kalerkantho

সোমবার। ২৭ জানুয়ারি ২০২০। ১৩ মাঘ ১৪২৬। ৩০ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

হাতি আছে বিপদে

পৃথিবীর যে অল্প কয়টি দেশে বন্য হাতি আছে, বাংলাদেশ এর একটি। কিন্তু বেচারারা আছে বিপদে। হাতির বিপদের কারণসহ হাতির নানা বিচিত্র বিষয় নিয়ে লিখেছেন ইশতিয়াক হাসান

৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



হাতি আছে বিপদে

মা হাতি ও বাচ্চা হাতির ছবিটি তোলা হয়েছে কক্সবাজারের টেকনাফের পাহাড়ি অরণ্য থেকে। তুলেছেন মনিরুল খান

ছোট্ট এক হাতি

কয়েক বছর আগের কথা। রাঙামাটির রাঙ্গিপাড়া নামের এক জায়গায় গিয়েছিলাম হাতি দেখতে। সেখানে আটটি হাতির একটা পালের একেবারে কাছে চলে গিয়েছিলাম একদিন। এদের মধ্যে দুটি ছিল বাচ্চা। ওই দিন ওরা কিন্তু আমাকে কিচ্ছু করেনি। উল্টো একবার শুঁড় তুলে স্যালুটের মতো দিয়েছিল। কিন্তু পরের দিন গিয়ে দেখি শুধু একটা মা হাতি আর বাচ্চা হাতি একটা সেগুন বনে আটকে আছে। অন্যগুলো রাতেই সরে পড়েছে। মা হাতিটি কিন্তু অনেক খেপে ছিল সেদিন। বেচারি আসলে ছিল খুব দুশ্চিন্তায়। বাচ্চাটির যদি কিছু হয়ে যায়। ওটার ক্ষতি হবে ভেবে একপর্যায়ে আমাদের এমন তাড়া করে যে কোনোমতে পালিয়ে বাঁচি। বাচ্চা হাতিটির খুব আদুরে চেহারা ছিল। পরে দেখলাম, এই পাহাড় থেকে একটি ছড়া পেরিয়ে আরেকটি পাহাড়ের দিকে যাচ্ছে মা আর বাচ্চা হাতি। এখনো মাঝেমধ্যে ভাবি, ওই হাতির বাচ্চাটি এখন কেমন আছে? বন্য হাতি আর হাতির বাচ্চারা যে ভালো নেই।

 

হাতিদের বিপদ

বলতেই পারো, এত্ত বড় প্রাণী হাতি। ওদের আর বিপদ কী? হাতি অনেক বড় প্রাণী হওয়ায় ওদের অনেক বড় এলাকা নিয়ে ঘোরাফেরা করে খাবার জোগাড় করতে হয়। একসময় বাংলাদেশে বন বেশি ছিল, তেমনি বনে হাতিদের খাবারও ছিল অনেক। কিন্তু হাতি যেসব জঙ্গলে থাকত, তার অনেকটাই কাটা পড়েছে। ফলে হাতিদের খাবারের দারুণ অভাব পড়েছে। হাতিরা মাঝেমধ্যেই মানুষের ফসলের ক্ষেতে হানা দিয়ে খেয়ে নিচ্ছে, নষ্ট করছে। এতেই বাধছে লড়াই। হাতিও মারা যাচ্ছে, মারা যাচ্ছে মানুষও। আবার হাতি যে পথে চলাচল করে, তার মাঝে মাঝে স্থাপনা তৈরি করেছে মানুষ। হাতি চলার সময় পথের ওপর এ ধরনের বাধা পেলে তছনছ করছে প্রায়ই। মানুষ হাতির উপদ্রব থেকে বাঁচতে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয় এমন বেড়াও দিচ্ছে কোথাও কোথাও। এই বেড়ার স্পর্শে বিদ্যুতায়িত হয়ে মরছে হাতি। আছে চোরা শিকারিরা। ওরা সুযোগ পেলেই হাতি মারে। কারণ হাতির দাঁত খুব দামি। এদিকে কক্সবাজারে মিয়ানমার থেকে অনেক রোহিঙ্গা শরণার্থী এসেছে। তাদের জায়গা দিতে গিয়ে পাহাড়-জঙ্গল সাফ করে তৈরি করা হয়েছে বহু অস্থায়ী ঘর। এতে হাতিরা খাবারের সন্ধানে পাহাড়ের এক পাশ থেকে অন্য পাশে যেতে পারছে না কোনোভাবেই। বলা চলে, বন্দি হয়ে পড়েছে ওই এলাকার হাতিরা।

 

হাতি আছে কোথায়

বাংলাদেশে যে প্রজাতির হাতি আছে, এটা এশীয় হাতি। রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম জেলার বিভিন্ন জায়গায় বন্য হাতির দেখা পাওয়া যায়। সিলেটের কুলাউড়ার লাঠিটিলার জঙ্গলে কখনো-সখনো সীমান্তের ওপারের ভারতীয় জঙ্গল থেকে হাতি নেমে আসে। আবার গারো পাহাড়ঘেঁষা শেরপুর, নেত্রকোনা, জামালপুরেও বছরের কয়েক মাস হাতি দেখা যায়। বাকি সময়টা এরা থাকে ভারতে।

 

হাতির কবর আর গোরস্তান

খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসকের ছিল এক পোষা হাতি। ওটার নাম ছিল ফুলকলি। একবার আলুটিলা এলাকায় চড়ে বেড়ানোর সময় হঠাৎ পা পিছলে পড়ে মারাত্মক আহত হয়। তার পরই মারা যায় ওটা। এটা সম্ভবত ১৯৯০ সালের আগের ঘটনা। ওই হাতিটিকে কবর দেওয়া হয়েছে ঢাকা-খাগড়াছড়ি সড়কের রাস্তার পাশেই। চাইলে খাগড়াছড়ি গেলে ফুলকলির কবরটা দেখতে পারো। খাগড়াছড়ির মানিকছড়ির রাজবাড়িটায়ও একটা চক্কর দিয়ে আসতে পারো। ওখানে হাতির দুটি বিশাল দাঁত আছে।

অনেকে আবার বলে, হাতিরা যখন বুড়ো হয়ে যায় তখন তারা বনের একটা নির্দিষ্ট জায়গায় চলে যায়, সেখানেই ওরা মারা যায়। এভাবে প্রতিটি এলাকার হাতিদেরই এমন একটা জায়গা থাকে—যেখানে বুড়ো হলে শান্তিতে মরার জন্য তারা যায়। আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন বনে এক জায়গায় অনেক হাতির হাড়গোড় পড়ে থাকতে দেখে এমনটা ধারণা করা হয়। এমন জায়গাগুলোই পরিচিত হাতির কবর নামে। তবে এটা সত্যি নাকি কিংবদন্তি এটা নিশ্চিত নয়!

 

হাতির নাদি থেকে কফি

পৃথিবীর সবচেয়ে দামি কফি হলো ব্ল্যাক আইভরি কফি। এ কফি তৈরিতে ভূমিকা আছে হাতির, আরো পরিষ্কারভাবে বললে—ব্ল্যাক আইভরি কফি বিন আসে হাতির মল বা নাদি থেকে। কিভাবে? উত্তর থাইল্যান্ডে হাতিদের খাওয়ানো হয় অ্যারাবিকা কফি বিন। হাতির পাকস্থলীতে এক ধরনের এনজাইম এই কফি বিনের প্রোটিন ভেঙে দেয়। তারপর হাতির নাদির সঙ্গে যে বিনটা বের হয়, সেটা সংগ্রহ করা হয়। এই বিনে তখন হাতির পাকস্থলীর আরো নানা উপাদান যুক্ত হয়। এটি স্বাদে ভালো, কফির সাধারণ তিক্ত স্বাদটা থাকে না। এক কেজি ব্ল্যাক আইভরি কফির দাম বাংলাদেশি টাকায় প্রায় এক লাখ।

আবার থাইল্যান্ডে হাতিদের আঁকাআঁকির প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু হয় সেই ১৯৯৮ সালে। এখন মোটামুটি আঁকিয়ে ১৪টি হাতির দেখা মিলবে থাইল্যান্ডে। তবে বুনো হাতিদের কিন্তু মোটেই এ ধরনের কোনো অভ্যাস নেই।

 

হাতিরা ভালো থাকুক

এখন বাংলাদেশে ২৫০টির মতো স্থায়ী বন্য হাতি আছে। এখনই কিছু করা না গেলে হয়তো তোমাদের গল্পের বইয়েই হাতির কথা পড়তে হবে, রূপকথার এক প্রাণীতে পরিণত হবে এরা। অথচ হাতি না থাকলে বন বাঁচানোও কঠিন। কারণ হাতির ভয়ে গাছচোররা অনেক সময় বন ধ্বংস করতে সাহস পায় না। তা ছাড়া হাতির নাদির মাধ্যমে বীজ ছড়িয়ে নতুন গাছপালাও গজায়। আমরা চাই ভালো থাকুক হাতি, ভালো থাকুক ছোট্ট নাদুসনুদুস হাতির বাচ্চারা। 

 
আরো নানা কিছু
♦    হাতিদের তিনটি জাত। আফ্রিকান বুশ এলিফ্যান্ট, আফ্রিকান ফরেস্ট এলিফ্যান্ট ও এশীয় হাতি।
♦    আফ্রিকান পুরুষ ও স্ত্রী, দুই ধরনের হাতিরই দাঁত হয়। তবে এশীয় হাতিদের বেলায় দাঁত হয় শুধু পুরুষ হাতির।
♦    ঘাস, লতাপাতা, ফল—এসব খায় হাতিরা। দিনের ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টাই ঘুরে ঘুরে খেয়ে কাটায় এরা।
♦    অন্য বন্য প্রাণীদের মতো হাতিদেরও লবণ দরকার। সাধারণ জঙ্গলে, পাহাড়ে লবণের উৎস খুঁজে বের করে খায় তারা। তবে আফ্রিকার কেনিয়ার মাউন্ট এলগন ন্যাশনাল পার্কের হাতিদের দেখা গেছে দাঁত দিয়ে মাটির তলের গুহার লবণের খনি থেকে লবণ বের করে খেতে।
♦    একটা সময় জঙ্গলে যখন অনেক হাতি ছিল, তখন পোষা হাতির সাহায্যে বন্য হাতি ধরে পোষ মানানো হতো। এভাবে হাতি ধরাকে বলা হতো খেদা।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা