kalerkantho

শুক্রবার । ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৮ রবিউস সানি ১৪৪১     

কালবৈশাখী ওই আসছে ধেয়ে

লতিফুল হক

১৯ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



কালবৈশাখী ওই আসছে ধেয়ে

অঙ্কন : মাসুম

ট্রেনটা যখন টাঙ্গাইল স্টেশন ছাড়াল, তখনো ঝকঝকে আকাশ। কিন্তু কিছুদূর যেতে না যেতেই অন্ধকার হতে শুরু করল। আরিশা জানালার পাশে বসে একটা বই পড়ছিল। আলো কমে যাওয়ায় ঠিকমতো পড়া যাচ্ছিল না। আম্মু লাইটটা জ্বেলে দিলেন। আব্বু বললেন, কালবৈশাখী আসছে বোধ হয়। আরিশা কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকাল। মা-বাবার সঙ্গে আরিশা দাদুবাড়ি সিরাজগঞ্জ যাচ্ছে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই বাইরে একেবারে অন্ধকার হয়ে গেল। মনে হচ্ছে রাত, অথচ ঘড়িতে মাত্র ৪টা। আব্বু বললেন, ইস! একটুর জন্য আটকে গেলাম। আর আধ ঘণ্টায়ই পৌঁছে যেতাম। আরিশা ভাবল, বাইরে অন্ধকার হয়েছে, বৃষ্টিই না হয় আসবে। এ জন্য তারা আটকে যাবে কেন? ওর মনোভাব বুঝতে পেরেই আব্বু বললেন, কালবৈশাখী খুব ভয়ংকর। খুব অল্প সময়েই সব লণ্ডভণ্ড করে দেয়। আব্বুর কথা শেষও হলো না, প্রচণ্ড শব্দ করে বজ্রপাত হতে লাগল। সঙ্গে প্রচণ্ড বাতাস, পুরো ট্রেনটাই যেন কাঁপছিল। আরিশা ভয় পেয়ে মাকে জড়িয়ে ধরল। ট্রেনের গতি আগেই অনেক কমিয়ে দিয়েছিলেন চালক, এবার একটু ধাক্কার মতো দিয়ে সেটা দাঁড়িয়ে গেল। এরপর টানা ১০ মিনিট চলল ঝড়ের তাণ্ডবলীলা। সব শান্ত হলে বাবা মুখ খুললেন, ‘কালবৈশাখী আসলে বড় ধরনের ঝড়। যখন প্রচণ্ড ঝড়ের সঙ্গে বজ্রপাত হয়, তাকে কালবৈশাখী বলা হয়। সাধারণত মার্চ, এপ্রিল আর মে মাসে এই ঝড় বেশি হয়।’ ‘এই ঝড় কি শুধু আমাদের দেশেই হয়?’ জানতে চাইলেন আম্মু। সারা দুনিয়ায়ই নানা ধরনের ঝড় হয়। তবে এই বিশেষ ধরনের ঝড়টা, যাকে কালবৈশাখী বলছি, সেটা এ অঞ্চলেই বেশি হয়।’ বললেন আব্বু। ‘এই অঞ্চল মানে কী’—জানতে চাইল আরিশা। আব্বুর উত্তর তৈরিই ছিল, ‘মানে বাংলাদেশ ও ভারত। বিশেষ করে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা, বিহার, অন্ধ্র প্রদেশ, আসাম, ছত্তিশগড়, ঝাড়খণ্ডে এটা বেশি হয়। গেল বছর আমাদের সাকিব আল হাসান প্রচণ্ড কালবৈশাখীর কবলে পড়েছিল, মনে নেই?’ আরিশার সবচেয়ে প্রিয় খেলোয়াড় সাকিব। তিনি এমন একটা বিপদের কবলে পড়েছিলেন, আর আরিশা সেটা জানে না বলে মনে মনে একটু খারাপই লাগল বেচারির। বাবা জানালেন ঘটনাটা—গেল বছর ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ চলছে। সানরাইজার্স হায়দরাবাদের হয়ে খেলতে যাচ্ছিলেন সাকিব। কিন্তু মাঝপথে তাঁদের বিমান পড়ে প্রচণ্ড কালবৈশাখীর কবলে। বিপদ বুঝে বিমান নির্ধারিত গন্তব্যে না গিয়ে ফিরে আসে। পরে আবহাওয়া স্বাভাবিক হলে ফের যাত্রা করে।

হঠাৎ এমন ঝড়ের কারণ কী? এটা মার্চ-এপ্রিলেই কেন হয়—আরিশার প্রশ্ন যেন শেষই হয় না। এবার বাবা নন, উত্তর এলো পাশের সিটে বসে থাকা বয়স্ক এক ভদ্রলোকের কাছ থেকে। এতক্ষণ যিনি একটা ইংরেজি বই পড়ছিলেন। আরিশার দিকে তাকিয়ে বললেন, শীতকাল শেষে যখন প্রকৃতি অত্যধিক গরম হয়, তখনই মুশকিলটা হয়। বাতাস—যাকে বলে পাগলা হয়ে ওঠে। গরম বাতাস সোজা ওপরে উঠে যায়, এরপর শীতল হয়ে কিউমুলাস মেঘ সৃষ্টি করে। এই কিউমুলাস মেঘ আবার বড্ড বেয়ারা। এই মেঘগুলো মিলেই কিউমুলোনিম্বাস নামের ভীষণ কালো মেঘ গঠন করে। এরাই বজ্রঝড় তৈরি করে। সাধারণ ঝড়ের সঙ্গে কালবৈশাখীর পার্থক্য হচ্ছে, এ ঝড়ের পুরোটা সময় বিদ্যুৎ চমকায় ও বজ্রপাত হয়। একটানা বলে থামলেন ভদ্রলোক। সবার সঙ্গে তাঁর পরিচয় হলো। নাম অমিয় চক্রবর্তী। জানা গেল, তিনি আবহাওয়া অধিদপ্তরের সাবেক কর্মকর্তা। ঝড় নিয়ে আলাপ ভালোই জমে উঠল। এর আগেই অবশ্য ট্রেন ছেড়ে দিয়েছিল। হালকা বৃষ্টি থাকলেও আকাশ পরিষ্কার হয়ে গেছে। বঙ্গবন্ধু সেতুর পূর্ব স্টেশনে এসে যাত্রী নামা-ওঠার জন্য ট্রেন থামল। একটু সামনেই নদীর পার ঘেঁষে থাকা গাছগুলো দুলছে। বৃষ্টির পর দেখতে ভারি মনোরম লাগছে। কয়েকটি গাছ উপড়ে গিয়ে রাস্তার পাশে পড়েছে।

ঝড় নিয়ে আলোচনায় একটু ছেদ পড়ল, মা সবাইকে ফ্লাস্কে রাখা চা দিলেন। বাবা বললেন, কালবৈশাখীর পূর্বাভাস হলো ভীষণ কালো মেঘ। ওই মেঘ দেখা গেলেই গ্রামে সাড়া পড়ে যায়। রাখালরা গরু নিয়ে বাড়ির পথ ধরে, জেলেরা নৌকা ভেড়ায়। আরিশা বিজ্ঞান পছন্দ করে। মেঘের কিউমুলোনিম্বাস নামটি তার বেশ মনে ধরেছে। কয়েকবার বলতে গিয়ে সে কিউকাম্বারের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলল। সবাই একচোট হেসে নিল। অমিয় চক্রবর্তী বললেন, কালবৈশাখীর তিনটি পর্যায়। প্রথম হলো কিউমুলাস, এই সময় মেঘ ঘনীভূত হয়, পরের ধাপে সেটা পূর্ণতা পায়। শেষ পর্যায়ে বিচ্ছুরণ ঘটে। আরিশা বলল, ‘আবহাওয়াবার্তায় শুনি, অমুক দিক থেকে অমুক দিকে ঝড় বয়ে যাবে। কালবৈশাখী কোন দিক থেকে হয়?’ ‘দারুণ প্রশ্ন!’ এবার উত্তর দিলেন মা। বললেন, কালবৈশাখীর ইংরেজি নামটা বললেই সেটা বুঝতে পারবে। এই ঝড়কে ইংরেজিতে নর্থ ওয়েস্টার বলে। ‘উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে হয় বলে।’ আরিশার চোখে কৌতূহল। ‘ইয়েস’ বলে মেয়েকে আদর করে দিলেন মা। অমিয় সাহেব বলেন, এই ঝড়ের সময় বাতাসের গতিবেগ সাধারণত ঘণ্টায় ৮০ থেকে ১০০ কিলোমিটার থাকে। বড় ধরনের ঝড়ের ক্ষেত্রে আরো বেশি হয়। হঠাৎ খুব শীত করতে থাকে, তাপমাত্রা চার থেকে পাঁচ ডিগ্রি কমে যায়। বাবা বললেন, কালবৈশাখী সাধারণত ১০ থেকে ১৫ মিনিট হয়। তবে অল্প সময় হলেও ক্ষয়ক্ষতি হয় ব্যাপক। মা বললেন, গ্রামেই ক্ষতি বেশি হয়। কৃষক বা জেলে, যারা মাঠে কাজ করে, তাদের অনেকেই বজ্রপাতে মারা যায়। ‘শহরেও ক্ষতি কম কিছু হয় না।’ বললেন অমিয়। এই তো গেল বছরই কলকাতা শহরে ১৩ মিনিটের কালবৈশাখী হয়েছিল। যাতে গুনে গুনে ১৩ জন মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল। গাছ উপড়ে, বিলবোর্ড পড়ে বা বজ্রপাতে অনেকে মারা যায়। বললেন বাবা। ফুলের টব পড়েও দুর্ঘটনা হতে পারে। বলল আরিশা। সবার মনে পড়ল, কয়েক দিন আগেই বাসার দারোয়ান আহত হয়েছে পাশের বাড়ির ছাদ থেকে পড়া টবের আঘাতে। ভাগ্যিস মাথায় পড়েনি, তাহলে খুব মুশকিল ছিল—মন্তব্য করলেন অমিয়। ‘কিন্তু বাবা, ঝড় তো যেকোনো সময় হতে পারে। তখন তো মানুষ বাইরেও থাকতে পারে। তখন কী হবে?’ প্রশ্ন আরিশার। বাবার হয়ে উত্তরটা দিলেন অমিয়, বাইরে থাকলে প্রথমেই খোলা জায়গা ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে হবে। যেমন ধরো রাস্তায় বা ফুটপাতে থাকলে উচিত কোনো দোকান, বাড়ির গ্যারেজ বা মার্কেটে ঢুকে পড়া। বৈদ্যুতিক খুঁটি, গাছ, পানি থেকেও দূরে থাকা উচিত। কারণ এগুলোতে বজ্রপাত হয় বেশি। গাড়িতে থাকলে গাড়ির সঙ্গে শরীর যেন স্পর্শ না করে, সে দিকেও খেয়াল রাখা দরকার।

ঘরে থাকলেও তো অনেক সতর্ক থাকতে হয়, তাই না—প্রশ্নটা করলেন আরিশার মা। অমিয় বললেন, অবশ্যই। সিঁড়ি, দরজা, জানালা থেকে দূরে থাকা উচিত। বৈদ্যুতিক সুইচসহ টিভি, কম্পিউটার বন্ধ রাখতে হবে। মোবাইল ফোনেও কথা বলা ঠিক নয়। উফ! এ তো দেখি ভয়ংকর ঝড়, মন্তব্য আরিশার। বাবা বললেন, এবার কিন্তু অনেক কালবৈশাখী হতে পারে। নিজের হাতের পত্রিকাটা নিয়ে মেলে ধরলেন। আবহাওয়াবিষয়ক এক বিজ্ঞপ্তি থেকে পড়ে শোনালেন, ‘এপ্রিল মাসে স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা বেশি বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা আছে। দেশের উত্তর থেকে মধ্যাঞ্চল পর্যন্ত দুই-তিন দিন মাঝারি বা তীব্র কালবৈশাখী, দেশের অন্যত্র পাঁচ-ছয় দিন হালকা থেকে মাঝারি কালবৈশাখী হতে পারে।’ সবাইকে সাবধানে থাকতে হবে। বললেন অমিয়।

দেখতে দেখতে ট্রেন বঙ্গবন্ধু সেতু পার হয়ে শহীদ এম মনসুর আলী স্টেশনে দাঁড়ালো। এবার নামতে হবে। অমিয় চক্রবর্তীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আরিশারা নেমে গেল। বাইরে এসে আকাশের দিকে তাকাতেই আরিশা দেখল, ফের কালো মেঘ করেছে। বাবা বললেন, ‘এই রে আবার বুঝি কালবৈশাখী আসবে!’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা