kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ আশ্বিন ১৪২৮। ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৫ সফর ১৪৪৩

৩২ বিট যুগের অবসান

২০২৩ সাল থেকে ৩২ বিট যুগের অবসান হতে যাচ্ছে। আগামী দিনের স্মার্টফোন আর অ্যাপগুলো কেমন হবে তা-ই জানাচ্ছেন এস এম তাহমিদ

২৫ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



৩২ বিট যুগের অবসান

মডেল : বুশরা, আলোকচিত্র : মোহাম্মাদ আসাদ

পিসি-দুনিয়া বেশ কিছুদিন আগেই ৩২ বিট থেকে সরে আসতে শুরু করেছে; যদিও পুরনো ৩২ বিট সফটওয়্যার এখনো নতুন ৬৪ বিট প্রসেসর ও অপারেটিং সিস্টেমে চালানো যায়। স্মার্টফোনেও ৩২ বিট প্রসেসর ব্যবহার বন্ধ হয়ে গেছে বেশ কয়েক বছর আগে, অ্যাপল ৩২ বিট অ্যাপ সমর্থন পুরোপুরি বন্ধ করে দিলেও অ্যানড্রয়েড এ পর্যন্ত তেমন কড়া ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। তবে ২০২৩ সাল থেকে স্মার্টফোনের প্রসেসরগুলোই আর ৩২ বিট অ্যাপ সমর্থন করবে না—এমনটাই সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রসেসরগুলোর ডিজাইনার ও নির্মাতা এআরএম টেকনোলজিস।

 

দুটি প্রযুক্তির পার্থক্য

সর্বপ্রকার কম্পিউটার—হোক সেটি ডেস্কটপ, ল্যাপটপ, ম্যাক বা স্মার্টফোন, কাজ করে তথ্য বাইনারি সংখ্যায় রেখে। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সব সংখ্যা সাধারণত হয়ে থাকে ডেসিমাল সিস্টেমের, যাতে আছে ০-৯, সর্বমোট ১০টি সংখ্যা। কিন্তু বাইনারিতে আছে মাত্র দুটি, ০ ও ১। এই দুটি সংখ্যাকে বলা হয়ে থাকে বিট। বেশ কিছু বিট একত্র হয়ে একটি তথ্য সংরক্ষণ করে থাকে, আর সর্বোচ্চ কয়টি বিট একত্র হয়ে একটি তথ্য সংরক্ষণ করবে তা নির্ভর করে প্রসেসরের মেমরি অ্যাড্রেসিংয়ের ওপর—যাকে আমরা ৩২ বা ৬৪ বিট প্রসেসিং বলছি। একেবারে শুরুতে প্রসেসরগুলো ছিল ৪ বিট, পরে তা বাড়তে বাড়তে ৩২ বিটে পরিণত হয়। একটি ৩২ বিট প্রসেসর ৪ গিগাবাইটের একটি একক তথ্য র‌্যামে রেখে প্রসেস করতে পারে। বর্তমানে বাজারে একেবারে স্বল্পমূল্যের ফোন ছাড়া সব ফোনেই অন্তত ৬ গিগাবাইট র‌্যাম দেওয়া হচ্ছে। এ বছর ১৬ গিগাবাইট র‌্যামের ফোনও দেখা গেছে বাজারে। অর্থাৎ নতুন হার্ডওয়্যারে এমনিও ৩২ বিট অ্যাপ চালানোর মানে নেই, সেটি ৪ গিগাবাইটের বেশি র‌্যাম ব্যবহার করতে পারবে না। অতএব এআরএম সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ৩২ বিট অ্যাপের প্রয়োজন আগামী দুই বছরের মধ্যে পুরোপুরি শেষ হয়ে যাবে এবং আমরা পূর্ণাঙ্গরূপে প্রবেশ করব ৬৪ বিট স্মার্টফোন দুনিয়ায়।

 

কেন বাদ পড়ছে ৩২ বিট

প্রসেসর কোরগুলো যদিও ৬৪ বিটের পাশাপাশি ৩২ বিট সমর্থনের জন্যও কাজ করে, তাহলে তার কিছু ট্রানজিস্টর ও প্রসেসিং ক্ষমতা নষ্ট হয়ে থাকে। বর্তমানে তা নষ্ট বলা যাবে না। কেননা বেশ কিছু অ্যাপ এখনো ৩২ বিট কম্প্যাটিবিলিটি ব্যবহার করে থাকে। কিন্তু ভবিষ্যতে যখন আর ৩২ বিট অ্যাপ একটিও থাকবে না, তখন পুরনো অ্যাপ কম্প্যাটিবিলিটি ধরে রাখতে কিছু ট্রানিজস্টর ধরে রাখার প্রয়োজন নেই। এতে প্রসেসর ডিজাইন এবং তার ড্রাইভার তৈরি ও আপডেট করতে খরচ ও সময় দুটিই কমে যাবে। বর্তমানের প্রসেসরগুলো যেমন আর ১৬ বা ৮ বিট অ্যাপ সমর্থন করে না, তেমনটাই বলা যায়।

 

আগামী দিনের প্রসেসর ও অ্যাপ

এআরএমের রোডম্যাপ অনুযায়ী ২০২২ সালে তাদের শক্তিশালী প্রসেসর কোরগুলো থেকে সরিয়ে নেওয়া হবে ৩২ বিট সমর্থন। এর পর ২০২৩ সাল থেকে স্বল্পশক্তির ব্যাটারিসাশ্রয়ী কোর ডিজাইন থেকেও বাদ দেওয়া হবে ৩২ বিট সমর্থন। অর্থাৎ আগামী বছর আমরা নতুন একটি স্বল্পশক্তির কোর ডিজাইন দেখতে যাচ্ছি, যা হতে চলেছে ৩২ বিটের বিদায়ঘণ্টা।

অ্যাপল আরো আগেই ৩২ বিট সমর্থন তাদের প্রসেসর ডিজাইন ও অপারেটিং সিস্টেম থেকে সরিয়ে ফেলেছে। ‘আইওএস ১১’-র পর থেকেই ৩২ বিট অ্যাপ সমর্থন সরিয়ে ফেলা হয়েছে, অ্যাপল এ১১ প্রসেসরযুক্ত ডিভাইসে অর্থাৎ আইফোন ৮ ও ১০ সিরিজ থেকেই হার্ডওয়্যারেও ৩২ বিট সমর্থন নেই। অ্যাপল সিলিকন এম১ প্রসেসরটিও এআরএম প্রযুক্তির ওপরই তৈরি, সেটিও শুধু ৬৪ বিট কোডই চালাতে পারে।

গুগলও সেদিকে পা বাড়িয়েছে আরো আগেই, ২০১৪ সালে অ্যানড্রয়েড ৫ ললিপপের মাধ্যমে গুগল প্রবেশ করে ৬৪ বিট যুগে। এরপর ২০১৯ সালে ঘোষণা করে প্লেস্টোরের সব অ্যাপ ৬৪ বিট হতে হবে, না হলে তা সরিয়ে নেবে তারা। এর ফলে জনপ্রিয় সব গেম ইঞ্জিন নির্মাতা তাদের ইঞ্জিনগুলো ৬৪ বিটে উন্নীত করে। প্রথমে ২০১৫ আনরিয়েল, একই বছর কোকোস২ডি, ২০১৮ সালে করে ইউনিটি। বর্তমানে এমন কোনো জনপ্রিয় ৩ডি গেম ইঞ্জিন নেই, যা ৬৪ বিট সমর্থন করে না। এ বছরের আগস্ট মাস থেকে গুগল যেসব অ্যাপ এখনো শুধু ৩২ বিট সংস্করণেই আটকে আছে, সেগুলো সরিয়ে ফেলবে।

অ্যাপ নির্মাতাদের ৬৪ বিট আপডেটের জন্য গুগল প্রচুর সহযোগিতা করেছে। জাভা ও কটলিনের জন্য তারা সহজ ডকুমেন্টেশন তৈরি করেছে, যাতে কোনো ঝামেলা ছাড়াই তাদের অ্যাপগুলো ৬৪ বিটে রূপান্তর করা যায়। গেমের ক্ষেত্রে এরই মধ্যে ইঞ্জিন নির্মাতারা ৬৪ বিটে রূপান্তর করে ফেলেছে। যেসব অ্যাপ নির্মাতা এখনো আপডেটটি করেনি—ধরে নেওয়া যেতে পারে, তাদের অ্যাপ এর মধ্যেই হয়ে গেছে অপ্রয়োজনীয়।

 

বর্তমান ব্যবহারকারীদের জন্য করণীয়

বর্তমান ব্যবহারকারীদের জন্য এটি সমস্যা হওয়ার কথা নয়। যাঁরা অন্তত ২০১৭ সাল বা এর পরে অ্যানড্রয়েড কিনেছেন, তাঁদের চিন্তার প্রয়োজন নেই বললেই চলে। যাঁরা এখনো কিছুটা পুরনো ডিভাইস ব্যবহার করছেন, তাঁদের আগামী দুই বছরের মধ্যে ডিভাইস বদলাতে হবে। অবশ্য তাঁরা আগস্ট থেকেই আর অ্যাপ আপডেট পাবেন না এমনিতেও।

এর চেয়ে বড় প্রশ্ন, অ্যানড্রয়েড গো ব্যবহারকারীদের কী হবে? বর্তমানে বাজারে থাকা বেশ কিছু অ্যানড্রয়েড গো সিরিজের ফোনে ব্যবহার করা হয়েছে ৩২ বিট প্রসেসর, কিছু ফোনে ৬৪ বিট প্রসেসর থাকলেও তা চলছে ৩২ বিট মোডে। গুগল এ ব্যাপারে বিস্তারিত কিছু জানায়নি; কিন্তু সম্ভাবনা আছে এ ডিভাইসগুলোও ৬৪ বিট দুনিয়ায় আর নতুন অ্যাপ পাবে না। গুগলের এরূপ খামখেয়ালিপনার নজির আগেও দেখা গেছে।

 

৬৪ বিট ব্যবহারে লাভ

প্রায় সময়ই ব্যবহারকারীরা বলে থাকেন, ফোনে ১২ গিগাবাইট বা ১৬ গিগাবাইট র‌্যাম দিয়ে লাভ কী? মজার ব্যাপার, যখন ফোনে ২ গিগাবাইট র‌্যাম দেওয়া শুরু হয় তখনো একই কথা উঠেছিল। অ্যানড্রয়েড অনেক র‌্যাম ব্যবহার করে সেটি সত্য; কিন্তু শুধু তার কারণেই ফোনে বিশাল পরিমাণ র‌্যামের প্রয়োজন তা নয়। আজকাল স্মার্টফোনেই খেলা যাচ্ছে উন্নত মানের গেম, সেগুলোর জন্য প্রয়োজন হয় ৪ গিগাবাইটেরও বেশি র‌্যাম ব্যবহার, যা ৬৪ বিটেই সম্ভব। বেশ কিছু গেম নির্মাতা ৩২ বিট ফোনেও সমর্থন দিতে গিয়ে তাঁদের গেমগুলোকে ২ বা ৩ গিগাবাইট র‌্যাম ব্যবহারেই আটকে রাখছেন, তার আর প্রয়োজন হবে না। অর্থাৎ আরো শক্তিশালী ও হাই গ্রাফিকসের গেম সামনে দেখা যাবে, যার শুরু বলা যায় বর্তমানের বাজার কাঁপানো গেনশিন ইম্প্যাক্ট। র‌্যামের প্রয়োজনীয়তা ফটো ও ভিডিও সম্পাদনা করার ক্ষেত্রেও দেখা যায়, যেমন—লাইটরুমে ছবি এডিট করার সময় ২ গিগাবাইট র‌্যামের ফোনগুলো কিছুটা হলেও মুখ থুবড়ে পড়ে, এমনকি সেটি আইফোনের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে। লাইটরুম যদি শুধু ৬৪ বিট ফোনের জন্যই তৈরি করা হতো তাহলে শুরু থেকেই সেটি ৪ বা ৬ গিগাবাইট র‌্যামের ফোনে আরো সুন্দরভাবে চলতে পারত, ৮-১৬ গিগাবাইট ফোনের র‌্যাম ব্যবহার করতে পারত আরো সুষমভাবে। আগামী দিনে এই ৩২ বিট অ্যাপের মৃত্যু ব্যবহারকারীদের আরো স্মুথ সফটওয়্যার ও মাল্টিটাস্কিং উপহার দেবে।

 

ভবিষ্যৎ

আগামী দিনে ৬৪ বিটও বাদ পড়ার সম্ভাবনা অচিরেই নেই। একটি ৬৪ বিট প্রসেসর সর্বোচ্চ ১৮ এক্সাবাইট র‌্যাম ব্যবহার করতে পারে, যা ১৮,০০০,০০০ টেরাবাইটের সমান। এখনো পর্যন্ত পিসিতে ১২৮ গিগাবাইটের বেশি র‌্যামের প্রয়োজনীয়তা দেখা যায়নি অর্থাৎ ১৮,০০০,০০০ টেরাবাইট র‌্যামের প্রয়োজনীয়তা পার হতে আরো কয়েক দশক বাকি। যাঁরা ৩২ বিট থেকে ৬৪ বিটে আপগ্রেড করবেন, তাঁরা চিন্তা ছাড়াই করতে পারেন। তবে চেষ্টা করা উচিত অন্তত ৬ বা ৮ গিগাবাইট র‌্যামের ফোন নেওয়ার। কেননা ৪ গিগাবাইটের ফোনে এর মধ্যেই মাল্টিটাস্কিং করা একটু কঠিন হয়ে গেছে।



সাতদিনের সেরা