kalerkantho

সোমবার। ২৭ জানুয়ারি ২০২০। ১৩ মাঘ ১৪২৬। ৩০ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

আমার একটা বনবিড়াল আছে

ফাইরুজ পাঠান মৌনতা

৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আমার একটা বনবিড়াল আছে

অঙ্কন : মাসুম

নদীর ধারে চর। আর চরের পাশেই আমাদের বাড়ি। সন্ধ্যা হলেই চর থেকে ভেসে আসে শিয়ালের হুক্কাহুয়া ডাক। আমি ভয়ে বাবাকে জাপটে ধরি। তখন বাবা বলে, ‘ভয় নেই। শিয়ালের দল গর্ত থেকে বেরিয়ে এসেছে খাবারের সন্ধানে। ক্ষুধায় ডাকাডাকি করছে।’ শুধু কি শিয়াল! কাঠবিড়ালি, গুইসাপ, বেজিসহ আরো কত বন্য প্রাণী আমাদের বাড়ির আশপাশে ঘুরে বেড়ায়! বাবা আমাকে তাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। আমার বাড়ি নরসিংদীর চিরসিন্দুরে। ওখানকার ন্যাশনাল কিন্ডারগার্টেনে পড়ি।

কয়েক মাস আগে মা-বাবা আমাকে সঙ্গে নিয়ে গ্রামের এক আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলেন। বাড়ি ফিরতে ফিরতে বেশ রাত। গেট দিয়ে ঢুকতেই দেখলাম, বিড়ালের মতো কিন্তু বেশ বড় একটা প্রাণী আমাদের উঠানে বসে আছে। মনে হলো ছোটখাটো একটা বাঘ। বারান্দায় একটা বাতি আছে। ওটার আলোয় দেখলাম এর শরীর ধূসর। ভয়ে ভয়ে বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ওটা কী?’ ওই সময়ই জন্তুটা লাফ দিয়ে উঠানের ডান পাশের অন্ধকারে হারিয়ে গেল। বাবা বলল, ‘এটা বনবিড়াল। মনে হয় এদিকে নতুন এসেছে, মোরগগুলো সাবধানে রাখতে হবে। এরা গ্রামীণ বনের তুখোড় শিকারি। মোরগ দেখলেই ঝাঁপিয়ে পড়ে।’ চিন্তায় পড়লাম। মোরগগুলো আমার অনেক প্রিয়। তার পর থেকে প্রায়ই সন্ধ্যা কিংবা রাতে বাড়ির বিভিন্ন জায়গায় বনবিড়ালটাকে দেখা যেতে লাগল। ওকে এখন ভালোই লাগে আমার। ওর নাম দিলাম সনু। বাবা যখনই ওকে দেখেন, আমাকেও দেখানোর চেষ্টা করেন। এর মধ্যে একদিন দুপুরে খুব ঝড়-বৃষ্টি হলো। তবে বিকেলটা ছিল আলোয় ভরা। একটু পর হঠাৎ বাবা আমাকে ডাক দিল, ‘দেখে যাও, সনু বসে আছে।’ আমি দৌড়ে তার পাশে যেতেই দেখতে পেলাম, বাড়ির নিচের সবুজ ধানক্ষেতের আলে বসে আছে সনু। রোদ পড়ে ঝকমক করছে ওর শরীরটা। বাবা বললেন, ‘বনবিড়ালরা শেষ বিকেলে আর শেষ রাতে শিকারের জন্য চঞ্চল হয়ে ওঠে। তোমার সনু এখন শিকারে বেরিয়েছে।’

কয়েক দিন পরের কথা। সন্ধ্যার পর মা-বাবার সঙ্গে বসে টেলিভিশন দেখছি। তখনই মোরগের চিৎকার শুনে বাবা টর্চ হাতে বের হয়ে গেলেন। তাঁর ডাকে আমি আর মা বের হলাম। দেখলাম, পশ্চিমের ঘরের পাশে বাবার টর্চের আলোর নিচে আটটা মুরগির বাচ্চা দেখা যাচ্ছে। কিছুদিন আগে মা মুরগি বাচ্চা দিয়েছে। বাচ্চাদের নিয়ে বাড়ির উঠানের চারদিকে হেঁটে বেড়াত। বাবা বলল, ‘তোমার সনুর কাজ। মুরগিটা ধরে নিয়ে গেছে। বাচ্চাগুলো এখনো বুঝতে পারেনি মাকে নিয়ে গেছে।’ বাবাকে বললাম, ‘বাবা, তুমি সনুকে শাস্তি দাও।’ বাবা বললেন, ‘সনুর কোনো দোষ নেই। ও শিকারি। শিকারি সুযোগ পেলে শিকার করবেই। দোষ আমাদের। সন্ধ্যার সময় খোঁজ করে মুরগিটা টংঘরে রাখা উচিত ছিল।’ বাবার কথা বুঝতে পারলেও আমার রাগ বাড়ছিল। মাহারা এই বাচ্চাগুলোর কী হবে? বাবা যত্ন করে বাচ্চাগুলোকে টংঘরে খড়ের ওপর রাখলেন।

এর পরও বেশ কয়েক দিন সনুর ওপর আমার অনেক রাগ ছিল। দুষ্টু সনু, তুই কেন বাচ্চাগুলোকে মাহারা করলি! এতই যদি তোর শখ হবে তো মাঠ থেকে একটা ইঁদুর বা ঝোপ থেকে একটা পাখি ধরে খেতি। তবে এখন আস্তে আস্তে রাগটা চলে গিয়েছে। ওর মতো আর কয়েকটা বনবিড়ালও মাঝেমধ্যে বাড়ির আশপাশে আসে। ওরাও আমার কাছে সনু। বাবা বলেছেন, সনু রাতে শিকার করে, দিনে সম্ভবত আমাদের লাকড়ি রাখার পরিত্যক্ত কুঁড়েটায় ঘুমোয়। ইদানীং সনুর আরেকটা অভ্যাস হয়েছে। বাড়িতে কয়েকটা বিড়াল আছে। ওদের খাবার দেওয়া হয়। হঠাৎই সনু হাজির হয়ে বিড়ালগুলোকে ভাগিয়ে ওদের খাবার খেয়ে ফেলে। সনি তুই খুব দুষ্টু।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা