kalerkantho

শনিবার । ২৪ শ্রাবণ ১৪২৭। ৮ আগস্ট  ২০২০। ১৭ জিলহজ ১৪৪১

নিজের অ্যাপ গ্যালারিই আছে হুয়াওয়ের

৫ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



নিজের অ্যাপ গ্যালারিই আছে হুয়াওয়ের

মডেল : তপু, আলোকচিত্র : মোহাম্মাদ আসাদ

গুগলের সঙ্গে বিচ্ছেদের পর নানাভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে চীনের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ে। কয়েক মাস ধরে তারা নিজস্ব অ্যাপ গ্যালারি আরো ‘সুরক্ষিত ও নিরাপদ’ করতে চাইছে, যাতে ব্যবহারকারীরা আকৃষ্ট হয়। এটিকে সমৃদ্ধ করতে এরই মধ্যে ১০০ কোটি ডলারও বিনিয়োগ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যত দিন যাবে হুয়াওয়ের অ্যাপ গ্যালারি গুগল প্লেস্টোরকে তত টেক্কা দেবে। কিন্তু বাস্তবতা কী বলছে? জানাচ্ছেন এস এম তাহমিদ

গুগল ছাড়া অ্যানড্রয়েড ব্যবহার এক প্রকার অসম্ভবই বলা যায়। প্লেস্টোর ছাড়া অ্যাপ পাওয়া দুষ্কর, জি-মেইল অ্যাকাউন্ট ছাড়া সব কন্ট্যাক্টস আর ই-মেইল সিংক্রোনাইজ করা কষ্টসাধ্য, আর ইউটিউব ছাড়া তো মোবাইল কল্পনাই করা যায় না। অথচ হুয়াওয়ের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের বিরোধের ফলে হুয়াওয়ে বাধ্য হয়েছে তাদের অ্যানড্রয়েড স্মার্টফোন থেকে গুগলের সব সেবা সরিয়ে নিতে। ফলাফল, হুয়াওয়ের নিজস্ব অ্যাপস্টোর এবং মোবাইলসেবা।

 

প্লেস্টোরের প্রয়োজনীয়তা

গুগল প্লে ছাড়াও অ্যানড্রয়েডে অ্যাপ ইনস্টল করার সুবিধা একেবারে শুরু থেকেই আছে। বেশির ভাগ অ্যানড্রয়েড ডিভাইস নির্মাতাই তাঁদের নিজস্ব অ্যাপস্টোর তৈরির চেষ্টা করছেন সে সময় থেকেই। ডিভাইস নির্মাতাদের বাইরেও অ্যাপটয়েড, ব্লয়াকমাট বা এফ-ড্রয়েডের মতো কিছু সেবাদাতা গুগল প্লের বাইরেও অ্যানড্রয়েড অ্যাপ মার্কেট গড়েছেন। সেগুলো অবশ্য জনপ্রিয়তা একেবারেই পায়নি। গুগল প্লের বাইরে থেকে অ্যাপ ইনস্টল করতে হলে ফোনে বেশ কিছু অনুমতি আলাদা করে সেটআপ করার প্রয়োজন হয়, অথবা অ্যাপের সংখ্যা কম হওয়ায় ব্যবহারকারীদের মনে স্থান করে নিতে ব্যর্থ হয় এসব অ্যাপস্টোর। আর গুগল প্লেস্টোরের মতো ম্যালওয়্যারের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান আর কোনো অ্যাপস্টোর নিতে না পারায় নিরাপত্তা নিয়েও সন্দেহ রয়ে যায়।

 

হুয়াওয়ে অ্যাপ গ্যালারি

হুয়াওয়ে অ্যাপস্টোর শুরু থেকেই নির্মাতাটির ডিভাইসগুলোতে ইনস্টল থাকত। জনপ্রিয়তা অবশ্য শুধু যেসব দেশে গুগল প্লে নিষিদ্ধ সেসব দেশের ব্যবহারকারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। তবে ধীরে ধীরে হুয়াওয়ে সেটি শুধু অ্যাপস্টোর পর্যায়ে সীমাবদ্ধ না রেখে সঙ্গে হুয়াওয়ে মোবাইল সার্ভিসেস সিস্টেমে নিয়ে আসতে শুরু করে। হুয়াওয়ে মোবাইল সার্ভিসেস তৈরি করা হয়েছে গুগল প্লে সার্ভিসেসের পরিবর্তে ব্যবহারের জন্য। ফোনের নিরাপত্তা এবং বিবিধ অ্যাপে গুগল অ্যাকাউন্টের মতো সুবিধা হুয়াওয়ে অ্যাকাউন্টের মাধ্যমেই যাতে দেওয়া যায় সে কথা মাথায় রেখেই সিস্টেমটি তৈরি করা হচ্ছে।

অ্যাপস্টোর থেকে বিনা মূল্যে অ্যাপ ডাউনলোড আর ইনস্টল সেবা দিলেই চলবে না, অ্যাপস্টোর চালনার খরচ এবং অ্যাপ নির্মাতাদের মুনাফার জন্য সেটি থেকে আয় করার উপায়ও থাকতে হবে। আর এ কাজটিই গুগলের বাইরে আর কেউ তেমন জোর দিয়ে করতে চেষ্টা করেনি। গুগলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার পর থেকে নিরলসভাবে হুয়াওয়ে চেষ্টা করে যাচ্ছে ঠিক এ কাজটি করার।

 

অ্যাপ গ্যালারি যেভাবে কাজ করবে

গুগল প্লেস্টোরের সঙ্গে হুয়াওয়ে অ্যাপ গ্যালারির কৌশলগত পার্থক্য তেমন নেই। গুগল ফ্রি অ্যাপগুলোতে বিজ্ঞাপন দেখিয়ে থাকে, আর সেখান থেকে পাওয়া আয়ের কিছু অংশ ক্ষেত্রবিশেষে অ্যাপ নির্মাতাদের কাছে পৌঁছে দেয়। সে জন্য অবশ্যই অ্যাপ নির্মাতাদের গুগল অ্যাডসেন্স সমর্থিত বিজ্ঞাপন বসাতে হবে। আর টাকার বিনিময়ে বিক্রীত অ্যাপ এবং ইন অ্যাপ পারচেজে ব্যবহারকারীরা যে মূল্য পরিশোধ করেন তার কিছু অংশ গুগল রেখে দিয়ে বাকিটা নির্মাতাদের কাছে পৌঁছে দেয়। অ্যাপ নির্মাতারা চাইলে গুগলে ডেভেলপমেন্ট কিট, তাঁদের তৈরি ম্যাটেরিয়াল ইন্টারফেস এবং গুগলের থেকে অ্যাপের কিছু রেডিমেড কোড ব্যবহার করে তাদের গেম ও অ্যাপ তৈরি করতে পারেন। নিজের অ্যাপ ব্যবহারকারীদের নজরে আনার জন্য তাঁরা প্লেস্টোরে অ্যাপটির বিজ্ঞাপনও দিতে পারবেন।

এগুলোর প্রায় সবই হুয়াওয়ে অ্যাপ গ্যালারিতেও করা যাবে। হুয়াওয়ে অ্যাড নেটওয়ার্কের মাধ্যমে নির্মাতারা দিতে পারবেন বিজ্ঞাপন, আবার সেটা থেকে আয়ও করতে পারবেন। ইন অ্যাপ পারচেজ এবং অ্যাপ সরাসরি বিক্রিও করা যাবে হুয়াওয়ে অ্যাপ গ্যালারিতে। হুয়াওয়ের দাবি, নির্মাতাদের গুগলের চেয়ে বেশি টাকা দেবে তারা এবং অ্যাপ পারচেজের থেকে তাদের ফি রাখবে গুগলের চেয়েও কম। আর গেম ও অ্যাপ নির্মাতারা চাইলে হুয়াওয়ের সঙ্গে যৌথভাবেও অ্যাপ বানাতে পারবে, সে ক্ষেত্রে অ্যাপ বা গেম থেকে পাওয়া মুনাফা দুই পক্ষ সমানভাবে পাবে।

বাড়তি সুবিধা হিসেবে হুয়াওয়ে দিচ্ছে অ্যাপ ব্যবহারকারীদের আইটেম গিফট করার সুবিধা। যেমন নির্মাতা চাইলে গেমের জেমস বা অন্যান্য ইন অ্যাপ পারচেজের জিনিসপত্র বিনা মূল্যে উপহার দিতে পারবেন। এ ধরনের ক্যাম্পেইনের জন্য অ্যাপ গ্যালারি পূর্ণ সহায়তা করবে।

নিরাপত্তা নিয়েও ভাবতে হবে না বলে দাবি হুয়াওয়ের। তাদের মার্কেটে অ্যাপ প্রকাশ করার আগে সেটা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। বিন্দু পরিমাণ ম্যালওয়্যারের অস্তিত্ব পাওয়া গেলে অ্যাপ বাতিল করা হবে। হুয়াওয়ে অ্যাপ গ্যালারি হুয়াওয়ে মোবাইল সার্ভিসেস ব্যাকেন্ডের মাধ্যমে কাজ করায়, অ্যাপগুলো সরাসরি ইনস্টল হয়ে যাবে ডিভাইসে। এপিকে হিসেবে ডাউনলোড হয়ে তারপর ইনস্টল হবে না। থার্ড পার্টি বাকি সব অ্যাপ স্টোর থেকে তাই এটি বেশ এগিয়ে আছে।

এককথায় বলতে গেলে, হুয়াওয়ে আইডি হবে সব ধরনের কাজে ব্যবহারের জন্য মাস্টার অ্যাকাউন্ট। ঠিক যেভাবে গুগল অ্যাকাউন্ট প্রায় সব অ্যাপেই লগইন করার জন্য ব্যবহার করা যায়।

 

দেশীয় অ্যাপও মিলছে অ্যাপ গ্যালারিতে

হুয়াওয়ে অ্যাপ গ্যালারিতে বৈশ্বিক জনপ্রিয় অ্যাপসগুলোর পাশাপাশি রয়েছে বাংলাদেশেরও কিছু জনপ্রিয় অ্যাপস। এসবের মধ্যে রয়েছে—বিডিজবস, রকমারি, দারাজ ডটকম, পিকাবোর মতো বেশ কিছু অ্যাপ। হুয়াওয়ে কনজিউমার বিজনেস গ্রুপ বাংলাদেশের ঊর্ধ্বতন জনসংযোগ ব্যবস্থাপক সুমন সাহা বলেন, ‘শিগগিরই বিকাশের মতো জনপ্রিয় আরো বহু ইউটিলি অ্যাপস যুক্ত হতে যাচ্ছে এই গ্যালারিতে। এ ছাড়া দেশের সব জনপ্রিয় অ্যাপস এ গ্যালারিতে উন্মুক্তের জন্য কাজ করে যাচ্ছে হুয়াওয়ে।

বর্তমানে দেশের ৩০ লাখের বেশি হুয়াওয়ে এবং অনার ব্র্যান্ডের স্মার্টফোনে হুয়াওয়ের অ্যাপ গ্যালারি প্রি-ইনস্টল রয়েছে। অ্যাপ গ্যালারিতে এখন বাংলাদেশের সক্রিয় গ্রাহক রয়েছেন চার লাখেরও বেশি।’

 

কিন্তু শেষ রক্ষা হবে কী

হুয়াওয়ের দাবি, এর মধ্যেই তাদের অ্যাপ গ্যালারি বিশ্বের তৃতীয় সবচেয়ে বড় অ্যাপ মার্কেট। প্রথমে আছে অ্যাপল অ্যাপস্টোর আর দ্বিতীয় হচ্ছে গুগল প্লে। কিন্তু সেটাই শেষ কথা নয়। তারা তৃতীয় স্থানে আছে শুধু হুয়াওয়ে ফোনে গুগল প্লে ইনস্টল না থাকায়, ফলে বলা যায় তাদের বাজার শুধু নিজেদের ডিভাইসেই সীমাবদ্ধ।

এর পরও অ্যাপ গ্যালারি ব্যবহার করছে ৪০ কোটি ব্যবহারকারী। সংখ্যাটি ফেলনা নয়। কিন্তু যেখানে পাঁচ বছর আগেই গুগল প্লে ব্যবহারকারীর সংখ্যা এক হাজার কোটি ছাড়িয়েছে, সেখানে ৪০ কোটি কিছুই না বলা যায়। আর এই ৪০ কোটি ব্যবহারকারীর বেশির ভাগই চীনা নাগরিক, যারা চাইলেও গুগল প্লে ব্যবহার করতে পারত না। চীনের বাইরে হুয়াওয়ে অ্যাপ গ্যালারি আসলেও জনপ্রিয় হবে কি না তা নিয়ে সংশয় তো আছেই।

ঠিক এ সমস্যাটি কাটাতেই হুয়াওয়ে কাজ করছে অপ্পো, শাওমি এবং ভিভোর মতো বড়সড় ব্র্যান্ডগুলোর সঙ্গে। তাদের চেষ্টা, চীনের সব নামকরা ফোন ব্র্যান্ডেই হুয়াওয়ে অ্যাপ গ্যালারি ইনস্টল করে দেওয়া। গুগল প্লের পাশাপাশি যদি সব ডিভাইসে হুয়াওয়ে অ্যাপ গ্যালারিও ইনস্টল করা থাকে, তাহলে ব্যবহারকারীদের নতুন এই স্টোর ব্যবহারের জন্য উদ্বুদ্ধ করা যাবে। যদিও এটির সম্ভাবনা ক্ষীণ। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের যেভাবে সম্পর্ক টালমাটাল অবস্থায় আছে, যেকোনো সময় শাওমি, অপ্পোর মতো প্রতিষ্ঠানলোও গুগল প্লে ব্যবহারের অনুমতি হারাতে পারে। সে দিনের জন্যই তারা চেষ্টা করছে প্রস্তুত থাকার।

 

প্রশ্ন যখন নিরাপত্তার

হুয়াওয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তারা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অল্পবিস্তর গোয়েন্দা কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। যদিও তার জোরালো প্রমাণ এখনো যুক্তরাষ্ট্র দিতে পারেনি। কিন্তু সে অভিযোগের কারণেই কিন্তু আজ হুয়াওয়ের গুগল অ্যাপস ব্যবহারের অনুমতি নেই, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ব্যবসাও তাদের বন্ধ। সে সুবাদে হুয়াওয়েকে সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ আছে। হুয়াওয়ে অ্যাপ গ্যালারি আনছে বলেই সব ব্যবহারকারী গুগল প্লে থেকে অ্যাপ ডাউনলোড বন্ধ করে দলে দলে হুয়াওয়ে অ্যাকাউন্ট খুলবে, সেটা মনে করার কোনো কারণ নেই। ব্যবহারকারীদের গোপনীয় সব তথ্য তারা বিক্রি করে দেবে এমন আশঙ্কা সবার মনেই আছে।

আবার উল্টোভাবে চিন্তা করলে, হুয়াওয়ে গোয়েন্দাগিরি করেছে বা তথ্য বিক্রি করেছে, এমন কোনো শক্ত প্রমাণও তো নেই। আর এ অভিযোগ খোদ গুগলের বিরুদ্ধেও বারবার উঠেছে। সেভাবে দেখলে গুগলও সন্দেহের বাইরে তো নয়ই, গুগল যে পরিমাণে ব্যবহারকারীদের তথ্য সংগ্রহ করে তা একবার ভাবলে যে কেউ ভয় পেতে বাধ্য।

 

পরিশেষ

হুয়াওয়ে, অপ্পো, ভিভো ও শাওমি চেষ্টা করছে গুগলের একচেটিয়া অ্যানড্রয়েডের ওপর খবরদারি শেষ করার। তারা চাইছে অন্তত একটি বিকল্প অ্যাপস্টোর এবং মোবাইল সার্ভিসেস প্ল্যাটফর্ম দাঁড়াক, যাতে যুক্তরাষ্ট্র বা গুগল চাইলেই কাউকে বঞ্চিত করতে না পারে। মুক্তবাজারে প্রতিযোগিতা সব সময় ব্যবহারকারীদের জন্যই শেষ পর্যন্ত সুসংবাদ বয়ে আনে, আশা করা যায় এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা