kalerkantho

রবিবার । ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯। ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৭ রবিউস সানি                    

সম্ভাবনার পর্যটন খাত ‘ছন্দহীন’

দেশের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে প্রতিবছর ভ্রমণ করছে প্রায় ৯০ থেকে ৯৫ লাখ পর্যটক। এর মধ্যে বিদেশি পর্যটক মাত্র ২ শতাংশ চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে ভ্রমণ করেছে এক লাখ ৮৯ হাজার ৮৮৭ জন বিদেশি। এর মধ্যে প্রকৃত পর্যটক কত তার পরিসংখ্যান নেই। গত বছর বাংলাদেশে ভ্রমণে এসেছিল প্রায় দুই লাখ ৬৮ হাজার বিদেশি ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের সূচকে পাঁচ ধাপ এগিয়ে ১২৫ থেকে ১২০ নম্বরে উঠে এসেছে বাংলাদেশ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে আকর্ষণ হারিয়েছে প্রধান পর্যটন গন্তব্যগুলো পর্যটন পণ্য প্রতিষ্ঠা ও বিপণনের অভাবে পর্যটক আসছে না অর্থনীতিতে পর্যটন খাতের অবদান ১৬ হাজার কোটি টাকা প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে বিদেশ ভ্রমণে যায় ১৫ লাখ

মাসুদ রুমী   

১২ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সম্ভাবনার পর্যটন খাত ‘ছন্দহীন’

বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার, সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার কুয়াকাটা, প্রবালদ্বীপ সেন্ট মার্টিনস, বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন, নিঝুম দ্বীপ, চা বাগান, নদী, পাহাড়, হাওর ও পুরাকীর্তিসহ নানা বৈচিত্র্যপূর্ণ পর্যটন আকর্ষণে ভরপুর বাংলাদেশ। এসব পর্যটনকেন্দ্রে প্রতিবছর ভ্রমণ করছে প্রায় ৯০ থেকে ৯৫ লাখ পর্যটক। এর মধ্যে বিদেশি পর্যটক মাত্র ২ শতাংশ। অদক্ষতা ও অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে বিদেশি পর্যটক আকর্ষণে বিশ্বের সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা দেশগুলোর তালিকায় পড়েছে বাংলাদেশ।

মার্কিন উন্নয়ন সংস্থা ইউএসএআইডির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ভ্রমণে আসা বিদেশি নাগরিকদের সবচেয়ে বড় অংশই আসে তৈরি পোশাক খাতের ব্যাবসায়িক প্রতিনিধি হিসেবে, যা মোট বিদেশির ৪০ শতাংশ। এর পরই রয়েছে উন্নয়ন খাতের বিভিন্ন কাজে আসা বিদেশিরা। মোট বিদেশির মধ্যে এদের হার ২৫ শতাংশ। এ ছাড়া বেসরকারি খাতে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগসংশ্লিষ্ট ও বিভিন্ন দূতাবাসসংশ্লিষ্টরা রয়েছে ১৫ শতাংশ করে। বিদেশিদের মধ্যে বাকি ৫ শতাংশ বাংলাদেশে আসছে প্রকৃত পর্যটক হিসেবে।

বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ড জানায়, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে (জানুয়ারি-জুলাই) বাংলাদেশ ভ্রমণ করেছে এক লাখ ৮৯ হাজার ৮৮৭ জন বিদেশি। এর মধ্যে প্রকৃত পর্যটক কত তার পরিসংখ্যান নেই। গত বছর বাংলাদেশে ভ্রমণে এসেছিল প্রায় দুই লাখ ৬৮ হাজার বিদেশি। এর আগে ২০১৭ সালেও প্রায় একই সংখ্যক বিদেশির আগমন ঘটে বাংলাদেশে।

এদিকে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ২০১৯ সালের ট্র্যাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কমপিটিটিভনেস রিপোর্টে নিরাপত্তা ও সুরক্ষায় সবচেয়ে বেশি উন্নতির কারণে যদিও পাঁচ ধাপ এগিয়ে ১২৫ থেকে ১২০ নম্বরে উঠে এসেছে বাংলাদেশ। বিমান পরিবহন অবকাঠামো, নিরাপত্তা, সংস্কৃতি, বাসস্থান, টাকার মান ও স্থিতিশীল ভ্রমণের সুযোগসহ ৯০টি মানদণ্ডের মধ্যে অনুন্নত পর্যটন সেবা অবকাঠামো, বায়ুদূষণ ও জলাবদ্ধতা বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্জনকে ম্রিয়মাণ করেছে। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পর্যটন খাতের কোনো মাস্টারপ্ল্যান বা মহাপরিল্পনা না থাকায় অপরিকল্পিত উন্নয়ন হয়েছে পর্যটনের। এতে আকর্ষণ হারিয়েছে প্রধান পর্যটন গন্তব্যগুলো। এ ছাড়া সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও পর্যটন পণ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা ও বিপণন করতে না পারার কারণে এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে সেভাবে পর্যটক আসছে না।

জানতে চাইলে ট্যুরিজম ডেভেলপার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টিডাব) চেয়ারম্যান সৈয়দ হাবিব আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাংলাদেশে পর্যটনের অনেক সম্ভাবনা থাকলেও তা কাজে লাগাতে যে কর্মতৎপরতা ও পেশাদারিত্ব প্রয়োজন তা নেই। এ কারণে এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় আমরা পর্যটন খাতে পিছিয়ে আছি। আমাদের হোটেলগুলোর এখনো সঠিকভাবে স্ট্যান্ডার্ড নির্ধারণ করা যায়নি। অনেকে টু স্টার মানের না হলেও ফাইভ স্টার হিসেবে কার্যক্রম চালাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে তদারকি বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে পর্যটকদের আরো ভালো সেবা দেওয়ার জন্য যেসব সুযোগ-সুবিধা দরকার, যেগুলো অন্যান্য দেশে আছে তা নিশ্চিত করতে হবে।’ 

তিনি বলেন, ‘পর্যটন উন্নয়নে আমাদের কোনো মাস্টারপ্ল্যান না থাকায় এই খাতের পরিকল্পিত অবকাঠামো গড়ে উঠছে না। ফলে পর্যটন খাত কার্যত ছন্দহীন। এ ছাড়া জাতীয় পর্যটন কাউন্সিলে বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিত্ব না থাকায় এবং কাউন্সিলের নিয়মিত সভা ও তদারকি না থাকায় এই খাতের স্থবিরতা কাটছে না। প্রতিটি দেশের পর্যটনের উন্নয়নে জাতীয় পতাকাবাহী বিমান সংস্থার যে ভূমিকা থাকে আমাদের দেশে বিমানের ক্ষেত্রে তা একেবারেই অনুপস্থিত।’

জানতে চাইলে দেশের পর্যটন খাতের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) সভাপতি তৌফিক উদ্দীন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘২০১৬ সালে স্বাধীনতার পর প্রথমবারের মতো তিন বছরব্যাপী (২০১৬-১৮) পর্যটন বর্ষ ঘোষণা করা হলো। তৎকালীন মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন ১০ লাখ পর্যটক আনার ঘোষণা দিলেন, কিন্তু আমরা পর্যটকের দেখা পেলাম না। সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা দাবি করছেন বিদেশি পর্যটক আগমন বেড়েছে, কিন্তু বাস্তবতা হলো আমাদের অনেক ট্যুর অপারেটর ব্যবসা চালাতে পারছেন না। হতাশ হয়ে তাঁরা অনেকেই এখন অন্য ব্যবসায় চলে যাচ্ছেন।’

ট্যুর অপারেটরস অব বাংলাদেশ (টোয়াব)-এর পরিচালক ও জার্নি প্লাসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তৌফিক রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের ইনবাউন্ড ট্যুরিজমের কী দুরবস্থা সে সম্পর্কে কর্তাব্যক্তিরা কোনো খবর রাখেন বলে মনে হয় না। এখনো পর্যন্ত আমাদের ওপর বিভিন্ন দেশের যেসব ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা, সেগুলো প্রত্যাহার করা হয়নি। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে তেমন তৎপরতা দেখা যায় না।’

পর্যটন খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘সব ধরনের উন্নয়নে পর্যটন খাতকে সম্পৃক্ত বা মাথায় রাখতে হবে। প্রতিবেশী ভারতের অন্যতম যোগাযোগব্যবস্থা রেলপথ। উন্নত রেল যোগাযোগ ও চাহিদার কারণে বিশাল দেশটিতে অন্তত পাঁচ দিন আগেও মেলে না রেলের টিকিট। ভারতে বিদেশিদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে আকাশপথ, সড়কপথেও। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো সে ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।’

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, জিডিপিতে পর্যটনের অবদান ২ শতাংশ ছাড়িয়েছে। তবে ভালো হোটেল, দক্ষ ও মানসম্মত সেবার অভাব, বিদেশি পর্যটকদের জন্য বিনোদনের অভাব, নিরাপত্তাহীনতা, যোগাযোগ ও যাতায়াত সমস্যা, অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং সরকারের সুনজর ও পরিকল্পনার অভাবে এ খাতের সম্ভাবনা নষ্ট হচ্ছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর এক জরিপে দেখা গেছে, অর্থনীতিতে পর্যটন খাতের অবদান ১৬ হাজার কোটি টাকা। প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে বিদেশে যায় ১৫ লাখ। তবে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে পর্যটন আগমনের ওপর বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের (বিটিবি) এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিদেশি পর্যটকদের ২৫ শতাংশই যায় সিলেট ও শ্রীমঙ্গলে। এ ছাড়া ২৩ শতাংশ কক্সবাজার, ১৭ শতাংশ পার্বত্য জেলা, ১০ শতাংশ সুন্দরবন, ৭ শতাংশ সেন্ট মার্টিনস, বাগেরহাটে ৬ শতাংশ এবং বিভিন্ন পুরাকীর্তি দেখতে ২ শতাংশ পর্যটক উত্তরবঙ্গ অঞ্চলে ভ্রমণ করে। এদিকে ঢাকার বিভিন্ন পর্যটন স্পটগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে যথাক্রমে জাতীয় সংসদ ভবন (৫৭ শতাংশ), নিউ মার্কেট (৫৩ শতাংশ), লালবাগ কেল্লা, ঢাকেশ্বরী মন্দির (৪৪ শতাংশ), সদরঘাট (৩২ শতাংশ), শাঁখারীবাজার ২৪ শতাংশ, বিভিন্ন মসজিদ (২৮ শতাংশ) এবং অন্যান্য স্পটে ৩ শতাংশ।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, পর্যটন খাতের অবকাঠামো উন্নয়নের অংশ হিসেবে কক্সবাজারে ২৫টি প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। অবকাঠামোগত এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাত ও পিপিপির মাধ্যমে বিনিয়োগ করা হবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা