kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৩০ জানুয়ারি ২০২০। ১৬ মাঘ ১৪২৬। ৪ জমাদিউস সানি ১৪৪১     

আমাদের কোনো শিক্ষার্থীকে কোচিং বা প্রাইভেট পড়তে হয় না

দেশের অন্যতম সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্কলারস স্কুল অ্যান্ড কলেজ। প্রতিষ্ঠানটির প্রিন্সিপাল ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. আবদুল হান্নান এর সঙ্গে কথা বলেছেন শায়েখ হাসান

৮ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শুরুর গল্প বলুন।

 

বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী জনাব মীর শামসুজ্জোহা এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা জনাব মীর শামসুল হুদা হচ্ছেন এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মূল স্বপ্নদ্রষ্টা। তাঁদেরই পৃষ্ঠপোষকতা ও সক্রিয় অনুপ্রেরণায় এবং জনাব মো. আবুল কাসেমের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও নিরলস পরিশ্রমের ফসল ‘স্কলার্স স্কুল অ্যান্ড কলেজ’। জনাব মো. আবুল কাসেম ২০০১ সালে সোবহানবাগে দ্বিতলবিশিষ্ট ভাড়া বাড়িতে মাত্র দুজন শিক্ষার্থী নিয়ে এই প্রতিষ্ঠানের গোড়াপত্তন করেন। পরবর্তী বছর প্রতিষ্ঠানটি ধানমণ্ডি ৭/এ-তে স্থানান্তরিত হয়। বাংলাদেশে শুধু ইংরেজি মাধ্যমে ন্যাশনাল কারিকুলামে শিক্ষা প্রদানের লক্ষ্য নিয়ে শুরু হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এই প্রতিষ্ঠানটিই সর্বপ্রথম (The Pioneer English Version School & College in Bangladesh)। প্রতিষ্ঠানটি সম্পূর্ণ স্ব-অর্থায়নে পরিচালিত।

 

যেহেতু ইংরেজি মাধ্যমে জাতীয় কারিকুলাম শিক্ষাদানে স্কলার্স স্কুল অ্যান্ড কলেজ পাইওনিয়ার, সেহেতু শুরুর দিকে প্রতিষ্ঠানটিকে অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এগোতে হয়েছে। আমাদের দেশে ইংরেজি মাধ্যম এবং ন্যাশনাল কারিকুলাম শুধু বাংলা ভার্সনেই পরিচালিত হওয়ায় অভিভাবক-শিক্ষার্থী এ দুটির সঙ্গেই ছিলেন অভ্যস্ত ও পরিচিত। সুতরাং ইংরেজি ভার্সনে জাতীয় কারিকুলাম শুরু করা এবং অভিভাবক-ছাত্র-ছাত্রীদের এর সঙ্গে সম্পৃক্ত করা ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এর সঙ্গে ছিল ইংরেজি ভার্সনের বইয়ের অপ্রতুলতা এবং ইংরেজি ভার্সনে পাঠদানে সক্ষম শিক্ষক স্বল্পতা। অনেক ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকরা বই ভাষান্তর করে শ্রেণি কার্যক্রম চালিয়েছেন।

 

শুরুতে শিক্ষক-শিক্ষার্থী কেমন ছিল?

মাত্র দুজন শিক্ষার্থী নিয়ে এ প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু হয়। শুরুর কয়েক বছরের মধ্যেই প্রতিষ্ঠানটির সুযোগ্য পরিচালনা এবং পাঠ প্রণয়নের গুণগত মান ও পদ্ধতির প্রতি সচেতন অভিভাবকরা আকৃষ্ট হওয়ায় উত্তরোত্তর শিক্ষার্থীসংখ্যা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়তে থাকে। বর্তমানে শিক্ষার্থীসংখ্যা সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি। আমি মনে করি, শুধু ইংরেজি ভার্সনে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে এত অধিকসংখ্যক শিক্ষার্থী নেই। আমাদের শিক্ষক-শিক্ষিকার সংখ্যাও উল্লেখ করার মতো, যার অনুপাত প্রায় ১:২০।

 

আপনাদের কোথায় কয়টি শাখা আছে?

ধানমণ্ডি ৭/এ-তে দুটি ক্যাম্পাসে তিনটি ভবন এবং ১১/এ-তে একটি ভবন—অর্থাৎ আমাদের মোট তিনটি ক্যাম্পাসে চারটি ভবন আছে। সকাল ০৮০০ ঘটিকা থেকে এ ক্যাম্পাসগুলোতে শ্রেণিবিভাজন পদ্ধতিতে বিকেল ০৪৩০ ঘটিকা পর্যন্ত পাঠদান পরিচালনা করা হয়। উল্লেখ্য, আমাদের তিনটি ক্যাম্পাসই একক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে পরিচালিত হয়।

অন্য স্কুলগুলোর তুলনায় আপনাদের প্রতিষ্ঠানের বিশেষত্ব কোথায়?

এ প্রতিষ্ঠানের রয়েছে কিছু ব্যতিক্রমধর্মী বিশেষত্ব, যেমন—স্কুল ও কলেজ শাখায় ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য আলাদা ভবনের সুব্যবস্থা। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত শ্রেণিকক্ষ, সমৃদ্ধ কম্পিউটার ল্যাব, মানসম্মত বিজ্ঞানাগার ও পাঠাগার। নিরবচ্ছিন্ন পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ। পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ খাবার পানির ব্যবস্থা। আধুনিক ও স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট সুবিধা। বাচ্চাদের সার্বক্ষণিক দেখাশোনার জন্য পর্যাপ্তসংখ্যক মহিলা কর্মচারীর সুব্যবস্থা। হেলথ ও হাইজিনের ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করা। ঢাকা মহানগরীর সর্বত্র পর্যাপ্তসংখ্যক নিজস্ব পরিবহন সুবিধা। প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের যথাসময়ে আগমন ও প্রস্থান কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা। শিক্ষার্থীদের দৈনিক উপস্থিতি নিশ্চিতকরণে নিয়মিত তদারকির ব্যবস্থা। ফোনকলের মাধ্যমে শ্রেণিশিক্ষক কর্তৃক নিয়মিত শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতির কারণ লিপিবদ্ধকরণ এবং যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করে শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের পাঠ মূল্যায়ন। শারীরিকভাবে পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের বিশেষ যত্নের ব্যবস্থা। প্রতি শনিবার এবং অন্য দিনগুলোতে অমনোযোগী ও পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের বিশেষ পাঠদানের ব্যবস্থা। শিক্ষক-অভিভাবকদের পর্যায়ক্রমিক মতবিনিময়সভা।

 

কেন একজন অভিভাবক তাঁর সন্তানকে আপনার প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করাবেন?

এরই মধ্যে এ প্রশ্নটির উত্তর চলে এসেছে। সংক্ষেপে বলব, ধানমণ্ডির মতো অভিজাত এলাকায়, যার আশপাশে রয়েছে বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সেখানে প্রায় সাড়ে তিন হাজারের অধিক শিক্ষার্থীই এ প্রতিষ্ঠানের গুণগত মানের পরিচায়ক বা বহিঃপ্রকাশ বলে আমি মনে করি।

 

শতভাগ পাসের জন্য দেখা যায়, পড়াশোনার চাপে শিক্ষার্থীরা আত্মকেন্দ্রিক—এটিকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করবেন?

বিষয়টি ব্যাখ্যাসাপেক্ষ। আমাদের সময়ে পড়াশোনার এত চাপ হয়তো ছিল না। প্রাথমিকে ও নিম্ন মাধ্যমিকে পাবলিক পরীক্ষা ছিল না। বর্তমানে এ দুটি পরীক্ষা বাধ্যতামূলক হওয়ায় পড়াশোনার একটু বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়েছে; আপাতদৃষ্টিতে এমনটিই মনে হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক গ্লোবাল বিশ্বে নিজেদের টিকিয়ে রাখার জন্য ছেলে-মেয়েদের শুরু থেকেই শিক্ষার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। কোমলমতি শিশুদের ওপর চাপ সৃষ্টি হয় এমন কার্যক্রম থেকে আমরা বিরত থাকতে সদা সচেষ্ট। তাদের বয়স ও ধারণক্ষমতার বিষয়টি সক্রিয় বিবেচনায় নিয়ে আমরা পাঠ পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করে থাকি। স্মার্টফোনের মোহ, আকাশ সংস্কৃতির আগ্রাসন, মাদকের মারণছোবল ইত্যাদি থেকে শিক্ষার্থীদের দূরে রাখতে পাঠ্য বইয়ের পাশাপাশি খেলাধুলাসহ অন্যান্য সহপাঠ্য বিষয়ে তাদের সম্পৃক্ত করার জন্য আমরা বছরব্যাপী বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকি। আমি বলব—বাচ্চাদের আত্মকেন্দ্রিক হওয়ার বিষয়টি আপেক্ষিক। আমাদের সময়ে মোবাইল ফোন, টেলিভিশন, ইন্টারনেটসহ অন্যান্য আধুনিক উপকরণ ছিল না। সে সময় পাঠদানের পদ্ধতি ও পাঠক্রম ছিল ভিন্নতর। ক্লাস কার্যক্রমের বাইরে প্রাতিষ্ঠানিক তেমন কোনো কার্যক্রম ছিল না। স্কুলের পড়াশোনা এবং মাঠে খেলাধুলা ছিল তখনকার ছেলেবেলার ইতিহাস। সুতরাং পড়াশোনার একাল-সেকালের মধ্যে রয়েছে বিস্তর ব্যবধান।

 

আপনাদের বিগত দিনের অর্জন সম্পর্কে আলোকপাত করুন।

সময়ের ব্যবধানে এ প্রতিষ্ঠান বর্তমানে দেশের স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে নিজের স্থান তৈরি করে নিয়েছে। আমাদের শিক্ষার্থীরা এরই মধ্যে দেশে ও বিদেশে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থায় গুরুত্বপূর্ণ উচ্চপদগুলোতে কর্মরত আছে এবং একইভাবে দেশে ও বিদেশের বিভিন্ন খ্যাতনামা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত আছে।

 

একাডেমিক পড়াশোনার বাইরে আর কোন কোন সুযোগ-সুবিধা প্রদান করেন?

শুধু বইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে শিশুদের মেধা বিকাশ কখনো সম্ভব নয়—এ বিষয়টি স্কলার্স স্কুল অ্যান্ড কলেজ বিশেষভাবে খেয়াল রাখে। বছরে একবার দুই দিনের জন্য আমরা সুলতানা কামাল মহিলা ক্রীড়া কমপ্লেক্স ভাড়া নিয়ে বার্ষিক ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করে থাকি। তবে আমরা সারা বছরই ইনডোর গেমসসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান, প্রতিযোগিতা, কালচারাল প্রগ্রামের আয়োজন করি। এ ছাড়া যথাযোগ্য মর্যাদায় সব জাতীয় দিবসগুলো পালন করে থাকি। প্রতিবছর অসচ্ছল বা অপারগ শিক্ষার্থীদের জন্য অনুদান বাবদ একটি বড় অঙ্কের টাকা আমরা ব্যয় করি। যেমন—শুধু চলতি বছরের (২০১৯) জানুয়ারিতেই আমরা ভর্তি বাবদ আনুমানিক ১০ লাখ টাকা ছাড় দিয়েছি।

 

আপনাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে বলুন।

আমাদের অন্যতম ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হচ্ছে প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণ করা। চলতি বছর মিরপুর-১৪ নম্বর সেকশনে ১.৮৫ একর জমি সরকারিভাবে স্কলার্স স্কুল অ্যান্ড কলেজকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে জমির রেজিস্ট্রি সম্পন্ন হয়েছে। আমরা প্রত্যাশা করছি, অচিরেই জমিটি সরেজমিনে বুঝিয়ে দেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ভবন নির্মাণের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের খেলাধুলার জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ তৈরি হবে; তৈরি হবে প্রকৃত অর্থে একটি শিক্ষাবান্ধব পরিবেশের।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা