kalerkantho

সোমবার । ১৪ অক্টোবর ২০১৯। ২৯ আশ্বিন ১৪২৬। ১৪ সফর ১৪৪১       

আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী

মীরাবাজার থেকে শুরু

ইয়াহইয়া ফজল

১৯ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মীরাবাজার থেকে শুরু

এই কুয়ার ওপর ঝুলিয়েই চাচা ছোট্ট হুমায়ূনকে ভয় দেখান। মীরাবাজারের যে বাড়িতে হুমায়ূন আহমেদের পরিবার থাকত, সে বাড়ি ভেঙে গড়ে তোলা নতুন অট্টালিকা। ছবি : আশকার আমিন রাব্বি

সুযোগ পেলেই হলো—সবার অগোচরে বাসা থেকে বেরিয়ে পড়তেন। টইটই করে ঘুুরে বেড়াতেন মীরাবাজারের অলিগলিতে। সাজানো-গোছানো সুন্দর বাড়ি চোখে পড়লেই হুট করে ঢুকে পড়তেন। এভাবেই একদিন ঢুকে পড়েন বিশাল বাউন্ডারিঘেরা এক বাড়িতে। গাছগাছালিতে ছাওয়া ধবধবে সাদা রঙের বাংলো প্যাটার্নের বাড়িটিতেই শুক্লাদির সঙ্গে তাঁর দেখা। যিনি বালক হুমায়ূন আহমেদের সামনে খুলে দিয়েছিলেন ‘স্বপ্নজগতের দরজা’। কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ হয়ে ওঠার গল্পের শুরু সেখানেই।

পরিচয় পর্বের পর শুক্লাদি বাসার ভেতর থেকে ‘কদম ফুলের মতো দেখতে একটা মিষ্টি’ এনে তাঁকে খেতে দেন। সেই মিষ্টির লোভে পরদিনও উপস্থিত হন। তৃতীয় দিন সঙ্গে নিয়ে যান ছোট বোন শেফুকে। বলেন, ‘এ আমার ছোট বোন। এ-ও মিষ্টি খুব পছন্দ করে।’ ঘরে মিষ্টি না থাকায় শুক্লাদি অবশ্য সেদিন তাদের খাওয়াতে পারেননি। দুঃখ নিয়ে বলেন, ‘আজ ঘরে কোনো মিষ্টি নেই। তোমাদের জন্য একটা বই নিয়ে এসেছি। খুব ভালো বই। বইটা নিয়ে যাও।’ তাঁর দেওয়া অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ক্ষীরের পুতুল’ বইটিই হুমায়ূন আহমেদের ‘প্রথম পড়া সাহিত্য’। তাঁর মতে, ‘তিনি (শুক্লাদি) অসাধারণ একটি বই একটি বাচ্চা ছেলের হাতে ধরিয়ে দিয়ে তার স্বপ্নজগতের দরজা খুলে দিলেন।’

বাবার বিশাল লাইব্রেরি ছিল। কিন্তু সাহিত্যের প্রথম পাঠ তিনি মা-বাবার কাছ থেকে নয়, পেয়েছিলেন শুক্লাদির কাছ থেকে। ‘ক্ষীরের পুতুল’ তাঁর জীবনধারা পাল্টে দেয়। দুপুরে টইটই করে ঘোরার বদলে বাবার আলমারি থেকে বই চুরি করে লুকিয়ে পড়তে শুরু করেন। একদিন ধরাও পড়েন। বাবা সেদিন সন্ধ্যায়ই তাকে রিকশায় করে নিয়ে যান দরগা গেটস্থ সিলেট কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদে। বইয়ের প্রাচীন এই ভাণ্ডারের সদস্য করে দেন তাঁকে। শান্ত কণ্ঠে বলেন, ‘এখানে অনেক ছোটদের বই আছে, আগে এগুলো পড়ে শেষ কর। তারপর বড়দের বই পড়বি।’ এরপর দীর্ঘদিন হুমায়ূন সেই লাইব্রেরি থেকে বই এনে পড়েছেন। বোন শেফু ও ছোট ভাই ইকবালকে (খ্যাতিমান সায়েন্স ফিকশন লেখক অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল) সঙ্গে নিয়ে প্রতিদিন প্রায় দুই কিলোমিটার হেঁটে মীরাবাজার থেকে মুসলিম সাহিত্য সংসদে গিয়ে দুটি করে বই নিয়ে আসতেন।

হুমায়ূন আহমেদের বাবা ফয়জুর রহমান সিলেটের বিশ্বনাথ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ছিলেন। সেই সূত্রে তাঁর শৈশবের বড় সময়টি কেটেছে সিলেটে। মীরাবাজার এলাকার উদ্দীপন-৩০ নম্বর বাড়িতে হুমায়ূন আহমেদের পরিবারের বসবাস ছিল। হুমায়ূন আহমেদের শৈশবের বর্ণনাজুড়ে রয়েছে সিলেট। বিশেষ করে নগরের মীরাবাজার এলাকাজুড়েই যেন তাঁর শৈশব। সেখানকার কিশোরীমোহন পাঠশালায় শিক্ষাজীবনের শুরু। তাঁর ‘আমার ছেলেবেলা’ বইতে সেই সময়ের শহর সিলেটের চিত্রও পাওয়া যায়।

সে সময় ‘বাড়িটি ছিল সাদা রঙের একতলা দালান। চারদিকে সুপারিগাছের সারি। ভেতরে উঠোনে একটি কুয়া। কুয়ার চারপাশ বাঁধানো। বাড়ির ডান দিকে প্রাচীন কয়েকটি কাঁঠালগাছ। কাঁঠালগাছের পাতায় আলো-আঁধারের খেলা। কুয়ার ভেতর উঁকি মারছে নীল আকাশ।’

টিনশেডের আসাম প্যাটার্নের একতলা বাড়িটি বছর আটেক আগে ভেঙে ফেলা হয়েছে। সেখানে এখন সুরম্য অট্টালিকা। সুপারিগাছ কয়েকটি থাকলেও নেই প্রাচীন কাঁঠালগাছগুলো।

আতাফল গাছও কেটে ফেলা হয়েছে অনেক আগে। তবে তাঁর বর্ণনার সেই কুয়াটি এখনো আছে। হুমায়ূন আহমেদের সম্মানে বাড়ির মালিক হাজি ফয়জুর রহমান খান তাঁর জীবদ্দশায় বাড়িটি ভাঙতে দেননি। তাঁর মৃত্যুর পর বাড়িটি বসবাসের অনুপযুক্ত হয়ে যাওয়ায় তা ভেঙে ফেলেন তাঁর উত্তরসূরিরা।

এই কুয়াটি ঘিরে বালক হুমায়ূনের ভয়ংকর স্মৃতি ছিল। তাঁদের বাসায় থাকতেন মেজো চাচা। পড়তেন সিলেটের ঐতিহ্যবাহী মুরারীচাঁদ কলেজে। একবার দুষ্টুমির জন্য হুমায়ূনের শাস্তি দেওয়ার দায়িত্ব তাঁর মা দিয়েছিলেন চাচাকে। তিনি সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তাঁকে এক হাতে শূন্যে ঝুলিয়ে কুয়ার মুখে ধরে বললেন, ‘দিলাম ছেড়ে’। পাঁচ কিংবা ছয় বছরের সেই ঘটনা হুমায়ূনের পরিণত বয়সে মনে হলেও ‘বুক ধড়ফড়’ করত। এক ঝিমধরা দুপুরে ‘চাই দুধমালাই আইসক্রিম’ শুনে ছুটে ঘর থেকে বের হন। আইসক্রিমওয়ালা বলল, আইসক্রিম কিনবে?

মনের দুঃখ চেপে বললাম, না। পয়সা নেই। আইসক্রিমওয়ালা কিছুক্ষণ কী জানি ভেবে বলল, খাও একটা আইসক্রিম, পয়সা লাগবে না।

প্রায় এক মাস চলল এ রকম। প্রতিদিন দুপুরে আইসক্রিমওয়ালা আসে। তাকে বিনা মূল্যে একটি আইসক্রিম খেতে দেয়। মা একসময় বিষয়টি টের পেয়ে গেলে সেই সুখের দিন শেষ হয়।

হুমায়ূনের চঞ্চলতার রাশ টানতে তাঁকে স্কুলে ভর্তি করার সিদ্ধান্ত হলো। মেজো চাচা তাঁকে কিশোরীমোহন পাঠশালায় ভর্তি করিয়ে দিয়ে এলেন এবং হেডমাস্টার সাহেবকে বললেন, চোখে চোখে রাখতে হবে। বড়ই দুষ্টু।

প্রথম দিনেই শাস্তি জোটে কপালে। এরপর প্রায় প্রতিদিনই তাঁকে শাস্তি ভোগ করতে হয়েছে। হুমায়ূন আহমেদের সেই পাঠশালা এখনো আছে। তবে ওই ভবনের জায়গায় এখন হয়েছে বহুতল ভবন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা