kalerkantho

সোমবার। ২৭ জানুয়ারি ২০২০। ১৩ মাঘ ১৪২৬। ৩০ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

কেমি ঘড়ি

আলিফ আজমাইন, চুয়াডাঙ্গা ভিজে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়

১৩ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



কেমি ঘড়ি

অঙ্কন : মাসুম

আমার খালু অ্যাডভোকেট শাহজাহান আলী ১৯৭১ সালে এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন। যেমন আমিও এবার এসএসসি পরীক্ষা দেব।

খালুর গ্রামের বাড়ি চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার আমিরপুর গ্রামে। গ্রামের পাশ দিয়ে চলে গেছে রেললাইন। গ্রাম পেরিয়ে একটু হেঁটে গেলেই মোমিনপুর রেলস্টেশন। খালু সেই বয়সে রেললাইনের পাশে খেলা করতেন, ঘুরে বেড়াতেন।

খালুর কাছে শুনেছি, ছোটবেলা থেকেই খালু ছিলেন বেশ শৌখিন। যা পছন্দ হতো, তাঁর বাবার কাছে বায়না ধরে কিনে নিতেন। খালুর বাবা ছিলেন এলাকার বেশ নামকরা ব্যবসায়ী। এভাবেই খালুর হাতে এসেছিল একটি কেমি ঘড়ি। তখন কেমি ঘড়ি বেশ দামি ঘড়ি। ঘড়িটি খালুর খুবই পছন্দের। খালু ঘড়ি হাতে দিয়ে ঘুরে বেড়ান। বন্ধুদের দেখান।

তত দিনে গ্রামে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এসেছে। কিছু রাজাকারও একত্র হয়েছে। রাজাকাররা ছিল দেশ স্বাধীনের বিপক্ষে। যা ইচ্ছা তা-ই করত তারা। ভয়ে কেউ কিছু বলার সাহস পেত না।

মোমিনপুর স্টেশনের কাছে ছিল রাজাকারদের ক্যাম্প। এক বিকেলে খালু কেমি ঘড়ি হাতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এ সময় এলাকার রাজাকার কমান্ডার মাওলানা জাফর আলী খালুকে ইশারায় কাছে ডাকে। হাতে থাকা কেমি ঘড়িটা খালুর হাত থেকে জোর করে খুলে নেয় সে। রাজাকার কমান্ডার ঘড়িটি নিজের হাতে বেঁধে চলে যায়। এ ঘটনায় খালুর খুবই মন খারাপ হয়।

খালুর ভাই লিয়াকত আলী ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার। তিনি ওই সময় এলাকায় ছিলেন না। ছিলেন ভারতে। খালুর ধারণা, ভাই মুক্তিযোদ্ধা হওয়ায় রাজাকার কমান্ডার তাঁর শখের ঘড়িটা কেড়ে নেয়।

কয়েক দিন পর এক বিকেলে খালু বাড়ির সামনের রাস্তায় হাঁটছেন। এ সময় হাফপ্যান্ট পরা ১০-১২ জন মুক্তিযোদ্ধা গ্রামে আসেন। তাঁরা এলাকারই। খালুর বড় ভাইয়ের মতো। কেউ কেউ খালুর মুক্তিযোদ্ধা ভাইয়ের বন্ধু। ওই দলে ছিলেন খেজুরতলা গ্রামের মোয়াজ্জেম আলী, সাহেব আলী, চুয়াডাঙ্গার দুলাল হোসেন এবং আরো কয়েকজন। এক মুক্তিযোদ্ধা খালুকে কাছে ডেকে বলেন, তোমাকে একটা কাজ করতে হবে।

কী কাজ? খালু জানতে চান।

তোমাকে রেকি করতে হবে। ওই মুক্তিযোদ্ধা বলেন।

খালু জানতেন না রেকি কাকে বলে। তিনি প্রশ্ন করেন, রেকি কী?

সেই মুক্তিযোদ্ধা এবার বলেন, স্টেশনের পাশে রাজাকারদের ক্যাম্প আছে। তুমি জানো?

জানি।

ওখানে যেতে হবে। রাজাকাররা কী করছে, তা

দেখে এসে আমাদের জানাতে হবে। এই কাজকেই রেকি বলে।

খালু রাজি হয়ে যান। তখনই এক দৌড়ে চলে যান স্টেশনের কাছে, রাজাকারদের ক্যাম্পের দিকে। চুপি চুপি উঁকি দিয়ে দেখেন কয়েকজন রাজাকার এক জায়গায় গোল হয়ে বসে গল্প করছে। ঘড়ি নিয়েছিল যে রাজাকার কমান্ডার সে-ও আছে। রাজাকাররা তাদের রাইফেল পাশে একটি গাছের নিচে রেখে দিয়েছে। দেখে খালু দৌড়াতে দৌড়াতে চলে আসেন মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে। সব খুলে বলেন তাঁদের। খালুর কেমি ঘড়ির ঘটনাটাও খালু বলেন মুক্তিযোদ্ধাদের। শোনার পর আর দেরি করেননি মুক্তিযোদ্ধারা। দ্রুত তাঁরা রাজাকারদের ক্যাম্পে গিয়ে কোনো রকম যুদ্ধ ছাড়াই আটক করেন সব

রাজাকারকে।

পরদিন বিকেলে খালু আবারও স্টেশনের পাশে ঘুরছেন। এ সময় অপরিচিত এক লোককে দেখা গেল রেললাইনের ওপর দিয়ে হেঁটে খালুর দিকেই আসছেন। খালু একটু ভয় পান। দেখেন লোকটি মাঝেমধ্যে খালুর দিকে তাকাচ্ছেন এবং দ্রুতপায়ে হাঁটছেন। খালু রেললাইনের ওপর থেকে নেমে গ্রামের দিকে হাঁটা শুরু করেন। কিন্তু লোকটি খুবই দ্রুত খালুর কাছে এসে প্রশ্ন করেন, তোমার নাম কি শাহজাহান?

ভয়ে ভয়ে খালু হ্যাঁ বলেন।

লোকটি তখন প্যান্টের পকেট থেকে সেই কেমি ঘড়িটি বের করে খালুর হাতে দিয়ে বলেন, এই নাও তোমার ঘড়ি। মুক্তিযোদ্ধারা তোমার কাছে পৌঁছে দিতে বলেছেন।

ঘড়ি ফিরে পাওয়ার আনন্দে খালুর দুই চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। হাত দিয়ে চোখ মুছে খালু লোকটির হাত থেকে ঘড়িটি নেন। লোকটি আর এক মুহূর্তও সেখানে থাকেননি। যেভাবে দ্রুতপায়ে এসেছিলেন সেভাবেই আবার ফিরে যান দ্রুত। খালু পরে জেনেছিলেন, ঘড়ি ফেরত দিতে যিনি এসেছিলেন তিনিও ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা।

এ ঘটনা খালুর কাছে অনেকবার শুনেছি। ঘটনাটি খালু যখন বলেন তিনি বেশ গর্ববোধ করেন এবং একাধিকবার ‘রেকি’ শব্দটি উচ্চারণ করেন। খালু বলেন, ‘জীবনে যদি কোনো ভালো কাজ আমি করে থাকি, তাহলে সেটা মুক্তিযুদ্ধের সময় ‘রেকি’ করার ঘটনাটিই।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা