kalerkantho

সোমবার । ২৬ আগস্ট ২০১৯। ১১ ভাদ্র ১৪২৬। ২৪ জিলহজ ১৪৪০

তোমাদের লেখা

থাপড়াও

সাজি শেহনাই

১৯ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



থাপড়াও

অঙ্কন : মানব

ক্লাসে খুব চেঁচামেচি হচ্ছে। মিস আসেননি। আসতে আরো পাঁচ মিনিট বাকি। বাইরে থেকে কেউ এসে দেখলে অবাক হয়ে ভাববে, এখানে এত চেঁচামেচি হচ্ছে কেন? আসলে কোনো কারণ নেই। এটা আমাদের নিত্যকার ঘটনা। ক্লাসের ৪০ জনের ৩৮ জনই বোধ হয় চিত্কার-চেঁচামেচি করছে। স্যাররা বহু বলে-কয়েও থামাতে পারেননি। এখনকার ছেলেপেলেরাই এ রকম। অথবা কে জানে, আগেও হয়তো এমনই ছিল।

ঘণ্টা পড়ার কিছুক্ষণ পরই ইংরেজি মিস এলেন। সবাই চুপ। কিন্তু ক্লাসের সবচেয়ে দুষ্টু ছেলে রাইয়ান বানরের মতো লাফাচ্ছে এখনো। কারণ একটু আগেই সে তার কলমটা খুঁজে পেয়েছে, যার মাথায় বানরের মতো একটা ছোট্ট পুতুল লাগানো আছে।

আজ মিসকে দেখে মনে হচ্ছে, তাঁর মেজাজ ভালো। হাতের ব্যাগটা টেবিলের ওপর রেখে চেনটা খুলে কী যেন খুঁজলেন। তারপর ডাকলেন রাইয়ানকে। রাইয়ান এগিয়ে গেল ডায়াসের দিকে। হঠাৎ দেখা গেল রাইয়ান উহ, আহ, ইহ করে চিত্কার করছে। মিস কিছু করছেন না, শুধু মুচকি মুচকি হাসছেন। কী ব্যাপার! মিসের আবার মাথাটাথা খারাপ হয়ে গেল না তো! আমাদের মতে, দুষ্টু ছেলে-মেয়েদের ক্লাস নিতে গিয়ে ওরকমটা হতেও পারে।

একটু পরে রাইয়ান এসে সিটে বসল। কেউ একটু শব্দও করল না। তার পরের ক্লাসেও কেউ কথাটা বলল না। টিফিন টাইমের ঘণ্টা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সবাই এসে জড়ো হলো রাইয়ানের কাছে। সবার একটাই প্রশ্ন—তোর কী হয়েছিল রে? পিঁপড়া কামড়েছিল? রাইয়ান বলল, না রে, আমার পিঠে কেউ ঠাস ঠাস মারছিল। কিন্তু কে মারছিল জানি না।

বলিস কী! আমরাও তো কাউকে দেখতে পাইনি। বলল টুম্পা।

নৌশি বলল, ভূত-প্রেত নাকি? রিয়ানা সঙ্গে সঙ্গে ঠোঁট উল্টাল, ধুৎ, ভূত-প্রেত বলে কিছু আছে নাকি?

আফিফা জানতে চাইল, আচ্ছা মিসের কী হয়েছিল? মিস ওরকম হাসছিল কেন? মমো কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, কী জানি!

সেকেন্ড টিফিনে আবার সবাই জড়ো হলো রহস্যের কিনারা করতে। তখন জেসমিন বলল, সে নাকি কিছুদিন আগে মিটিং চলার সময় টিচার্সরুমের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। সেখানে সফটওয়্যার, থাপ্পড়, শিক্ষামন্ত্রী—এ রকম কিছু শব্দ নাকি শুনতে পেয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে জয়নবও বলল—ঠিক, আমিও সেদিন ল্যাবের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় এ রকম কথা শুনেছি। ভেতরে বিজ্ঞান স্যারের সঙ্গে আরো কয়েকজন ছিলেন।

আমরা সবাই একমত হলাম, বিষয়টা গুরুতর এবং খতিয়ে দেখতে হবে। সবাই পরামর্শ করে শেষমেশ সিদ্ধান্তে এলো, সামিহাকে ল্যাবরেটরিরুম থেকে ঘুরে আসতে হবে। ওখানের ঘটনাটা কী জানা দরকার।

সামিহা ক্লাসের সবচেয়ে সাহসী মেয়ে। সে মোটেই গাঁইগুঁই করল না। পাঁচ মিনিটের মধ্যে ঘুরে এসে যা জানাল, তাতে আমাদের চক্ষু চড়কগাছ।

সামিহা বলল, থাপড়াও নামে একটা সফটওয়্যার তৈরি হয়েছে আমাদের ল্যাবে। পাতলা ইনভিজিবল বেতের সঙ্গে সেটা জুড়ে দেওয়া হয়েছে। সব টিচারের কাছে ছোট্ট রিমোট কন্ট্রোলার থাকে, যেটা দিয়ে এটাকে তাঁরা নিয়ন্ত্রণ করেন।

এবার আমরা বিষয়টা বুঝলাম। শিক্ষামন্ত্রী তো ছাত্রদের মারার নিয়মটা বন্ধ করে দিয়েছেন। কিন্তু রাইয়ানদের মতো দুষ্টু ছেলেদের কন্ট্রোল করা তো আর মুখের কথা নয়। তাই এ সফটওয়্যার চালু করেছেন টিচাররা। আগে সবাই মার খেয়ে খেয়ে মানুষ হতো। এখন তো আর সবাই মানুষ হচ্ছে না। হচ্ছে অন্য কিছু। তাই সবার মহাচিন্তা।

পুরো ব্যাপারটা বুঝে আমাদের মনটা বেশ খারাপই হলো। শুধু রাইয়ান বলল, ভাবিস না। সব ঠিক হয়ে যাবে।

পরদিন ক্লাসে গিয়ে আমরা সবাই চুপ করে বসে আছি। কিন্তু রাইয়ান এসে ঠিক আগের মতোই বাঁদরামি শুরু করল। এমনকি ইংরেজি মিস ক্লাসে আসার পরও সে কিঞ্চিৎ লম্ফঝম্ফ দিল। ব্যাপার কী? ওর কি ভয়ডর বলে কিছু নেই? কালই ওরকম থাপ্পড় খেল। তার পরও হুঁশ নেই। আজকে নিশ্চয়ই রামচড় খাবে।

কিন্তু না, ম্যাডামকে আজ বেশ মনমরা মনে হলো। তিনি রাইয়ানকে তো কিছু বললেনই না। এমনকি সারিতা যে পড়া বাদ দিয়ে ম্যাডামের একটা কার্টুন আঁকছে অঙ্ক খাতায়, তা-ও খেয়াল করলেন না। নীরবে ক্লাস নিয়ে চলে গেলেন।

টিফিনের সময় আবার আমরা ছেঁকে ধরলাম রাইয়ানকে, কী ব্যাপার রে।

রাইয়ান ভ্রু নাচিয়ে বলল, ভাইরাস, ভাইরাস।

মানে?

ল্যাবের সার্ভারে কে যেন ভাইরাস ঢুকিয়ে দিয়েছে। থাপড়াওসহ আরো অনেক সফটওয়্যারের বারোটা বেজে গেছে।

কিভাবে? একযোগে জিজ্ঞেস করলাম আমরা। একগাল হেসে রাইয়ান শুধু বলল, আমি কী করে বলব!

সামিহা অবশ্য একটা অনুমান করেছে। সে বলল, আচ্ছা, তোর বড় ভাই সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, তাই না? রাইয়ান কোনো জবাব দিল না। আগের মতোই হাসতে লাগল। এর মধ্যে লাবিবা খবর নিয়ে এলো, টিচার্সরুমে নাকি বেশ গোলমাল। সফটওয়্যার নষ্ট হওয়ায় অনেক টাকার ক্ষতি হয়েছে। আবার ওদিকে কে যেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে খবর দিয়েছে এই সফটওয়্যারের। শিক্ষামন্ত্রী নাকি প্রিন্সিপালকে তলব করেছেন। প্রিন্সিপাল খুব খেপে আছেন। তিনি নাকি শুরুতেই এসবের বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু বিজ্ঞান স্যারের অতি-উত্সাহে তৈরি করা হয়েছিল থাপড়াও। এখন? শিক্ষামন্ত্রীকে কে সামলাবে?

রাইয়ান ভেংচি কেটে ‘আমি কী জানি!’ বলে ফের বাঁদরামি শুরু করল।

ষষ্ঠ শ্রেণি, রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ, ঢাকা।

 

মন্তব্য