে এক মুক্তিযোদ্ধা বাঙালি হাবিলদার আমাকে বয়রা ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেন। এই ক্যাম্পের মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার নূর হোসেনের বাড়ি চৌগাছা থানা এলাকায়। তিনি আমার বাড়ি চৌগাছা জেনে বয়রা ক্যাম্পে থাকার ব্যবস্থা করেন। ছোট বলে অনেকে আমাকে আদর করেন। এখানেই ক্যাপ্টেন হুদার সঙ্গে পরিচয় হয়। তিনিও আমাকে খুব আদর করতেন। একদিন কমান্ডার নূর হোসেন ২০-২৫ জন মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে অপারেশনে বের হন। আমি পথ ক্লিয়ারের সিগনাল দিয়ে তাঁদের নিয়ে আসি ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ থানার হাসনহাটি এলাকায়। ৮-১০ দিন জঙ্গলে জঙ্গলে তাঁদের সঙ্গে রাত কাটাই। পরে আবার বয়রা ক্যাম্পে ফিরে আসি। এখানেই আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হয় মুক্তিযোদ্ধাদের পথ চিনিয়ে নিয়ে যেতে হবে। এই দায়িত্ব পাওয়ার পর আমি প্রায় ১০০ জনের একটি দল নিয়ে ক্যাম্প থেকে যাত্রা করে তাঁদের পথ চিনিয়ে সীমান্ত পার হয়ে কাবিলপুর, গরীবপুর, নলডাঙ্গা বাঁওড় হয়ে হাসনহাটি পৌঁছে দিই। অন্য আরেকজন এই দলকে যশোরের খাজুরা এলাকায় পৌঁছে দেয়। এরপর কমান্ডার নূর হোসেন আমাকে খানসেনাদের ঘাঁটির খবর আনার দায়িত্ব দেন। একদিন চৌগাছার হাকিমপুর হাই স্কুলের কাছে এসে দেখি রাজাকাররা পাহারা দিচ্ছে। অন্য ভাষায় স্কুলের ভেতর কারা যেন কথা বলছে। আমি বুঝতে পারি তারা পাঞ্জাবি। সঙ্গে সঙ্গে ধোপাদী গ্রামে এসে মুক্তিযোদ্ধাদের খবর দিই। সেদিনই বিকেলে মুক্তিযোদ্ধারা অভিযান চালান। আমিও তাঁদের সঙ্গে ছিলাম। কী গুলি! বৃষ্টির মতো। আমার পাশে এলএমজিম্যান কালীগঞ্জের চোমপাড়ার মোজাহার ভাই। তিনি ক্রলিং করে এগোচ্ছেন—আর শত্রুদের উদ্দেশে গুলি ছুড়ছেন। কিন্তু একটা গুলি তাঁর বুকে লাগে। রক্ত, শুধু রক্ত। কোনোভাবেই রক্ত বন্ধ হচ্ছে না। অন্য মুক্তিযোদ্ধারা গামছা দিয়ে বুক বাঁধেন। আমি মোজাহার ভাইকে নিয়ে পাশের বাড়ি আশ্রয় নিই। পরে তিনি মারা যান। সে দৃশ্য আমার চোখের সামনে এখনো ভাসে।

যুদ্ধের সময় নূরুজ্জামানকে বয়রা ক্যাম্প থেকে প্রতি মাসে ৬০ টাকা ভাতা দেওয়া হতো। স্বাধীনতার পর যশোর সার্কিট হাউসে মেজর হুদা তাকে একটি সার্টিফিকেট দিয়েছিলেন। কিন্তু সেটি হারিয়ে গেছে। নূরুজ্জামানের মনে এ জন্য কোনো কষ্ট নেই। তিনি মনে করেন, স্বাধীনতার জন্য যা করেছেন তা নিজের বিবেক থেকেই করেছেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা