kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

মীনার রূপকার রামমোহন

১৮ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মীনার রূপকার রামমোহন

রামমোহন (১৯৩১-২০১৯)

কার্টুন বা এনিমেশন নিশ্চয়ই তোমাদের ভারি পছন্দ। এগুলোর মধ্যে ‘মীনা’ কার্টুন হয়তো আরো বেশি পছন্দ। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে শিশুদের, বিশেষ করে মেয়েদের যেসব সমস্যা আছে, তার সুন্দর সমাধান এই কার্টুন সিরিজের মাধ্যমে সহজভাবে দেওয়া হয়েছে। সিরিজগুলো পরিচালনা করেছিলেন ভারতের বিখ্যাত এনিমেটর রামমোহন। ৮৮ বছর বয়সে গত ১১ অক্টোবর তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। তাঁর গল্প বলছেন রনী মাহমুদ

ছোটবেলা থেকেই আঁকাআঁকির প্রতি ঝোঁক রামমোহনের। পড়াশোনার ফাঁকে বইয়ের পাতায় পাতায় নানা ধরনের ক্যারেক্টার এঁকে ফেলতেন। আঁকতেন ছবিও। এ জন্য মা-বাবার বকুনিও কম শুনতে হয়নি। তাঁরা যদি জানতেন, এই আঁকাআঁকি থেকেই একসময় তিনি হয়ে উঠবেন বিখ্যাত এনিমেটর, তাহলে কি আর বকাবাদ্যি করতেন!

এই এনিমেটর হয়ে উঠতে গিয়ে তিনি কিন্তু চিত্রকলা কিংবা অঙ্কন বিষয়ে লেখাপড়া করেননি। তাঁর পড়াশোনার বিষয় ছিল রসায়ন। ভারতের মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নে স্নাতক করে উচ্চশিক্ষার জন্য মুম্বাইয়ে চলে আসেন। কিন্তু পড়াশোনা ভালো লাগছিল না আর। আঁকাআঁকি নিয়ে কিছু একটা করতে চাইছিলেন।

হঠাৎ সুযোগ আসে ভারত সরকারের কার্টুন ফিল্ম ইউনিটে কাজ করার। এ রকম একটা কিছুর জন্যই অপেক্ষা করছিলেন যেন রামমোহন। একবাক্যে রাজি হয়ে গেলেন। ১৯৫৬ সালে সেখানে যোগ দেন। মনের মতো কাজ পেয়ে রাত-দিন খাটতে থাকেন। সবাই বুঝতে পারে, একটু সাহায্য পেলে কার্টুন ও এনিমেশনে দুনিয়া কাঁপাবেন এই তরুণ। দক্ষতা বাড়াতে তাঁকে বিদেশে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। এভাবেই আমেরিকায় যাওয়ার সুযোগ হয় এনিমেশন কৌশলের ওপর উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য। তিনি কোথায় প্রশিক্ষণ নিয়েছেন জানো? মিকি মাউস, আলাদিনসহ বিখ্যাত সব কার্টুন যেখানে নির্মিত হয়েছে, সেই ওয়াল্ট ডিজনি স্টুডিওতে। আমেরিকান টেকনিক্যাল এইড প্রগ্রামের অধীনে ছিল এই প্রশিক্ষণ। আমেরিকায় যাওয়ার আগেই চলচ্চিত্রে কাজ শুরু করেছিলেন রামমোহন। তবে ১৯৬৮ সালে চলচ্চিত্রের কাজ ছেড়ে প্রসাদ প্রডাকশনের এনিমেশন বিভাগের প্রধান হন। ১৯৭২ সালে অবশ্য নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান দাঁড় করান। নাম দেন ‘রামমোহন বায়োগ্রাফিকস’। তিনি ১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠিত মুম্বাইভিত্তিক এনিমেশন কম্পানি ‘গ্রাফিতি মাল্টিমিডিয়ার’ চেয়ারম্যান এবং প্রধান ক্রিয়েটিভ অফিসারের দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘গ্রাফিতি স্কুল অব এনিমেশন’।

এবার মীনা কার্টুনের প্রসঙ্গ। এই প্রজেক্টের মূল উদ্যোক্তা কিন্তু ছিল ইউনিসেফ। শিশুদের নিয়ে কাজ করে এই প্রতিষ্ঠানটি। মীনার চেহারা কেমন হবে—এটা নিয়ে অনেকেই আইডিয়া দিলেও শেষ পর্যন্ত সব কিছু বিবেচনা করে রামমোহন একটা চেহারা দাঁড় করান। গল্পটি তৈরি করা হয় বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের মতামত নিয়ে। তবে কার্টুনটা তৈরির মূল দায়িত্ব ছিল রামমোহনের। ১৯৯১ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে ‘মীনা’ কার্টুন তৈরিতে কাজ করেন রামমোহন। ফলিপাইনের ম্যানিলায় অবস্থিত হান্না-বারবারা স্টুডিওতেও মীনার প্রথম দিকের বেশ কিছু পর্ব নির্মিত হয়। পরে ভারতে নিজের ‘রামমোহন স্টুডিওতে’ মীনার বাকি পর্বগুলো তৈরি করেন রামমোহন। অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে কাজটা করেন তিনি। তাইতো ছোটদের এত প্রিয় মীনা কার্টুন।

এত সব কাজের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন নানা পুরস্কার। মীনা সিরিজের জন্য ১৯৯৬ সালে কমিউনিকেশন আর্টস গিল্ডের পক্ষ থেকে অব ফেইম অ্যাওয়ার্ডে আজীবন সম্মাননা পান। নন-ফিচার এনিমেশন ফিল্ম বিভাগে ১৯৭২ ও ১৯৮৩ সালে ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। ২০০৬ সালে পান মুম্বাই আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উত্সবে আজীবন সম্মাননার পুরস্কার। এ ছাড়া ২০১৪ সালে ভারত সরকারের দেওয়া চতুর্থ সর্বোচ্চ বেসামরিক পদক পদ্মশ্রী লাভ করেন।

ভারতে যাঁরা প্রথম এনিমেশনের কাজ শুরু করেন, তাঁদের অন্যতম হলেন এই রামমোহন। এ কারণেই তাঁকে ভারতীয় এনিমেশনের জনক বলে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা