kalerkantho

নানা রকম গরু রে ভাই

কোরবানির ঈদের সময় গরু কেনা নিয়ে হয় নানা কাণ্ড। গরুর কিন্তু নানা ধরনের মজার দিকও আছে। আছে ছোট আকারের গরু, বিশাল গরু, গরুর উৎসব—এমনই নানা কিছু। বিস্তারিত জানাচ্ছেন ইশতিয়াক হাসান

৯ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



নানা রকম গরু রে ভাই

ইন্দোনেশিয়ায় গরুদৌড় প্রতিযোগিতা

খুদে আর বড়

গিনেস রেকর্ড অনুযায়ী পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গরু ব্লোসম। ২০১৫ সালে মারা যাওয়া গরুটির উচ্চতা ছিল ৬ ফুট ৪ ইঞ্চি, ওজন ২০০০ পাউন্ড। ওটার মালিক ছিলেন আমেরিকার পেটি মিডস। আর সবচেয়ে ছোট প্রাপ্তবয়স্ক গরুটির নাম মানিকিয়াম। উচ্চতা ২ ফুট। দক্ষিণ ভারতের কেরালার অক্ষয় এনভি এর মালিক। আয়ারল্যান্ডের ডেক্সটার গরুরা ইউরোপের খুদে জাতের গরুদের মধ্যে একটি। এরা বিশাল আকৃতির ফ্রিজিয়ান গরুদের তিন ভাগের এক ভাগ। আয়ারল্যান্ড থেকে এই জাতের গরু প্রথম ইংল্যান্ডে আনা হয় ১৮৮২ সালে। গ্যালওয়ে গরুও আকারে অনেক ছোট। কালো এই গরুর পেটের মাঝখানে থাকে সাদা রং। তিন থেকে সাড়ে তিন ফুট উচ্চতার জার্সি গরুগুলোও জায়গা করে নিয়েছে দুনিয়ার সবচেয়ে খুদে গরুর জাতগুলোর তালিকায়। ইতালির চিয়ানিনা হলো সবচেয়ে বড় আকারের গরুর প্রজাতিগুলোর একটি।

গরুদৌড়

দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ায় হয় কম্পাস কাপ ফেস্টিভাল। অস্ট্রেলিয়ার একমাত্র কাউরেস প্রতিযোগিতা এটি। এ বছর ৪৩ বছর পূর্ণ করল এটি। এই উৎসবে প্রতিটি গরুর সঙ্গে একাধিক লোকও থাকে একে দিকনির্দেশনা দেওয়ার জন্য।

ভারত, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তানসহ নানা দেশে হয় গরুদৌড়।

কখনো আবার সওয়ারিসহ গরুর গাড়ি টেনে নিয়ে চলে গরুরা। বাংলাদেশেও হয় নানা ধরনের গরুদৌড় প্রতিযোগিতা। যেমন কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার বড়বাড়ি এলাকায় ফিবছর পুরনো বছরকে বিদায় এবং নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে আয়োজন হরা হয় গরুর হাল দৌড়ের। এতে প্রতি জোড়া হালের গরুর পেছনের মইয়ে দাঁড়িয়ে একজন কৃষক গরুকে তাড়িয়ে নিয়ে যায়। গরুর দৌড় প্রতিযোগিতা হয় নেত্রকোনা, ঢাকার নবাবগঞ্জসহ আরো নানা জায়গায়।

গরু উৎসব

নানা ধরনের ফেস্টিভাল বা উৎসব আছে গরু নিয়ে। নেপালের কথাই ধরো। গাই যাত্রা নামের একটি উৎসব তারা পালন করে ফিবছর সেপ্টেম্বরে। আগের বছর যেসব পরিবার কোনো আপনজনকে হারিয়েছে, তারা কাঠমাণ্ডুর রাস্তাঘাটে হেঁটে বেড়ায় সামনে একটি করে গরু নিয়ে। গরুটাকে রাখা হয় ওই মৃত স্বজনের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে। যারা গরু জোগাড় করতে পারে না, তারা পরিবারের ছোট ছেলেটির মুখে রং দিয়ে সাজায় গরুর মতো করে।

সেপ্টেম্বরেই ইউরোপের দেশ স্লোভেনিয়ার বোহিনজ এলাকায় হয় গরুদের বিশাল জমায়েত। মালিকদের সঙ্গে রংচঙে পোশাকে সজ্জিত হয়ে আশপাশের গ্রামগুলোতে ঘুরে বেড়ায় গরুরা। এই সুযোগে নানা পণ্য বিক্রির জন্য নিয়ে বসে লোকেরা। এককথায় গোটা এলাকাটি একটা মেলায় রূপ নেয়। এদিকে জার্মানির বাভারিয়া আর সুইজারল্যান্ডেও হয় এমন উৎসব। ৫০ হাজারের বেশি গরু এতে অংশ নেয়।

বিশাল গরু

গরুর হাটে ওঠে বিশাল সব গরু। গতবার যেমন রাজা বাবু নামের বিশাল একটা গরু খুব আলোড়ন তোলে। এবার টাইটানিক, বস নামের গরুগুলোর কথা শোনা যাচ্ছে বেশ। একেকটার দাম হাঁকানো হচ্ছে ২০-২৫ লাখ টাকা। এদিকে গরমে টাইগার নামের বিশাল একটা গরু হাটেই মারা গেছে।

 

অদ্ভুত সব গরু

এই তালিকায় ওপরের দিকে থাকবে টেক্সাস লং হর্ন গরু। এর সুখ্যাতি আছে ইয়া লম্বা শিংয়ের জন্য। এক শিংয়ের আগা থেকে আরেক শিংয়ের আগা গড়ে সাত ফুটের মতো। গিনেস রেকর্ডটি অবশ্য পঞ্চো নামের একটি টেক্সাস লংহর্নের। আলাবামার পোপে পরিবারের গরুটি। এক শিংয়ের ডগা থেকে ওটার আরেক শিংয়ের ডগার দৈর্ঘ্য ১০ ফুট ৭ ইঞ্চি। এদিকে আফ্রিকার এংকোলি-ওয়াতুসির বাঁকানো লম্বা শিং জোড়াও দেখার মতো। স্কটল্যান্ডের হাইল্যান্ড কাউ এতটাই লোমশ যে কিম্ভূত এক প্রাণী বলে মনে হবে। আসলে স্কটল্যান্ডের শীতল আবহাওয়ায় টিকে থাকতেই এই অভিযোজন। এদিকে পান্ডার মতো গায়ের রঙের পান্ডা গরুরাও দেখতে বেশ আজব ধরনের। তবে গোটা দুনিয়ায় এরা আছে মেরে-কেটে ত্রিশটির মতো।

দামি গরু

কানাডার আলবার্টার পোনোকা মোরসান খামার দুষ্প্রাপ্য জাতের গরুর জন্য নাম কামিয়েছে। এখানকার গরুগুলো বিকোয় চড়া দামে। তবে অন্যগুলোকে ছাড়িয়ে যায় মিজি নামের একটি গরু। টরেন্টোয় এক নিলামে এটি বিক্রি হয় ১২ লাখ ডলার বা ১০ কোটি টাকার বেশিতে। হোলস্টেন জাতের এই গরু ছাড়া এ পর্যন্ত আরো চারটি গরু বিকিয়েছে ১০ লাখ ডলারের বেশি দামে।

 

প্রথম উড়োজাহাজে

উড়োজাহাজে চড়া প্রথম গরু হলো এলম ফার্ম ওলি। ১৯৩০ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরির সেন্ট লুইসে আন্তর্জাতিক একটি প্রদর্শনীর অংশ হিসেবে প্লেনে চড়ার সৌভাগ্য হয় গরুটির। এই যাত্রার সময় গরুটি থেকে ২২ লিটার দুধও সংগ্রহ করা হয়।

 

গরুর জন্য যুদ্ধ

১২৭২-৭৮ সাল পর্যন্ত ফ্রান্সে হয়েছিল ওয়ার অব দ্য কাউ। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, যুদ্ধ বাধে একটি গরু চুরিকে কেন্দ্র করে।

 

বনগরু

পার্বত্য চট্টগ্রামের বনে ঘুরতে গিয়েছ। হঠাৎ চমকে উঠে দেখলে বিশাল কয়েকটি প্রাণী চড়ে বেড়াচ্ছে। দেখতে গরুর মতোই। ভাবলে এত বড় গরু বনে এলো কিভাবে?

সত্যি এমন প্রাণী আছে। বিশাল এই প্রাণীর ইংরেজি নাম ইন্ডিয়ান বাইসন। বাংলায় একে বনগরু বা গৌর বলে। একসময় প্রাণিবিজ্ঞানীরা ধারণা করেছিলেন, বাংলাদেশে বুঝি বা আর বনগরু নেই। কিন্তু এই কিছুদিন আগেই বান্দরবানে ক্যামেরা ট্র্যাপে ধরা পড়েছে এদের বেশ কয়েকটি ছবি। এমনকি একেবারে কম বয়স্ক কয়েকটি বনগরুর ছবিও তোলা সম্ভব হয়েছে। অর্থাৎ পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলাগুলোর গভীর অরণ্যে এখনো এরা আছে।

একেকটি বনগরুর ওজন হয় ১০-১২ মণ। গায়ের রং কালো। তবে কম বয়স্ক প্রাণীগুলোর রং হালকা বাদামি হতে পারে। বনগরুর মজার ব্যাপার হলো, এদের হাঁটু থেকে খুর পর্যন্ত সাদা বা ধূসর পশম আছে। দেখে মনে হতে পারে, কেউ পায়ে মোজা পরিয়ে দিয়েছে।

একসময় বাংলাদেশের অনেক বনেই এরা ছিল। হবিগঞ্জের সাতছড়ির জঙ্গলে বনগরু দেখার গল্প শুনেছি। এখন সিলেটের বনগুলোতে এরা আর নেই। মাঝেমধ্যে ভারতের বনগুলো থেকেও বাংলাদেশে আসে। এরা খুব সাহসী। বিখ্যাত শিকারি কেনেথ এন্ডারসন ভারতের গেদেসেলের একটি বনগরুর কথা বলেছিলেন, যেটি বাঘের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে লড়াই করেছিল। চিড়িয়াখানা আর সাফারি পার্কে এদের দেখা পাবে। তবে বনে এদের বাঁচিয়ে রাখতে সচেতন হতে হবে আমাদের। অনেকটা বনগরুর মতো একটা প্রাণী গয়াল। কেউ কেউ বলে বনগরু আর পোষা গরুর সংকর হলো গয়াল। অনেকে আবার বলে, এরা আলাদা একটা জাত। তবে বনগরু পোষ মানে না, গয়াল মানে। অনেকেই খামারে গয়াল পুষছে এখন। আরেকটা কথা, বনগরু কিন্তু সংরক্ষিত প্রাণী। এটি শিকার কিংবা ধরা নিষিদ্ধ।

মন্তব্য