kalerkantho

শনিবার । ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৬ রবিউস সানি               

৯ বছরেই কিস্তিমাত

এবারের জাতীয় দাবায় গ্র্যান্ডমাস্টার জিয়াউর রহমানের সঙ্গে ড্র করে সবাইকে রীতিমতো চমকে দিয়েছে ৯ বছরের মনন রেজা নীড়। অনূর্ধ্ব ৯ বছরের দাবাড়ুদের মধ্যে ফিদের রেটিং হিসাব করলে বিশ্বে তার অবস্থান তৃতীয় এবং এশিয়ায় প্রথম। নারায়ণগঞ্জে গিয়ে তার সঙ্গে গল্প করে এসেছেন জুবায়ের আহম্মেদ

২২ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



৯ বছরেই কিস্তিমাত

মা ও বাবার সঙ্গে

ছোটবেলা থেকেই বাবা নাজিম রেজাকে কম্পিউটারে বসে দাবা খেলতে দেখেছে। তখনই দাবার প্রতি একটু একটু করে আগ্রহ জন্ম নেয়। একদিন বাবার সঙ্গে মার্কেটে গিয়েছে। ক্রিকেট বল আর ব্যাট কিনতে। কিনলও। এ সময়ই হঠাৎ চোখ গেল একটা দাবা সেটের দিকে। ওটাও কিনার আবদার জুড়ল। বাবা খুশিমনে কিনেও দিলেন। দাবার প্রতি ছেলের আগ্রহ দেখে নাজিম রেজা তাকে ভর্তি করিয়ে দেন নারায়ণগঞ্জের নাহার চেজ একাডেমিতে। ওখানে শিখল কিভাবে দাবার চাল দিতে হয়। ধীরে ধীরে রপ্ত হতে থাকে দাবার খুঁটিনাটি বিষয়ও। নাহার চেজ একাডেমিতে নাজমুল হাসান রুমীর কাছে দাবার হাতেখড়ি। ২০১৫ সালের শেষ দিক থেকে ২০১৭ সালের শুরু পর্যন্ত তাঁর অধীনেই দাবা শেখে।  ২০১৫  সালেই প্রথমে অংশগ্রহণ করে নাহার চেজ একাডেমি আয়োজিত বিজয় দিবস চেজ টুর্নামেন্ট ২০১৫-এ। এতে রানার আপ হয়। একদিন রুমী স্যার মননের বাবাকে বললেন, ঢাকায় টুর্নামেন্ট হবে। মননও রাজি।  অংশগ্রহণ করল। তখন সময়টা ২০১৫ সালের শেষের দিকে। ‘স্যার বাবাকে বললেন, আমি ভালো করতে পারি, আমাকে যাতে ঢাকায় টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হয়। তারপর ঢাকায় খেলতে গেলাম। আমার খেলা দেখে গ্র্যান্ডমাস্টার নিয়াজ মোর্শেদ মাকে বললেন আমাকে অন্য জায়গায় ভালোভাবে অনুশীলন করাতে,’ বলল মনন। ও এখন শিখছে ধানমণ্ডিতে এলিগেন্ট ইন্টারন্যাশনাল চেজ স্কুলে। শুক্র ও শনিবার ক্লাস থাকে। নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকায় গিয়ে ক্লাস করতে কষ্ট হয় না? এমন প্রশ্ন করতেই মননের সহজ উত্তর, না। বলল, মা মৌমন রেজার সঙ্গেই যায়। সাড়ে ১২টায় ক্লাস।  মনন কমনওয়েল টুর্নামেন্টে দুবার অংশ নিয়েছে । প্রথমবার ২০১৭ সালে আন্ডার ৮-এ সিলভার মেডেল পেলেও ২০১৮ সালে হয় চ্যাম্পিয়ন। ওখানে প্রায় ৮-১০টা দেশের খুদে দাবাড়ুরা খেলেছিল। ২০১৭ সালেই শ্রীলঙ্কার ওস্কাদুয়া শহরে যায়। ওখানে একটা টুর্নামেন্টে স্ট্যান্ডার্ড, র‌্যাপিড এবং ডি- তিনটি ইভেন্টের খেলা হয়। তিনটি ইভেন্টের মধ্যে দুটিতেই গোল্ড মেডেল  এবং একটিতে সিলভার মেডেল পায়। ২০১৯ সালে জাতীয় দাবায় গ্র্যান্ডমাস্টার জিয়ার সঙ্গে ড্র করে। আবদুল্লাহ আল রাকিব, নিয়াজ মোর্শেদদের সঙ্গেও খেলেছে। দশ খেলায় সাড়ে পাঁচ পয়েন্ট পেয়ে হয়েছে ত্রিশজনের মধ্যে দশম। হারিয়েছে চারজন ফিদে মাস্টারকে।

এরই মধ্যে শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, উজবেকিস্তান,ভারতে ঘোরা হয়ে গিয়েছে দাবা খেলার কল্যাণে। ভারতে বেশ কয়েকবার গিয়েছে।  মা বা বাবা তার সঙ্গী হয়েছে প্রতিবারই। ওর ছোট একটা ভাইও আছে। ওর নাম মাদল রেজা। মননের বর্তমান দাবার টিচার  গ্র্যান্ডমাস্টার আবদুল্লাহ আল রাকিব।

তোমার প্রিয় খেলোয়াড় কে? প্রশ্ন ছুড়তেই বলল, ‘অনেকেই আছে। তবে দেশের বাইরে ম্যাগনাস কার্লসেন, গ্যারি কাসপারভ পছন্দ। আর দেশের খেলোয়াড়দের মধ্যে ফাহাদ ভাই, রাকিব স্যার, নিয়াজ স্যার, জিয়া স্যারের খেলা ভালো লাগে।’

অন্য খুদে দাবাড়ুদের মতোই স্বপ্ন দেখে গ্র্যান্ডমাস্টার হওয়ার। এলিগেন্টে গেলে দাবার অনুশীলন করে। অবসর সময় পেলেই ইউটিউবে দাবা খেলা দেখে। মাঝেমধ্যে বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে খেলাধুলাও করে। সময় পেলে ছবি আঁকে। একটি ড্রয়িং স্কুলে ছবি আঁকা শিখেছে। গান গাইতেও পারে ও।

বন্ধুরাও তার কাছ থেকে দাবার চাল শিখতে চায়। বাবার সয়েঙ্গ দাবা খেলেছ? ‘হ্যাঁঁ, অনেক খেলেছি। তারপর মুচকি হাসি দিয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে বলল, তবে এখন আর বাবার সঙ্গে খেলে পোষায় না।’

মনন এখন পড়ছে চতুর্থ শ্রেণিতে। নারায়ণগঞ্জের ফিলোসোফিয়া স্কুলে। টুর্নামেন্ট থাকে, তাই পড়ার সময় একটু ব্যাঘাত ঘটে। বাবা বলেন, ছোট থেকেই মনন যে বিষয়ে যায় সে বিষয়েই সিরিয়াস। ২০১৬ সালের আগে দাবা নিয়ে এত সিরিয়াস ছিল না বা বিদেশে যাওয়া হতো না। কেজি ওয়ান, কেজি টু-এ বরাবরই ফার্স্টবয় ছিল। কিন্তু পরে দেখা যায় ১২ মাসের মধ্যে তিন-চার মাসই দেশের বাইরে থাকতে হয়। পড়ার গ্যাপ পড়ে যায়। তাই স্কুলে ভালো রেজাল্টের ধারাবাহিকতাটা ধরে রাখতে পারেনি। এটা নিয়ে আমারদের আক্ষেপও নেই। 

কথায় কথায় মননের বাবা আরো বলেন, ‘অধিকাংশ টুর্নামেন্টে ও প্রথম দিকেই থাকত। তখনই আমরা সিরিয়াস হয়েছি। মনে হয়েছে মননকে দিয়ে দাবার কিছু একটা হবে। আর আমি আমার ছেলেকে সব সময়ই বলি ভালো মানুষ হও।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা