kalerkantho

বুধবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৩ রবিউস সানি     

জলের নিচে জাহাজ চলে

পানির নিচের জাহাজ! সেটা ছুটতে ওস্তাদ, আবার দরকারমতো ভেসেও ওঠে। সব মিলিয়ে বিচিত্র এক জলযান সাবমেরিন বা ডুবোজাহাজ। এখন কিন্তু বাংলাদেশেও আছে। সাবমেরিন নিয়ে তোমাদের কৌতূহল মেটানোর চেষ্টা করেছেন লতিফুল হক

১১ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



জলের নিচে জাহাজ চলে

সাগরদানো!

সাগরতলে ঘুরে বেড়াচ্ছে ভয়ংকর একটা কিছু। সমুদ্রে চলাচল করা জাহাজগুলো পড়েছে মহাবিপাকে। মাঝেমধ্যেই তাদের তলায় আঘাত হেনে চলে যায় ওটা। কেউ বলছে বিশাল এক তিমি ওটা। কেউ বলছে সাগরের গভীরে ঘুরে বেড়ানো প্রচণ্ড শক্তিশালী রহস্যময় কোনো প্রাণী। শেষ পর্যন্ত অবশ্য সমাধান হয় সব রহস্যের। ক্যাপ্টেন নিমোর ডুবোজাহাজ নটিলাস ওটা। তবে এটা কিন্তু বাস্তবের কোনো ঘটনা নয়। পৃথিবী বিখ্যাত কল্পবিজ্ঞান লেখক জুল ভার্নের  ‘টোয়েন্টি থাউজেন্ড লিগস আন্ডার দ্য সি’ উপন্যাসের কাহিনি। বিদ্যুত্ চালিত নটিলাসে কী নেই! থাকা-খাওয়ার আধুনিক সব ব্যবস্থাই আছে সেখানে। আজ থেকে সেই কত আগে, ১৮৭০ সালে উপন্যাসটি লেখা। এর আগেও অবশ্য সাবমেরিনের ধারণা ছিল। ১৫৭৮ সালে ইংরেজ গণিতবিদ উইলিয়াম বোর্ন তাঁর এক বইয়ে সর্বপ্রথম ডুবোজাহাজের ধারণা দেন।

 

প্রথম ডুবোজাহাজ!

তবে এই আশ্চর্য জলযান আবিষ্কারের কৃতিত্ব দেওয়া হয় কর্নেলিয়াস জ্যাকবসজুন ড্রেবেলকে। এই ডাচ ভদ্রলোক ১৬২০ সালে প্রথম সাবমেরিন আবিষ্কার করেন। তখন তিনি ব্রিটিশ নৌবাহিনীতে কাজ করতেন। ড্রেবেলের তৈরি ডুবোজাহাজ ছিল কাঠের। কাঠের পুরো কাঠামোটি মুড়ে দেওয়া হয়েছিল চামড়া দিয়ে। পানির নিচে সাবমেরিনটিকে ডুবিয়ে দেওয়ার পর ওপর থেকে দাঁড় দিয়ে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। ১৬২০ থেকে ১৬২৪ সালের মধ্যে তিনি আরো বেশ কয়েকটি সাবমেরিন তৈরি করেন। এর একটি তো ১৬ জন যাত্রী পরিবহনেও সক্ষম ছিল। এটি দর্শনার্থীদের সামনে পাক্কা তিন ঘণ্টা ডুবে ওয়েস্ট মিনস্টার থেকে গ্রিনিচ পর্যন্ত চলাচল করেছিল।

আধুনিক সাবমেরিন

পরের তিন শ বছরে সাবমেরিন নিয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়। তবে তেমন ব্যবহার না হওয়ায় এ নিয়ে তত আলোচনা ছিল না। বিংশ শতকে এসে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় সাবমেরিন নিয়ে হুলুস্থুল পড়ে যায়। সামরিক সাবমেরিন এই যুদ্ধে বড় প্রভাব ফেলেছিল; বিশেষ করে ইউবোট নামে পরিচিত আধুনিক প্রযুক্তির জার্মান সাবমেরিনগুলো নিয়ে হৈচৈ হয় বেশি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও সাবমেরিনের ব্যাপক ব্যবহার হয়। বড় আকারের পারমাণবিক ডুবোজাহাজে ১০০ জনেরও বেশি ক্রু থাকে। এখন অনেক দেশের হাতে সমুদ্রের তলদেশের ডুবোযানকে ডুবিয়ে দেওয়ার প্রযুক্তিও আছে!

 

যেভাবে কাজ করে

তোমরা নিশ্চয় অবাক হচ্ছ—কিভাবে সাবমেরিন পানির নিচে চলে! আবার কিভাবেই বা ওপরে ওঠে আসে, নিচে নেমে যায়! এর পেছনে আছে সাধারণ একটি সূত্র। প্রাচীন গ্রিক বিজ্ঞানী আর্কিমিডিসের নাম তো তোমরা জানোই। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, কোনো বস্তুকে পানিতে ডোবালে তা নিজের আয়তনের সমপরিমাণ পানি অপসারণ করে। যেমন—খালি পানির বোতল পানিতে ছেড়ে দিলে ভাসতে থাকবে। কিন্তু বোতলে পানি ভরলেই সেটা কিন্তু ডুবে যাবে। ঠিক এই সূত্রটাই ব্যবহার করা হয় সাবমেরিনে। প্রতিটি ডুবোজাহাজেই থাকে ব্যালাস্ট ট্যাংক। এই ট্যাংকের মাধ্যমেই সাবমেরিন ভাসে আর ডুবে যায়। ব্যালাস্ট ট্যাংকটি যখন বাতাসে ভর্তি থাকে তখন সাবমেরিন পানিতে ভাসমান থাকে। এটির নিচে আর ওপরে দুটি ভাল্ব থাকে। যখনই নিচে যাওয়ার দরকার পড়ে, নিচের ভাল্বটি খুলে দেওয়া হয়। এতে ভেতরে পানি ঢুকে ওজন বেড়ে যায়। অন্যদিকে ওপরের ভাল্ব দিয়ে বাতাস বের হয়ে যায়। এভাবে ডুবোযানটি পানির নিচে চলে যায়। ফের যখন ওপরে ওঠার প্রয়োজন পড়ে তখন ব্যালাস্ট ট্যাংকটির পানি বের করে দিয়ে ট্যাংকটি বাতাসে পূর্ণ করে দেওয়া হয়। ব্যস, ভুস করে আবার ভেসে ওঠে। প্রতিটি সাবমেরিনেই কিন্তু যাত্রীদের অক্সিজেন উত্পাদন এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড বের করে দেওয়ার প্রযুক্তি থাকে। এটা না হলে তো কেউ শ্বাস-প্রশ্বাসই নিতে পারবে না। আরেকটা ব্যাপার, সাবমেরিন থেকে বাইরে দেখা যায় কিভাবে? পানির অল্প গভীরে থাকলে পেরিস্কোপ ব্যবহার করা হয়। যন্ত্রটি ঠিকই পানির ওপরে গিয়ে বাইরের দৃশ্য ভেতরে পৌঁছে দেয়। সমুদ্রের তলদেশে থাকলে ব্যবহূত হয় সোনার পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে ত্রিমাত্রিক শব্দতরঙ্গ তৈরি করে সমুদ্রের গভীরতা, উঁচু-নিচু পাহাড়, খাদ, শত্রুপক্ষের ডুবোজাহাজ ইত্যাদির তথ্য পাওয়া যায়।

শুধু কিন্তু যুদ্ধ নয়

সামরিক কাজেই সাবমেরিনের ব্যবহার বেশি কিন্তু শুধু যুদ্ধেই কিন্তু এর ব্যবহার হয় না। ইদানীং পর্যটকদের জন্য সাবমেরিন ব্যবহূত হচ্ছে। এ ছাড়া ডুবে যাওয়া জাহাজ খুঁজে বের করা, তেল-গ্যাসের মতো প্রাকৃতিক সম্পদ অনুসন্ধান, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ গবেষণায় ডুবোজাহাজ ব্যবহূত হয়। আটলান্টিক সাবমেরিনস নামের এক কানাডীয় কম্পানি আছে, যাদের ১২টি সাবমেরিন আছে। সেগুলো ব্যবহার করা হয় শুধু পর্যটনের কাজেই। বার্বাডোস, সেন্ট টমাস, হাওয়াইসহ অনেক জায়গায় পর্যটকদের কাছে খুবই জনপ্রিয় সাবমেরিন ট্যুর। এসব ট্যুরে গেলে প্রথমে পর্যটকদের একটি ফেরিতে করে সাবমেরিনে পৌঁছে দেওয়া হয়। এরপর সবাইকে নিয়ে ডুব দেয় ডুবোজাহাজ। ঘুরে ঘুরে দেখায় নানা প্রজাতির সামুদ্রিক প্রাণী, পরিচয় করিয়ে দেয় সাগরতলের এক অন্য ভুবনের সঙ্গে। ধারণা করা হয় পর্যটকদের জন্য গোটা দুনিয়ায় এখন ৩০টির বেশি সাবমেরিন আছে।

‘দ্য হান্ট ফর রেড অক্টোবর’, ‘কে-১৯ : দ্য উইন্ডোমেকার’, ‘ক্রিমসন টাইড’, ‘ইউ-৫৭১’ ইত্যাদি সিনেমায় সাবমেরিনের অনেক দৃশ্য আছে।

 

বাংলাদেশের সাবমেরিন

২০১৬ সালে বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে প্রথম সাবমেরিন যুক্ত হয়। ‘নবযাত্রা’ ও ‘জয়যাত্রা’—দুটি সাবমেরিন শত্রুপক্ষের যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিনকে আক্রমণ করতে সক্ষম। চীন থেকে এ দুই সাবমেরিন কেনে বাংলাদেশ। এই দুটি ডিজেল ইলেকট্রিক সাবমেরিন দৈর্ঘ্যে ৭৬ মিটার, প্রস্থে ৭.৬ মিটার। কিছুদিন আগে ঠিক হয়েছে, দেশে সাবমেরিন ঘাঁটিও তৈরি হবে। এটিও তৈরি করে দেবে চীন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা