kalerkantho

রবিবার । ৪ আশ্বিন ১৪২৮। ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১১ সফর ১৪৪৩

প্রযুক্তি ব্যবহারে লিঙ্গবৈষম্য

২৫ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



প্রযুক্তি ব্যবহারে লিঙ্গবৈষম্য

হতে পারে করোনার লকডাউন আমাদের অনেক কিছু নতুন করে শিখতে বাধ্য করেছে, বিশেষ করে প্রযুক্তি। নিজেদের প্রয়োজনেই প্রযুক্তির নতুন কিছু মাধ্যমের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়েছে সারা বিশ্বের মানুষকে। তবে আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন বলছে, বিশ্বের অনেক দেশে এখন প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে লিঙ্গবৈষম্য কাজ করছে। বিস্তারিত আল সানির কাছে

ভারতের সবচেয়ে দরিদ্র রাজ্য হিসেবে বিহারের নামটা সবার প্রথমেই চলে আসে। গত বছরের হিসাব মতে, ১০ কোটি বা তার কিছু বেশি মানুষের বসবাস এই বিহারে। আর ভারতের এই অঙ্গরাজ্যে মোবাইল ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছয় কোটি। ইন্টারনেট ব্যবহারের অবস্থা আরো শোচনীয়। চার কোটি মানুষের হাতে পৌঁছেছে ইন্টারনেট ব্যবস্থা। বিহারে প্রতিটি পরিবারে সাধারণত একটি মোবাইল ফোন থাকে, তবে তা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বাড়ির পুরুষদের দখলে। সমাজব্যবস্থা পুরুষের হাতে থাকায় তারা দিনের বেলায় বাড়ির বাইরে কাজ করে আর মহিলাদের অবস্থান বাড়ির ভেতরে। ফলে দেখা যায় বাড়ির মহিলাদের হাতের কাছে মোবাইল এক প্রকার থাকেই না। এ রকম একটি পরিবারের সদস্য নির্মলা কুমারী। মোবাইল ফোন প্রথম হাতে পান তিনি ২০১৮ সালে। এরপর খুব একটা ব্যবহার করা হয়নি তাঁর। কিন্তু গত বছর থেকে সারা রাজ্যে লকডাউন থাকার কারণে বাড়ির পুরুষ সদস্যরা বাইরে যেতে পারত না। ফলে মোবাইলগুলো বাড়িতেই থাকত। এই সুযোগে নির্মলা টুকিটাকি কাজ করতে শুরু করেন মোবাইলে। আজ এক বছর পর তিনি একজন দক্ষ মোবাইল ফোন ব্যবহারকারী। প্রথম দিকে মোবাইলে তিনি প্রসূতি মেয়েদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও করোনার খবরাখবর নিতে শুরু করেন। এরপর সেসব তথ্য নিজের গ্রামের অন্য প্রসূতি মায়েদের কাছে ছড়িয়ে দিতে থাকেন।

বিহারে মোবাইল ব্যবহারে নারী-পুরুষের মধ্যে এ ধরনের বৈষম্য করোনাকালে কিছুটা কমতে শুরু করলেও সবচেয়ে বেশি বৈষম্য দেখা যায় আফ্রিকা মহাদেশে। আফ্রিকায় মাত্র ৩৭ শতাংশ পুরুষ ও ২০ শতাংশ নারী ইন্টারনেট সুবিধা পায়। বৈষম্যের এই যাত্রা ব্যাপক মাত্রায় শুরু হয় ২০১৩ সাল থেকে। আফ্রিকার দেশ ঘানায় নারীদের একটি প্রযুক্তি শিক্ষাকেন্দ্র ‘সোরোনকো একাডেমি’। এর প্রতিষ্ঠাতা রেজিনা হোনু ডিজিটাল প্রযুক্তিতে নারীদের অংশগ্রহণের ব্যাপারে করোনাকে কিছুটা আশীর্বাদ হিসেবেই দেখছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠানে করোনা মহামারি শুরুর আগে ১০০ থেকে ২০০ নারী অনলাইনে সাইনআপ করত। কিন্তু মহামারি আসার পর এই সংখ্যা এখন দুই হাজার অতিক্রম করেছে। রেজিনার কাছে ঘানায় মেয়েদের প্রযুক্তিতে বেশি পিছিয়ে পড়ার কারণ তাদের পরিবার। তাঁর মতে, ঘানার অনেক মেয়ে স্কুলে না যাওয়া পর্যন্ত কম্পিউটার স্পর্শও করতে পারে না। কারণ পরিবারের সদস্যরা তাদের ইন্টারনেট ব্যবহার ভালো চোখে দেখে না। প্রথম দিকে সামাজিক দূরত্ব মেনে মানুষকে প্রযুক্তিতে পারদর্শী করা বেশ কঠিন মনে হয়েছিল রেজিনার কাছে, বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের উন্নত স্মার্টফোন না থাকলে ভিডিওকলে প্রযুক্তি শিক্ষা দেওয়া যথেষ্টই কঠিন। তবে তিনি হাল ছাড়েননি। সমস্যা সমাধানে এবং প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত থাকতে তিনি আপাতত হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রাম ব্যবহার করার পরামর্শ দেন সবাইকে।

লকডাউনের শুরু থেকেই পাকিস্তানের লাহোরে মহিলা হেল্পলাইনে কল প্রায় পাঁচ গুণ বেড়েছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সাইবার বুলিং ও অনলাইনে বিরূপ আচরণের জন্য অভিযোগ আসতে থাকে। সারা বিশ্বে করোনা মহামারি শুরু হওয়ার পর থেকেই নারীর প্রতি পুরুষের সহিংস আচরণের প্রবণতাকে জাতিসংঘের বিশেষায়িত সংস্থা ‘ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন’ ছায়া-মহামারি হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পুরুষরা অনলাইনে নারীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে চায়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে নারীরা এসব এড়িয়ে চলতে বেশি পছন্দ করে। তবে পাকিস্তানে কঠোর পুরুষতান্ত্রিক সমাজকাঠামোতে অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী নারীকেই দোষারোপ করা হয়ে থাকে।

মোবাইল ফোন অপারেটরদের বৈশ্বিক সংগঠন জিএসএমএ গত বছর দ্য মোবাইল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট-২০২০ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদন অনুসারে আমাদের দেশে গড়ে শতকরা ৮৬ ভাগ পুরুষ মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর বিপরীতে নারীর সংখ্যা ৬১ শতাংশ। এ ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের ব্যবধান প্রায় ২৫ শতাংশ। ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে এই ব্যবধান আরো বেশি; প্রায় ৫২ শতাংশ। বাংলাদেশের ৩৩ শতাংশ পুরুষ মোবাইলে ইন্টারনেট ব্যবহার করে, সেখানে নারী ব্যবহারকারী মাত্র ১৬ শতাংশ। তবে ধীরে ধীরে এই ব্যবধান কমতে শুরু করেছে, বিশেষ করে নারীরা মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারে ছেলেদের তুলনায় বেশি দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছে। ২০১৭ সালের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের স্মার্টফোন ব্যবহারকারীদের মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ পুরুষ ইন্টারনেট ব্যবহারের ব্যাপারে জানত এবং টুকিটাকি কাজে ব্যবহার করত। দুই বছর পর এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৩ শতাংশে। সেই বছর মাত্র ৩৪ শতাংশ নারী ইন্টারনেটের ব্যবহার করত। এর ঠিক দুই বছর পর ৭১ শতাংশ স্মার্টফোনধারী নারী ইন্টারনেট ব্যবহার করতে শুরু করে।

যুক্তরাজ্যের মোবাইল নেটওয়ার্ক কম্পানি জিএসএমের আরেকটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাপী নারীরা পুরুষের তুলনায় স্মার্টফোন বেশ কম মাত্রায়ই ব্যবহার করে। ইন্টারনেট ব্যবহারের হারও তুলনামূলক কম।