kalerkantho

বুধবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৩ রবিউস সানি     

পিপলুর রাক্ষস ভাই

ধ্রুব এষ

১৫ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



পিপলুর রাক্ষস ভাই

অঙ্কন : মাসুম

মানুষটাকে দেখে কী মনে হয়?

সেভাবে কিছু মনে হওয়ার মতো বয়স পিপলুর এখনো হয়নি।

পিপলু ঘুমিয়ে পড়েছিল। ঘুম থেকে উঠে মানুষটাকে দেখল। তার ঘরে বসে তাকে দেখছে মানুষটা। ছোট মানুষ পিপলু। সে আশ্চর্য হলো না মোটেও। বলল, ‘কে তুমি?’

‘আমি?’ বলে খুবই লাজুকভাবে হাসল মানুষটা।

পিপলু ভাবল বিবিকে ডাক দেয়।

পিপলুর একমাত্র ফুফু বিবি। এ বছর এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। পরীক্ষার রেজাল্ট এখনো দেয়নি। বিবি মনে করে, একমাত্র সে-ই দেখেশুনে রাখে পিপলুকে। না হলে পিপলুর মা-বাবার কোনো দায়-দায়িত্ব আছে নাকি? তারা ইশকুলে গিয়ে বসে থাকে রোজ। পড়ে না, পড়ায়। টিচার দুজনই। বিবি না থাকলে কী যে হতো পিপলুর! কাক-চিল নিয়ে যেত হয়তো পিপলুকে। এ রকম মনে করে পিপলু নিজেও। এ জন্য বিবিকে অনেক, অনেক-অনেক-অনেক ভালোবাসে সে। তবে এখন বিবি গল্পের বই পড়ছে। এ জন্য তাকে ডাকল না পিপলু। মানুষটাকে দেখল। ছোটখাটো আর কালো-কোলো আর মস্ত গোঁফঅলা মানুষটা। পিপলুর থেকে খুব বেশি উঁচু হবে না। চোখ দুটা এই বড় বড়। পিপলু বলল, ‘হ্যাঁ, তুমি। আমি পিপলু, তুমি কে?’

আবার লাজুকভাবে হাসল মানুষটা। নিচু গলায় বলল, ‘আমি রাক্ষস।’

পিপলু বলল, ‘কী? রাক্ষস? তুমি রাক্ষস?’

‘জি জনাব।’

‘তুমি রাক্ষস? এত ছোট রাক্ষস হয় নাকি? ইহ্্!’

‘অতি কারেক্ট কথা বলেছেন জনাব। আমিও এটা নিয়ে খুবই চিন্তিত। অতিশয় চিন্তিত। সাতিশয় চিন্তিত। আমি এ রকম কেন হলাম? হয়ে গেছি, কী করব? এই নিয়ে আমার মা-বাবারও মনে দুঃখের সীমা-পরিসীমা নাই। এই দুঃখে আমার প্রাণপ্রিয় ছোট মামা দেশান্তরী হয়ে গেছে, জনাব।’

পিপলু বলল, ‘মন খারাপ কোরো না। আমার দুই মামাও সুইনডেনে থাকে।’

‘ধন্যবাদ, জনাব। তবে গুস্তাকি মাফ করবেন, সুইনডেন না, দেশটার নাম হলো সুইডেন।’

‘আচ্ছা, থ্যাংক ইউ।’

‘মাই প্লেজার। আপনি একজন অতি ভালো মানুষ, জনাব।’

পিপলু বলল, ‘ভালো মানুষ, অ। মা বলেছে বড় হয়ে ভালো মানুষ হতে। বাবা বলেছে, বড় হয়ে ভালো মানুষ হতে। বিবিও বলে। আমি বড় হয়ে ভালো মানুষ হব।’

‘আপনি যথেষ্ট বড় হয়ে গেছেন, জনাব।’

অতি ঠিক কথা। আর কয়েকটুকু উঁচু হলেই ঠিক বাবার সমান উঁচু হয়ে যাবে পিপলু। সে বড় হয়ে গেছে। রাক্ষস বলছে সে ভালো মানুষ, তাহলে সে ভালো মানুষও। কিন্তু এই রাক্ষস কি সত্যি রাক্ষস? রাক্ষস হলে তার দুটা শিং থাকার কথা। পিপলু বলল, ‘রাক্ষস ভাই?’

‘জি, জনাব?’

‘তোমার শিং কোথায়?’

‘শিং জনাব? শিং থাকবে কেন? আমি কি গরু? না হরিণ? না রামছাগল? না গণ্ডার? আমি রাক্ষস। নিরীহ রাক্ষস।’

বটে! নিরীহ রাক্ষস!

পিপলু বলল, ‘তোমার মতো রাক্ষস আমি আর দেখি নাই।’

রাক্ষস বিনীত গলায় বলল, ‘কার মতো রাক্ষস দেখেছেন জনাব?’

‘রাক্ষসের মতো।’ পিপলু বলল।

নিরীহ রাক্ষস হেসে ফেলল। বলল, ‘আপনি অত্যন্ত বুদ্ধিমান একজন মানুষ জনাব।’

রাক্ষসের মতো রাক্ষস পিপলু দেখেছে বইতে। বিবি তাকে অনেক ছবিঅলা বই দেখায় এবং গল্প পড়ে শোনায়। এলিয়েন, ভূত, পরি, দৈত্য, জিনি, রাক্ষস, খোক্কসের গল্প।

রাক্ষসরা অনেক উঁচু হয়ে থাকে। এই বড় বড় দাঁত থাকে তাদের। হাউ-মাউ-খাউ করে কথা বলে তারা। আর তারা মানুষ ফ্রাই করে খায়। বিবি সব বলেছে পিপলুকে। এই রাক্ষস তাহলে এ রকম কেন? রাক্ষস না, এ মানুষ?

পিপলু বলল, ‘তুমি মানুষ খাও, রাক্ষস ভাই?’

‘জি না, জনাব।’

‘সে কী কথা! তবে তুমি কেমন রকমের রাক্ষস, হ্যাঁ?’

‘আমি জনাব, ভেজিটেরিয়ান।’

‘কী?’

‘ভেজিটেরিয়ান। নিরামিষাশী। শাকসবজি, লতাপাতা খাই জনাব।’

‘ভেজ-ননভেজ আমি বুঝি রাক্ষস ভাই।’ পরের কথাটা এতক্ষণের মতো গুছিয়ে বলতে পারল না পিপলু। বলল, ‘আমি একটা ভেজ রাক্ষস এই তুমি প্রথম দেখলাম।’

রাক্ষস খুশি হয়ে হাসল। বলল, ‘ধন্যবাদ, জনাব।’

পিপলু বলল, ‘বিবি তোমাকে দেখেনি, রাক্ষস ভাই?’

‘না, জনাব। মিস বিবি কী করে দেখবেন? উনি তো চশমা পরে গল্পের বই পড়ছেন। তা আবার যে সে বই, ‘রাক্ষস খোক্কস আর ভোক্কস।’ হুমায়ূন আহমেদের লেখা বই। বই পড়ার সময় কি কাউকে ডিপটাব করা উচিত, বলেন? উচিত না। একদম উচিত না। আপনি যদি এখন বই পড়তেন, আমি কি আপনাকে ডিপটাব করতাম? না। একদম না।’

ডিস্টার্বকে বলছে ‘ডিপটাব।’ হাসতে গিয়েও হাসল না, পিপলু বলল, ‘অ। তবে তুমি আমাদের ঘরে কী করে ঢুকলে? দরজা কে খুলে দিয়েছে?’

‘আমি দরজা দিয়ে ঢুকিনি, জনাব। জানালা দিয়ে ঢুকেছি।’

‘জানালা দিয়ে?’

‘জি, জনাব। আমার স্পঞ্জের স্যান্ডেল ছিঁড়ে গেছে তো, আরেক জোড়া স্যান্ডেল কিনতে উড়ে চকবাজারের দিকে যাচ্ছিলাম। উড়তে উড়তে দেখলাম, আপনি ঘুমাচ্ছেন। ভাবলাম সামান্য কথা বলে যাই।’

‘উড়ে যাচ্ছিলে! তুমি কি রাক্ষস না পরি?’

‘রাক্ষস, জনাব। নিরীহ রাক্ষস। হিংস্র রাক্ষসরা উড়তে পারে না, নিরীহ রাক্ষসরা পারে।’

‘অ-অ-অ। কিন্তু তোমার ডানা যে নাই।’

এই সময় বিবি ডাক দিল, ‘পিপলু-উ-উ-উ!’

পিপলু তার ঘরের দরজায় দেখল বিবিকে। মুহূর্তে হুঁশ! রাক্কস ভাই উধাও হলো নাকি উড়ে চলে গেল জানালা দিয়ে, পিপলু একদম কিছু বুঝতেই পারল না।

বিবি বলল, ‘কী রে অনলাইন, ঘুম ভেঙে গেছে?’

পিপলু বলল, ‘হুঁ।’

বিবির হাতে একটা বই। নিরীহ রাক্ষস ভাই না কী বলেছিল? পিপলু বলল, ‘তোর হাতে এটা কী বই বিবি? রাক্ষস খোক্কস আর ভোক্কস?’

‘এমা! তোকে কে বলল রে, মেগাবাইট?’

‘রাক্ষস ভাই।’

‘রাক্ষস ভাই! রাক্ষস ভাই মানে?’

‘নিরীহ রাক্ষস ভাই।’

বিবি বলল, ‘কী-ই-ই-ই?’

পিপলু আর কী করে, নিরীহ রাক্ষস ভাইয়ের ঘটনা বলল বিবিকে। শুনে বিবি বলল, ‘আবার?’

পিপলু বলল, ‘সত্যি-ই-ই-ই!’

‘হয়েছে! আর সত্যি বলতে হবে না। বানিয়ে এমন গল্প বলতে পারিস, তুই তো লেখক হবি রে, হোয়াটসঅ্যাপ।’

‘বানিয়ে বলি নাই। সত্যি! সত্যি!’

‘চুপ! আর কথা না। বড় হয়ে এসব গল্প তুই লিখিস।’

আচ্ছা, আর কথা না। পিপলু বড় হয়ে ভালো মানুষ হবে এবং এসব গল্প খুব লিখবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা