kalerkantho

রবিবার । ২১ আষাঢ় ১৪২৭। ৫ জুলাই ২০২০। ১৩ জিলকদ  ১৪৪১

ঘরে বসে ডিজিটাল অফিস

৭ জুন, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ঘরে বসে ডিজিটাল অফিস

ঘরে বসে অফিস করছেন নাদিম মজিদ। চাইলে ল্যাপটপের বদলে এই অ্যাপ দিয়ে মোবাইলেও করা যাবে অফিস

করোনা আতঙ্কে তো আর কাজকর্ম বন্ধ করে ঘরে বসে থাকা যাবে না? ডিজিটাল ওয়ার্কপ্লেসের মাধ্যমে ঘরে বসে দিব্যি অফিস করা যাবে। তবে একটা সমস্যা আছে—ডাটা ম্যানেজমেন্ট বা ব্যবস্থাপনা। সেই সমস্যা সমাধানে এগিয়ে এসেছে বাংলাদেশি স্টার্টআপ ‘ক্লাউড অফিস’। তাদের ‘ক্লাউড অফিস ডিজিটাল ওয়ার্কপ্লেস’ অ্যাপ দিয়ে স্মার্টফোনেই করা যাবে অফিসের কাজকর্ম। বিস্তারিত তুসিন আহম্মেদ

করোনাভাইরাসের প্রকোপে বিশ্বজুড়ে বন্ধ হয়েছে অনেক অফিস-আদালত। তবে এর মাঝেও একেবারেই থেমে নেই কর্মচাঞ্চল্য। ফলে বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ মানুষ ঘরে থেকে কাজ করে যাচ্ছেন। এই কাজের জন্য কর্মীদের দেখভাল বা যোগাযোগের জন্য রয়েছে অনেক প্ল্যাটফর্ম। তবে নানা টুলস বা সেবার ভিড়ে দেশীয় সফটওয়্যারের সংখ্যা কম।

তবে আগের মতো ভারী ভারী সফটওয়্যার কিনে সলিউশন দেওয়ার সেই প্রবণতা এখন কমে যাচ্ছে। কেননা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় যে এসব ভারী সফটওয়্যার খুবই ব্যয়বহুল; কিন্তু সেই তুলনায় কার্যকারিতা নেই। এসবের বদলে যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নত দেশে ডিজিটাল ওয়ার্কপ্লেস প্ল্যাটফরমের চলটা শুরু হয়ে গেছে।

সে রকমই সফটওয়্যার ‘ক্লাউড অফিস ডিজিটাল ওয়ার্কপ্লেস’। দেশি প্রতিষ্ঠান ‘ক্লাউড অফিস’-এর তৈরি করা এ সফটওয়্যারের মাধ্যমে নিজের মতো করে বড় থেকে ছোট এনজিও, ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা সব কর্মীর ডাটা এবং কাজের অগ্রগতি রিয়েল টাইম পর্যবেক্ষণ ও অনুমোদন করা সম্ভব। প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি শাখা, বিভাগ ও দপ্তরের কার্যপদ্ধতি এবং তথ্য ফরম নিজেদের মতো করে বানানো সম্ভব অল্প সময়েই। এ জন্য একটি স্মার্টফোন থাকলেই হবে। কোনো ভারী হার্ডওয়্যার বা প্রযুক্তির অনেক কিছু জানতে হবে, এমনও নয়। এ ছাড়া করোনার সময়টাতে মানুষের সাহায্যের জন্য এক বছরের ফ্রি সুবিধাও দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।

 

যেভাবে যাত্রা শুরু

সময়টা ২০০৯ সাল, মান্না মাহমুদ থাকেন ফিনল্যান্ডের ওলু শহরে। কাজ করতেন জাভা ডেভেলপমেন্ট নিয়ে। সেখানে তিনি ওলু শহরের নাগরিকদের সমন্বয় করার জন্য একটি প্ল্যাটফর্মের মূল আর্কিটেক্ট হিসেবে কাজ করেন। সেই প্ল্যাটফর্মে ভার্চুয়াল একটি জগৎ থাকবে, সেখানে নাগরিকরা নিয়মিত যোগাযোগ ও কাজ করতে পারেন। নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শেষ হলো। এই কাজে বেশ প্রশংসা পেলেন মান্না।

পরবর্তীকালে নেদারল্যান্ডসের সরকার মান্নাকে সেই দেশের স্থায়ী নাগরিক হওয়ার আমন্ত্রণ জানায়। নেদারল্যান্ডসের আন্তর্জাতিক সংস্থার জন্য সমন্বয়কারী প্ল্যাটফর্ম বানানোর কাজ শুরু করেন তিনি। এই সময় তাঁর দুজন ডাচ্ বন্ধুর সঙ্গে পরিচয় হয়। দুজন বন্ধু নিজ নিজ ক্ষেত্রে খুবই প্রতিষ্ঠিত। তিন বন্ধু মিলে একত্রে নানা আড্ডা ও কাজ করেছেন। একদিন কফির আড্ডায় তিন বন্ধু মিলে একটা ভার্চুয়াল জগৎ তৈরি করার সিদ্ধান্ত নেন। যেখানে যেকোনো প্রতিষ্ঠান তাদের কাজ ও কর্মী সমম্বয় করতে পারবে। এটা ২০১১ সালের শেষ দিকের কথা। তখন ‘মাইক্রোসফট টিম’ বা ‘স্লেক’ বাজারে আসেনি।

কম খরচে কাজ করানোর জন্য ২০১২ সালে ইউরোপ ছেড়ে ঢাকায় চলে এলেন মান্না। এরপর অনেক চড়াই-উতরাই; ফান্ড এসেছে, আবার চলেও গেছে। ইউরোপের অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য কাজ করে আয় করতে থাকেন মান্না। সেই অর্থ ব্যবহার করে এই প্ল্যাটফর্ম ডেভেলপ করেন তিনি।

২০১৭ সালের দিকে বিভিন্ন কারণে সেই ডাচ্ বন্ধুরা এই উদ্যোগ থেকে সরে দাঁড়ান। তখন ক্লাউড অফিসে ১৬ জন বিশেষজ্ঞ জাভা ডেভেলপার দিন-রাত কাজ শুরু করেন।

মান্না মাহমুদ বলেন, ‘নিজের ও সহধর্মিণীর জমানো পুঁজি দিয়ে চেষ্টা করে যাই। এই প্ল্যাটফর্মটি দাঁড় করাতে সাত বছরে প্রায় ছয় কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। ২০২০ সালে শেষ পর্যন্ত উদ্যোগটাকে একটা ব্যবহারযোগ্য অবস্থায় নিয়ে আসতে পেরেছি। এখন আমাদের একটা সাপোর্ট টিম আছে।’

পাওয়া যাবে যেসব সুবিধা

আমাদের দেশের সফটওয়্যার কিনতে গেলে অনেক ঝক্কি। যখন কোনো বড় ব্যবসায়ী মনে করেন সফটওয়্যার কিনবেন, তখন দেখা যায় বিদেশ থেকে লোক আসে। সেটা বাস্তবায়ন হতে লেগে যায় বছরের পর বছর। দেখা দেয় অনেক সমস্যা। নিজে অনেক কিছুই বুঝতে পারেন না। সফটওয়্যারটির জন্য অনেকে ব্যবসার ধরনও বদলাতে বাধ্য হন। একসময় সেটা বোঝায় পরিণত হয়। তা ছাড়া প্রয়োজন হয় সফটওয়্যারটির সঙ্গে হার্ডওয়্যারও। যেগুলো কেনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করাও বেশ ব্যয়সাপেক্ষ। কিন্তু সহজেই একটা মোবাইল ডিভাইস দিয়ে সব কিছু ম্যানেজ করা সম্ভব মান্না মাহমুদের প্ল্যাটফর্মটি দিয়ে।

তেমনটিই বলছিলেন তিনি, ‘এই প্ল্যাটফর্মের মূল ফিচার হচ্ছে একটি প্রতিষ্ঠানের সব বিভাগের এবং এর নিয়ন্ত্রিত সব কাজের কমিউনিকেশন গ্রুপ তৈরি করে তাতে চ্যাট, ফাইল শেয়ার ও ডাটা ফরম বানানো। পাশাপাশি এসবের ডিজিটাল সিগনেচার সংরক্ষণ করা।’

প্রত্যেক গ্রুপেই আছে জিপিএসসহ মেম্বার আর তাদের পারমিশন ম্যানেজমেন্ট, চ্যাট, ফাইল শেয়ার, ডাটাবেইস ডিজাইন এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অ্যাপ্রুভাল ওয়ার্কফ্লোর, যার মাধ্যমে করা যায় ডিজিটাল সিগনেচার সংরক্ষণ আর সব রকমের অ্যানালিটিকাল রিপোর্টিং।

ব্যবহারকারীরা যেকোনো গ্রুপকেই একটি ডিপার্টমেন্ট, প্রজেক্ট, টাস্ক বা প্রসেসে রূপান্তরিত করতে পারবেন এবং আলাদা আলাদা যেকোনো জায়গা থেকে একসঙ্গে সবাই মোবাইল বা ডেস্কটপে কাজ করতে পারবেন।

 

যেভাবে ব্যবহার করতে হবে

ক্লাউড অফিস ব্যবহার অতি সহজ, অনেকটা ফেসবুক গ্রুপ আর মেসেঞ্জারের মতোই। তবে প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানে এটির অ্যাডমিন লাগবে, যিনি ডাটাফরম ও ওয়ার্কফ্লো ডিজাইন জানেন; যেমন ধরেন, ছুটির আবেদন ফরম এবং তার অনুমোদন প্রক্রিয়া। শুধু তিনি ছাড়া বাকি ব্যবহারকারীদের জন্য এটা ফেসবুক গ্রুপের মতোই।

মান্না মাহমুদ বলেন, ‘হোয়াটসঅ্যাপ, ম্যাসেঞ্জার, ভাইবারের মূল সমস্যা হচ্ছে এগুলোতে অযথা কথা হয় এবং কাজের কথা পরে খুঁজে পেতে অনেক ঝামেলা হয়। এককথায় কাজের থেকে কথা বেশি। আমরা এই সমস্যা দূর করতে, গ্রুপে ডাটা ফরম তৈরি করার সুবিধা করে দিয়েছি এবং এই ডাটা ফরম কে দেখতে পারবে এবং কে অনুমোদন করতে পারবে তা নির্ধারণ করে দেওয়ার সুবিধা যোগ করে দিয়েছি। এখান থেকে বের করা যাবে প্রয়োজন মতো রিপোর্ট।’

 

ব্যবহারকারী কেমন?

ক্লাউড অফিসের অনেক ব্যবহারকারী রয়েছে ইউরোপে। সেখানকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজেদের চাহিদা অনুযায়ী ক্লাউড অফিস কাস্টমাইজ করা হয়েছে। বাংলাদেশে এক শর বেশি ব্যবহারকারী রয়েছে।

 

খরচ কেমন?

উত্তরে মান্না মাহমুদ বলেন, ‘সফটওয়্যারটি নিতে চাইলে নিজেদের উদ্যোগে হার্ডওয়্যারের ব্যবস্থা করে নিতে হবে।  এতে আমাদের সাপোর্ট টিম সাহায্য করবে, তাদের সঙ্গে চুক্তি করে নিতে হবে। ইনস্টলের জন্য কিছু চার্জ দিতে হবে। বর্তমানে ৩০ জনের ওপরে এই প্ল্যাটফর্মে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ডেভেলপার বাংলাদেশে আছেন। কেউ এই প্ল্যাটফর্মে তাঁর নিজস্ব ডেভেলপার তৈরি করতে চাইলে সে ব্যাপারেও আন্তরিক সাহায্য করা হবে। বিস্তারিত জানা যাবে এই লিংকে https://www.cloudoffice.io/

মন্তব্য