kalerkantho

শনিবার । ২০ জুলাই ২০১৯। ৫ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৬ জিলকদ ১৪৪০

খেলা বন্ধের অদ্ভুত যত কারণ

অনেক সময়ই বিভিন্ন কারণে ক্রিকেট খেলা বন্ধ হয়। সবচেয়ে বেশি বন্ধ হয় বৃষ্টির কারণে। ১৯৯৮ সালে একবার ধূলিঝড়ের কারণেও খেলা বন্ধ রাখতে হয়েছিল। সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজায় অস্ট্রেলিয়া-ভারতের ম্যাচটি ধূলিঝড়ের কারণে ১৫ মিনিট বন্ধ থাকার পর ডাকওয়ার্থ-লুইস পদ্ধতিতে নতুন লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছিল! খেলা বন্ধের এমনই বিচিত্র কিছু কারণের খোঁজ জানাচ্ছেন নাবীল অনুসূর্য

১২ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে




খেলা বন্ধের অদ্ভুত যত কারণ

নাথান লায়ন

রোদ-বৃষ্টি-তুষারপাত

২০১৬ সালে ইংল্যান্ডের ওভালের একটি খেলা এক দিন বন্ধ ছিল তুষারপাতের কারণে! এমন ঘটনা ইংল্যান্ডে এর আগে ১৯৭৫ সালেও একবার ঘটেছিল। সেবার বাক্সটনে তো আগের দিন এত সুন্দর রোদ ছিল যে গ্যালারিতে অনেক দর্শককে উদোম গায়ে রোদ পোহাতে দেখা গিয়েছিল। রাতে এমন শিলাবৃষ্টি হয়েছিল, পরদিন দেখা গেল, সারা মাঠ তুষারে ভরে গেছে! ১৯৯৫ সালে একই দেশের ওল্ড ট্রাফোর্ডে আবার উল্টো ঘটনা ঘটে। প্রথম দিন চা বিরতির ১৫ মিনিট আগেই আম্পায়ার খেলা বন্ধ করে দেন। কারণ অধিক রোদ! এত রোদ উঠেছিল যে খেলাই যাচ্ছিল না। ১৯৮১ সালে কেমব্রিজে আবার খেলা বন্ধ করতে হয়েছিল ঠাণ্ডার জন্য। এত বেশি ঠাণ্ডা ছিল সেদিন, খেলোয়াড়রা দু-তিনটা সোয়েটার পরেও মাঠে টিকতে পারছিলেন না। শেষে গুঁড়ি গুঁড়ি তুষার পড়তে শুরু করলে সবাই খেলার চিন্তা বাদ দিয়ে রণে ভঙ্গ দেয়।

বাঘকাণ্ড ও অন্যান্য

১৯৮৮ সালে ইংল্যান্ডের হেডিংলিতে স্বাগতিকদের সঙ্গে ওয়েস্ট ইন্ডিজের একটা ম্যাচ খানিক্ষণ বন্ধ ছিল ড্রেনের পাইপ ফেটে যাওয়ায়! কার্টলি অ্যামব্রোস বল করতে গিয়েও একটা অদ্ভুত ব্যাপার দেখে থেমে যান। মাঠের মধ্যে একটা জায়গা দিয়ে পানি উঠছে। পরে দেখা যায়, মাঠের নিচের ড্রেনের পাইপ ফেটে গেছে। এদিকে ২০১৭ সালে ভারতের রঞ্জি ট্রফির ম্যাচ চলার সময় পালামের মাঠে গাড়ি ঢুকিয়ে দিয়েছিল এক চালক। অস্ট্রেলিয়ার শেফিল্ড শিল্ডের ম্যাচের সময় ড্রেসিংরুমে নাথান লায়ন টোস্ট তৈরির সময় পুড়িয়ে ফেলেন। এতে সৃষ্টি হওয়া ধোঁয়ায় ফায়ার অ্যালার্ম বেজে উঠেও খেলায় ছেদ টেনেছিল। আবার হ্যাম্পশায়ারে একবার এক দর্শক জানান, পাশের গলফ মাঠে নাকি একটা বাঘ ঘুরে বেড়াচ্ছে। শুনে সবাই ভয়েই দে ছুট! খেলোয়াড়রা সবাই ড্রেসিংরুমে। হেলিকপ্টার দিয়ে পুরো গলফ মাঠ তন্ন তন্ন করে খুঁজে শেষে বাঘটা পাওয়া যায়। তবে সেটা ছিল একটা খেলনা বাঘ! দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইংল্যান্ডের লর্ডসে একটি খেলা চলাকালে জার্মানির একটি বিমান মাঠের কাছাকাছি চলে এসেছিল। ভাগ্যিস, সেদিন বিমানটা লর্ডস পর্যন্ত আসেনি!

 

আরো পশুপাখি

বিভিন্ন পশুপাখি মাঠে ঢুকে যাওয়ায় খেলা বন্ধ থাকার ঘটনা তো ক্রিকেটে ভূরি ভূরি আছে। কুকুর-বিড়াল ঢুকে যাওয়ায় খেলা বন্ধ থাকার ঘটনা তো প্রচুর আছে। এমন ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটেছে ভারত আর শ্রীলঙ্কায়। ভারতের পুনে একবার খেলার মাঠে বানর ঢুকে পড়েছিল। অস্ট্রেলিয়ার গ্যাবায় এক দর্শক মাঠে একটা শূকর ছেড়ে দিয়েছিল। দেশটির ভিক্টোরিয়ার এক মাঠে একবার খেলা বন্ধ করতে হয়েছিল মাঠের মধ্যে ছয়টা খরগোশ আর দুইটা ক্যাঙ্গারু ঢুকে নাচানাচি শুরু করায়। এভাবে মাঠে গরু, মহিষ, ভেড়া, হাঁস, এমনকি উট ঢুকে পড়ার ঘটনাও ঘটেছে। আর কোনো প্রাণী ঢুকলে খেলা তো বন্ধ থাকবেই। মৌমাছি, ঘাসফড়িং, এমনকি গুবরেপোকার আক্রমণেও ক্রিকেট খেলা বন্ধ রাখার ঘটনা আছে!

 

মৃত্যু

শুধু প্রাকৃতিক কারণেই নয়, মানুষের মৃত্যুতেও বেশ কয়েকবার খেলা বন্ধ হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ১৯৫২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ইংল্যান্ডের রাজা ষষ্ঠ জর্জ মারা গেলে ভারত-ইংল্যান্ড টেস্টের দ্বিতীয় দিন খেলা বন্ধ রাখা হয়। ১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর শিয়ালকোটে চলছিল ভারত-পাকিস্তান মহারণ। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুর খবর এলে, শুধু সেই খেলা নয়, পুরো পাকিস্তান সফরই বাতিল করে দেশে ফেরত যায় ভারত দল। আর ২০১৪ সালের ২৭ নভেম্বর ক্রিকেটার ফিলিপ হিউজের মৃত্যুর খবরে বন্ধ করে দেওয়া হয় শারজায় পাকিস্তান-নিউজিল্যান্ড টেস্টের দ্বিতীয় দিনের খেলা।

 

তবে খেলা বন্ধ হওয়ার সবচেয়ে মজার ঘটনাটি বোধ হয় ১৯৯৫ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার ক্যাসল কাপে ঘটেছিল। রজার টেলেমাকাসের বলে ছয় মেরেছিলেন ড্যারেল কালিনান। বল গিয়ে পড়ে একটা কালামারি স্কুইড ভাজার প্যানের মধ্যে। বলটা ঠাণ্ডা করতেই ১০ মিনিট লেগে যায়!

বৃষ্টির খপ্পরে

বৃষ্টির মধ্যে ফুটবল তা-ও চালিয়ে নেওয়া যায়; কিন্তু ক্রিকেট খেলা অসম্ভব। এমনকি বৃষ্টি শেষ হলেও মাঠ না শুকানো পর্যন্ত খেলার জো নেই। তবে কখনো কখনো বৃষ্টি আশীর্বাদ হয়েও আসে। এই যেমন ২০১৭ চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়ার খেলায়। নির্ঘাত হারা খেলা বৃষ্টির কল্যাণে ড্র করে আমরা এক পয়েন্ট পেয়েছিলাম। সেমিফাইনাল খেলতে সেই পয়েন্টটা ভীষণ সাহায্য করেছিল।

২০০৩ বিশ্বকাপে জিম্বাবুয়ে সুপার সিক্সে গিয়েছিল এই বৃষ্টির সাহায্যেই। গ্রুপ রাউন্ডের শেষ ম্যাচে পাকিস্তানের মুখোমুখি হয়েছিল তারা। সেই ম্যাচে পাকিস্তান জিতলে ওই দুই দলের সঙ্গে ইংল্যান্ডেরও পয়েন্ট সমান হতো। নেট রানরেটে বাদ পড়ত জিম্বাবুয়ে। ম্যাচটা বৃষ্টিতে ভেসে যায়। আর জিম্বাবুয়েও চলে যায় পরের রাউন্ডে। অবশ্য এর আগে ১৯৯২ বিশ্বকাপে মুদ্রার উল্টো পিঠটাও দেখা ছিল পাকিস্তানের। তৃতীয় ম্যাচে তারা মুখোমুখি হয়েছিল ইংল্যান্ডের। আগে ব্যাট করে অলআউট হয়ে গিয়েছিল মাত্র ৭৪ রানে। নিশ্চিত হারের মুখ থেকে তাদের বাঁচিয়ে দেয় বৃষ্টি। সেই ম্যাচে পাওয়া এক পয়েন্টে ভর করে সেমিফাইনালে ওঠে তারা, চ্যাম্পিয়নও হয়! তবে বৃষ্টিতে খেলা পণ্ড হওয়ার চেয়েও বেশি সমস্যা হয় খেলার দৈর্ঘ্য কমে গেলে। তখন নতুন করে ব্যাটিং দলের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। সে জন্য বিশেষ পদ্ধতিও আছে—ডাকওয়ার্থ-লুইস। খুবই জটিল আর গোলমেলে। এই আইনের সবচেয়ে দুর্ভাগা শিকার দক্ষিণ আফ্রিকা। এক বলে ২২ রান—বললেই সবার চোখে ভেসে ওঠে ১৯৯২ সালের সেমিফাইনালের স্কোরবোর্ডের ছবি। যখন বৃষ্টি নামল, ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ফাইনালে জিতে দক্ষিণ আফ্রিকার দরকার ছিল ১৩ বলে ২২ রান। বৃষ্টির পরে যখন আবার ব্যাটিংয়ে নামল, স্কোরবোর্ডে দেখাল সেই ‘বিখ্যাত’ লক্ষ্য! এক দশক পরে বৃষ্টির কারণে আবারও কপাল পোড়ে দলটির। ২০০৩ বিশ্বকাপে অবশ্য তারা নিজেদের ভুলেই হেরেছিল। শ্রীলঙ্কার দেওয়া ২৬৯ রানের লক্ষ্যে ব্যাট করছিল। শেষদিকে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি শুরু হয়। ৪৪ ওভার শেষে ক্রিজে থাকা বাউচারকে বার্তা পাঠানো হলো, ৪৫ ওভার শেষে বৃষ্টি আইনের লক্ষ্য ২২৯ রান। ওভারের পঞ্চম বলে ছয় মেরে সে লক্ষ্য পূরণ করে বাউচার রীতিমতো উদ্যাপন করে! শেষ বলটা দেখেশুনে ঠেকায়। কিন্তু ৪৫ ওভার শেষে জানা যায়, দক্ষিণ আফ্রিকার হিসাবে ছোট্ট ভুল হয়েছে। তারা এক রানে হেরে গেছে! এদিকে এবারের বিশ্বকাপেও বেশ কয়েকটি ম্যাচে বৃষ্টির বাগড়ায় পয়েন্ট ভাগাভাগি হয়েছে। না হলে হয়তো সেমিফাইনালের হিসাব অন্য রকমও হতে পারত।

মন্তব্য