kalerkantho

রবিবার। ১৭ নভেম্বর ২০১৯। ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

ট্রেজার আইল্যান্ড

ছোটদের জন্য অসাধারণ সব বই লিখেছেন রবার্ট লুই স্টিভেনসন। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ট্রেজার আইল্যান্ড। পড়া শুরু করলে মনে হবে কিশোর জিমের সঙ্গে জলদস্যুদের এক অদ্ভুত জগতে ঢুকে পড়েছ। ১৩ নভেম্বর রবার্ট লুই স্টিভেনসনের জন্মদিন। এটা মাথায় রেখে ট্রেজার আইল্যান্ড এবং রবার্ট লুই স্টিভেনসনের সঙ্গে তোমাদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন নাবীল অনুসূর্য

৮ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ট্রেজার আইল্যান্ড

১৮৭৯ সাল। প্রেমিকা ফ্যানি অসবোর্ন পাড়ি জমিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের সানফ্রান্সিসকোতে। তাই রবার্ট লুই স্টিভেনসনও সেখানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। নিউ ইয়র্কে যাওয়ার জাহাজের দ্বিতীয় শ্রেণির টিকিট কাটলেন। সাধারণ লোকেরা কিভাবে সাগর পাড়ি দেয়, জানতে চান। বাধ সাধলেন স্বজন-বন্ধুরা সবাই। একে তো বড় ঘরের ছেলে, দ্বিতীয় শ্রেণিতে ভ্রমণের অভ্যাস নেই। তার ওপর রোগে ভোগা দুর্বল শরীর। কিন্তু স্টিভেনসন কারো কথা শুনলেন না। আগস্টে শুরু করলেন যাত্রা। তারপর নিউ ইয়র্ক থেকে ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের সানফ্রান্সিসকোতে। পথে একবার মরতেই বসেছিলেন, শরীর এতটাই ভেঙে পড়েছিল। স্থানীয়দের সেবায় সে যাত্রায় বেঁচে যান। ডিসেম্বরে পৌঁছলেন গন্তব্যে। সেখানেই পরের মে মাসে বিয়ে করেন ফ্যানিকে। আগস্টে সপরিবারে ফিরে আসেন যুক্তরাজ্যে। তখন স্টিভেনসনের মা-বাবার খুশি দেখে কে—তাঁদের বাউন্ডুলে ছেলে যে অবশেষে ঘরে ফিরেছে! অবশ্য স্টিভেনসন স্রেফ ঘরেই ফেরেননি। করে এসেছেন সত্যিকার এক অ্যাডভেঞ্চার। সেই সঙ্গে নিজের চোখে দেখে এসেছেন মানুষের দুঃখ-দারিদ্র্য, রোগশোক।

এর কিছুদিন পরের কথা। স্টিভেনসনরা তখন স্কটল্যান্ডের ব্রেইমারে থাকেন। সেদিন খুব বৃষ্টি হচ্ছিল। বসে বসে একটা কল্পিত দ্বীপের মানচিত্র আঁকলেন স্টিভেনসন। আঁকতে আঁকতেই তাঁর মাথায় এলো ‘ট্রেজার আইল্যান্ড’-এর মূল ভাবনাটা। গল্পের মূল চরিত্র একটা ছেলে [জিম হকিন্স]। স্টিভেনসনের মতে, সে একজন জীবন্ত কষ্টি পাথর। যে-ই ওর সংস্পর্শে আসে, তার ভালোত্ব জেগে উঠতে থাকে। সঙ্গে ভাবলেন এক জলদস্যুর চরিত্র [লং জন সিলভার]। সাধারণত জলদস্যুরা শারীরিকভাবে ভীষণ শক্তিশালী হয়। কিন্তু এই চরিত্রটি একেবারে উল্টো। শারীরিক শক্তি নয়, তাঁর সাফল্যের রহস্য মানসিক শক্তি। চরিত্রটি তিনি ভেবেছিলেন তাঁরই সাহিত্যিক বন্ধু ডাব্লিউ ই হেনলির আদলে। মূল ভাবনার সঙ্গে কল্পনা আর শেষ ভ্রমণের সব অভিজ্ঞতার মিশেলে ধীরে ধীরে দাঁড় করালেন কাহিনি। জন্ম নিল ডাক্তার লিভসে, ক্যাপ্টেন স্মলেট, স্কয়ার জন, বিলি বোনস, ক্যাপ্টেন ফ্লিন্ট, বেন গানরা।

স্টিভেনসন প্রথমে উপন্যাসটির নাম ঠিক করেছিলেন ‘দ্য সি কুক : আ স্টোরি ফর বয়েজ’। ১৭ অধ্যায়ের মধ্যে ১৫টি লিখেছিলেন ব্রেইমারে বসেই। এর মধ্যেই আবারও শরীর খারাপ হতে থাকে তাঁর। এমনকি স্কটল্যান্ড থেকে চলে আসতে হয় ইংল্যান্ডে। কিন্তু উত্সাহ জোগাতে থাকেন বাবা। লিখে ফেলেন বাকি দুটি অধ্যায়ও।

১৮৮১ সালের ১ অক্টোবর উপন্যাসটি প্রকাশ হতে শুরু করে। ‘ট্রেজার আইল্যান্ড, অর দ্য মিউটিনি অব দ্য হিস্পানিওলা’ নামে। ছোটদের সাপ্তাহিক সাহিত্য পত্রিকা ‘ইয়ং ফোকস’-এ। ধারাবাহিকভাবে ১৭ সপ্তাহ ধরে ছাপা হয় ১৮৮২ সালের ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত। তবে ছদ্মনামে। লেখকের নাম দেওয়া হয়েছিল ‘ক্যাপ্টেন জর্জ নর্থ’। পরে ১৮৮৩ সালের ১৪ নভেম্বর বই আকারে প্রকাশ হয় ‘ট্রেজার আইল্যান্ড’ নামে।

তখন থেকে আজ অবধি লং জন সিলভার জলদস্যুদের মডেল। এখনো বইয়ে-ছবিতে জলদস্যুদের সর্দাররা দেখতে তাঁর মতো—এক পা নেই, হাতে একটা পোষা টিয়াপাখি। এ বই থেকে এমন আরো অনেক কিছুর ব্যবহার শুরু হয়। যেমন—মানচিত্রে গুপ্তধনের সংকেত হিসেবে ক্রস চিহ্নের ব্যবহার, জলদস্যুদের প্রতিশোধ গ্রহণের বার্তা হিসেবে ব্ল্যাক স্পট ব্যবহার। এখন পর্যন্ত ‘ট্রেজার আইল্যান্ড’ থেকে ৫০টিরও বেশি ছবি ও টিভি সিরিজ বানানো হয়েছে। প্রথমটি বানানো হয়েছিল ১৯১৮ সালে। সেটা ছিল নির্বাক ছবি। পরে ইংরেজি, রাশিয়ান, ফরাসি, বুলগেরিয়ান, জার্মানসহ বিভিন্ন ভাষায় বানানো হয়েছে। মঞ্চনাটক হয়েছে অন্তত ২৪টি। হয়েছে বেতার নাটক, কমিকস, গান ও ভিডিও গেমস। এমনকি এটার একটা সাই-ফাই রূপান্তরও হয়েছে—‘গডস্পিড’। ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত উপন্যাসটি লিখেছেন চার্লস শেফিল্ড।

স্টিভেনসনের জন্ম ১৮৫০ সালের ১৩ নভেম্বর, স্কটল্যান্ডের রাজধানী এডিনবরায়। বাবা থমাস স্টিভেনসন ছিলেন পারিবারিক পেশায়—লাইটহাউস ইঞ্জিনিয়ার। ওদিকে মা মার্গারেট ইসাবেলা ছিলেন বনেদি ঘরের মেয়ে। তবে নানা ও মা দুজনেরই ছিল বুকের অসুখ। উত্তরাধিকার সূত্রে সেটা পেয়েছিলেন স্টিভেনসনও। ছোটবেলায় প্রতি শীতেই ভীষণ ভুগতেন। পরে অসুস্থতার মাত্রা কমলেও পুরোপুরি সুস্থ হননি কখনোই। তাই শরীরও ছিল ভীষণ শীর্ণকায়। অসুস্থতার কারণে এমনকি নিয়মিত স্কুলেও পড়া হয়নি। পড়েছেন বাসায় শিক্ষক রেখে। স্টিভেনসনের জীবন বদলে যায় ১৮৭৩ সালে, সিডনি কোলভিন ও ফ্যানি সিটওয়েলের সঙ্গে পরিচয়ের পর। ধীরে ধীরে পরিচিত হন লন্ডনের সাহিত্যিক সমাজে। বন্ধুত্ব হয় অ্যান্ড্রু ল্যাং, এডমন্ড গস, লেসলি স্টিফেন, ডাব্লিউ ই হেনলি প্রমুখের সঙ্গে। প্রকাশ হতে থাকে তাঁর দুর্দান্ত সব বই। এর মধ্যেই ডাক্তারের পরামর্শে বারবার বাসা বদলাচ্ছিলেন। বলা ভালো—দেশ বদলাচ্ছিলেন। হাওয়া বদল করে স্বাস্থ্য ফেরানোর আশায়। শুরুতে ইংল্যান্ড-স্কটল্যান্ডেরই বিভিন্ন এলাকায়। তারপর ফ্রান্স, এমনকি থাকেন যুক্তরাষ্ট্রেও। শেষে পাড়ি জমান প্রশান্ত মহাসাগরে। হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে থাকেন অনেক দিন। তার পর একে একে যান গিলবার্ট দ্বীপপুঞ্জ, তাহিতি, নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ায়। শেষে ১৮৯০ সালে থিতু হন ছোট্ট দ্বীপদেশ সামোয়াতে। সেখানে ৪০০ একর জমি কেনেন। স্থানীয় ভাষায় নিজের নতুন নাম রাখেন ‘তুসিতালা’। মানে ‘গল্পবলিয়ে’। ভীষণ জনপ্রিয়ও হয়ে ওঠেন সামোয়ান লোকদের কাছে। সেখানেই ১৮৯৪ সালের ৩ ডিসেম্বর মাত্র ৪৪ বছর বয়সে মারা যান রবার্ট লুই স্টিভেনসন। তাঁর বিখ্যাত বইগুলোর মধ্যে আছে—উপন্যাস ‘ট্রেজার আইল্যান্ড’, ‘স্ট্রেঞ্জ কেস অব ডক্টর জেকিল অ্যান্ড মিস্টার হাইড’, ‘কিডন্যাপড’, ‘দ্য ব্ল্যাক অ্যারো : আ টেল অব দ্য টু রোজেস’, গল্পগ্রন্থ ‘নিউ অ্যারাবিয়ান নাইটস’, ‘মোর নিউ অ্যারাবিয়ান নাইটস : দ্য ডিনামাইটার্স’, কাব্যগ্রন্থ ‘আ চাইল্ডস গার্ডেন অব ভার্সেস’, ভ্রমণকাহিনি ‘ট্রাভেলস উইথ আ ডংকি ইন দ্য সিভেনাস’ প্রভৃতি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা