kalerkantho

বুধবার । ১৩ ফাল্গুন ১৪২৬ । ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ১ রজব জমাদিউস সানি ১৪৪১

দুর্ঘটনার খবর জানাবে যে ডিভাইস

মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার পর উদ্ধারকাজে দেরি হওয়ার জন্য অনেক প্রাণ যায়। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের কয়েকজন শিক্ষার্থী ‘বাইক অ্যাকসিডেন্ট ডিটেকশন অ্যান্ড রেমিডি’ নামের এমন একটি ডিভাইস বানিয়েছেন, যা দুর্ঘটনা শনাক্ত করে সঙ্গে সঙ্গে নিকটস্থ হাসপাতাল, পুলিশ স্টেশন ও আত্মীয়দের কাছে বার্তা পাঠাবে। বিস্তারিত জুবায়ের আহম্মেদের কাছে

২৬ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



দুর্ঘটনার খবর জানাবে যে ডিভাইস

বাঁ থেকে মেখলা মরিয়ম, রিদোয়ান শিহাব, সোহাগ রানা এবং সাদিয়া আনিকা ছবি: মোহাম্মদ আসাদ

রিদোয়ান শিহাব টার্ক (ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের রেসিডেনশিয়াল সেমিস্টার) থেকে এসে রোবটিকস নিয়ে কাজ শুরু করেন। তখন থেকে জায়রোস্কোপসহ বিভিন্ন ধরনের সেন্সরের সঙ্গে পরিচিত হতে থাকেন তিনি। একসময় মাথায় চিন্তা আসে, কিভাবে এসব নিয়ে কাজ করা যায়? তখন তাঁর মনে হলো—ঢাকা শহরে তো অনেক মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটে। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা রোধে যদি কিছু করা যায়! ভাবনাটা বেশ কিছুদিন ধরেই মাথায় ঘুরতে থাকে। হঠাৎই একদিন আইডিয়াটা আসে—জায়রোস্কোপ আর ভাইব্রেশন সেন্সর কাজে লাগিয়ে হয়তো দুর্ঘটনা শনাক্ত করা যেতে পারে। একসময় মনে হলো যে কাজটা করা সম্ভব। ঠিক সে সময় রাজধানীর শেরেবাংলানগরে মোটরবাইক অ্যাকসিডেন্টে মারা যান তাঁদেরই ব্যাচের এক শিক্ষার্থী। তখন ভাবনার পালে হাওয়া লাগে জোরে। এর মধ্যে ‘সিএসই ৩৪১’ নামে তাঁদের হার্ডওয়্যারের একটি কোর্স শুরু হয়। ওই কোর্সে একটি প্রজেক্ট করতে হয়। রিদোয়ানরা কিছু বন্ধু মিলে ওই কোর্সটি একসঙ্গে নিয়ে নেন। এরপর বন্ধুদের সঙ্গে নিজের আইডিয়াটি শেয়ার করেন তিনি। তাঁর সঙ্গে যোগ দেন তাঁর বন্ধু এবং একই ব্যাচের শিক্ষার্থী সাদিয়া আনিকা, মেখলা মরিয়ম, সোহাগ রানা ও ফাহিম সিয়াম।

শুরুতে তাঁদের চিন্তা ছিল জায়রোস্কোপ আর ভাইব্রেশন সেন্সর দিয়ে কাজটি করার। এরপর প্রশ্ন জাগে মনে, মেসেজ পাঠাবেন কিভাবে? দুর্ঘটনাটি ট্র্যাক বা শনাক্ত করার পর কাকে কাকে মেসেজ পাঠাতে হবে? এসব মাথায় রেখে পরিকল্পনাও শুরু হয়। বানানো হলো ডায়াগ্রাম।

প্রজেক্টটির দলনেতা রিদোয়ান শিহাব বললেন, ‘সবার আগে খোঁজ নিয়েছি এই জিনিসটি নিয়ে আগে কোনো কাজ হয়েছে কি না। খোঁজখবর নিয়ে জানতে পারলাম, এটা নিয়ে সরাসরি কোনো কাজ হয়নি। দুর্ঘটনা ঘটার আগে সতর্কতামূলক সাবধানতা নিয়ে কিছু হয়েছে। যেমন—চালক ঘুমিয়ে যাচ্ছেন, তাঁকে সতর্ক করা বা চালক মাদকাসক্ত, তখন গাড়ি স্টার্ট হবে না, কিংবা চালক হেলমেট পরেননি। কিন্তু দুর্ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে উদ্ধার করার সিস্টেম নিয়ে কোথাও কোনো কাজ হয়নি।

তখন কোর্স টিচার মোতাহারুল ইসলাম স্যারের সঙ্গেও কথা বলি। তাঁকে জানাই যে আমরা এটা বানাতে চাই। উনিও সায় দিলেন।’

 

বেগ পোহাতে হয়েছিল

কাজ শুরু করার পর বিভিন্ন সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। শুরুতে কাজ করছিল না ‘সিম৮০৮’, যা দিয়ে টেক্সট পাঠানো হবে। অনেক সময় জিপিএস মডিউলও কাজ করছিল না। এগুলোর সফটওয়্যার সংস্করণের আপডেট দিতে হয়েছে। বাছাই করতে হয়েছে, কোন জিনিসটি নিলে সবচেয়ে ভালো কাজ হবে। সিম৮০৮, মডিউল আর ডাটাশিট নিয়েও পড়াশোনা করতে হয়েছে। এরপর নির্দিষ্ট ডায়াগ্রায় অনুযায়ী প্রজেক্ট বানানো শুরু হয়।

খুদে বার্তা যাবে হাসপাতাল পুলিশ স্টেশনে

স্বাভাবিক রাস্তায় যেসব মোটরসাইকেল চলে, সেসব ৪৫ ডিগ্রির বেশি টার্ন বা বাঁক নেয় না। স্পোর্টস বাইকের ক্ষেত্রে অবশ্য অন্য কথা। সেটির জন্য কোডের আরেকটু পরিবর্তন করতে হবে তাঁদের। তাঁরা কোডিংটা এমনভাবে করেছিলেন যে বাইকটি ৪৫ ডিগ্রির বেশি টার্ন নিলে এবং ভাইব্রেশন মাত্রা যদি সাধারণের চেয়ে অনেক বেড়ে যায় তখন এই দুটি বিষয় সমন্বয় করে বুঝবে যে এখানে একটি দুর্ঘটনা ঘটেছে।

‘বাইক অ্যাকসিডেন্ট ডিটেকশন অ্যান্ড রেমিডি’ ডিভাইসটি সিম৮০৮ মডিউলের সাহায্যে কোডের মধ্যে ডাটাগুলো কয়েকটি ভাগে ভাগ করে নেবে।

মোটরসাইকেলের দুর্ঘটনা শনাক্ত করার সঙ্গে সঙ্গে আশপাশের হাসপাতাল ও পুলিশ স্টেশনে খুদে বার্তা যাবে। ‘সিম৮০৮’-এর মধ্যে সিম থাকবে আর ওই সিমের নম্বর থেকেই মেসেজ যাবে।

প্রজেক্টটির আরেক ডিজাইনার সোহাগ রানা জানান, সব হাসপাতাল ও পুলিশ স্টেশনের ফোন নম্বরগুলো ডিভাইসে ডিফল্ট হিসেবেই থাকবে। অর্থাৎ দুর্ঘটনা ঘটলে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই মেসেজ যাবে। চাইলে ব্যবহারকারী যদি কোনো নির্দিষ্ট হাসপাতালকে তাঁর দুর্ঘটনার খবর জানাতে চান সেটাও আগেই সেট করে দেওয়া যাবে।

 

বার্তা যাবে আপনজনের কাছেও

বাইকার তাঁর আপনজনদের নম্বর ডিভাইসে সেট করে রাখতে পারবেন। ফলে বাইক দুর্ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে আপনজনদের মোবাইলেও এসএমএস যাবে। ব্যবহারকারী যতগুলো নম্বর সংযুক্ত করতে চান সেট করে নিতে পারবেন। মেসেজে বাইক দুর্ঘটনার স্থানটির গুগল ম্যাপের লিংক থাকবে। লিংকে ক্লিক করলেই দুর্ঘটনাস্থল এবং আশপাশের এলাকা দেখতে পারবে বাইকারের স্বজনরা।

 

এসএমএস যাবে -১০ সেকেন্ড পর

অনেক সময় দেখা যায় দুর্ঘটনা ঘটেছে কিন্তু ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। কিন্তু সেই সময় যদি এই ডিভাইস থেকে মেসেজ চলে যায় তাহলে আরেক ঝামেলা হতে পারে। ধরুন পুলিশ স্টেশন থেকে লোক চলে এলো বা হাসপাতাল থেকে অ্যাম্বুল্যান্স চলে এলো। এই সমস্যা কাটিয়ে উঠার জন্য মেসেজ পাঠানোর ক্ষেত্রে পাঁচ-দশ সেকেন্ডের একটা বিরতি রাখা হবে। মোটরবাইক দুর্ঘটনা ঘটার পর পাঁচ-দশ সেকেন্ড পর্যন্ত অপেক্ষা করবে ডিভাইসটি। এর মধ্যে চালক যদি বন্ধ না করেন তখন ডিভাইস মেসেজ পাঠানো শুরু করে দেবে। বিলম্বের সময় ১০ সেকেন্ডের জায়গায় এক মিনিটও করা যাবে। এ ছাড়া যদি মোটরসাইকেলটি ভুলেও পড়ে যায় এবং চালক সঙ্গে সঙ্গে বাইকটি উঠিয়ে ফেলেন তাহলে কোনো এসএমএস যাবে না।

 

মোটরসাইকেলের নিরাপত্তা

প্রজেক্টটির দলনেতা রিদোয়ান শিহাব আরো বললেন, ‘আমাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হচ্ছে এই ডিভাইসটির জন্য একটি অ্যাপ তৈরি। অ্যাপে অতিরিক্ত ফিচার হিসেবে যুক্ত থাকবে মোটরবাইকের নিরাপত্তা। এই অ্যাপের সাহায্যে চুরি হওয়া বাইকটি কোথায় আছে জানা যাবে।’ শুধু তা-ই নয়, মালিক ছাড়া অন্য কেউ বাইকটি চালু করতে গেলেও সতর্কতামূলক মেসেজ পাঠাবে এই ডিভাইস।

 

ভবিষ্যৎ ভাবনা

ডিভাইসটি বাণিজ্যিকীকরণের সময় আকারে আরো ছোট হয়ে আসবে। তখন এটি প্রিন্টেড সার্কিট বোর্ডে করা হবে। বাটনগুলো ডিভাইসটির ওপরের অংশে থাকবে। এটি আলাদা একটি ডিভাইস, যা বাইকে লাগানো থাকবে কিন্তু বাইকের মূল ফাংশনে কোনো সমস্যা করবে না। ডিভাইসটি চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সংশ্লিষ্ট মোটরবাইক থেকেই সরবরাহ করা যাবে। চাইলে আলাদা ব্যাটারি দিয়েও ডিভাইসটি চালানো যাবে। 

ডিভাইসটির বাণিজ্যিকীকরণ হলে এটির দাম হতে পারে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা