kalerkantho

মঙ্গলবার । ৫ ফাল্গুন ১৪২৬ । ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৩ জমাদিউস সানি ১৪৪১

চাকরি খুঁজে দেয় জার্নিমেকার জবস

সিলেটভিত্তিক জব পোর্টাল ‘জার্নিমেকার জবস’। এতে অ্যাকাউন্ট খোলা বা চাকরি পাওয়ার জন্য চাকরিপ্রার্থীকে গুনতে হয় না অর্থকড়ি। ৪৫০টিরও বেশি চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠান যুক্ত আছে এই জব পোর্টালের সঙ্গে। নিজেদের কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৭ সালে তারা পেয়েছে বাংলাদেশে স্টার্টআপ অ্যাওয়ার্ড। জানাচ্ছেন সুমন্ত গুপ্ত

১৯ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



চাকরি খুঁজে দেয় জার্নিমেকার জবস

টিম জার্নিমেকার জবস

শুরুর কথা

 

২০০৭ সালে একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে চাকরির জন্য ইন্টারভিউ দেন প্রতীম পুরকায়স্থ। কয়েক দফা পরীক্ষা দেওয়ার পর শেষ দিকে বাদ পড়ে যান তিনি। পরে অবশ্য আরেকটা বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে চাকরি পেলেও সেটা তাঁর যোগ্যতা অনুযায়ী ছোটই ছিল। চার-পাঁচ বছর চাকরি করার পর তাঁর মনে হলো, শুধু একটু গ্রুমিং করা থাকলে বোধ হয় এসব প্রতিষ্ঠানের আরো ভালো পদে তিনি চাকরি করতে পারতেন। একই রকম চিন্তা ছিল তাঁরই বিশ্ববিদ্যালয় সহপাঠী শাহ মো. আলী হায়দারেরও। অবশেষে দুজন মিলে সিদ্ধান্ত নিলেন এ ব্যাপারে কিছু একটা করার। আর এই কাজে তাঁদের সঞ্চয় হলো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করার অভিজ্ঞতা।

 

শুরু হলো প্রশিক্ষণ দেওয়া

চাকরিপ্রার্থীদের ঘাটতিটা ঠিক কোথায় সেটা খুঁজে বের করতে চেয়েছিলেন জার্নিমেকারের প্রতীম পুরকায়স্থ ও শাহ মো. আলী হায়দার। আর এই কাজ করতে গিয়ে তাঁরা প্রথমেই খেয়াল করলেন, নিজের ওপর আস্থার অভাব থাকে প্রায় সব তরুণ-তরুণীর। এই সমস্যা দেশের আরো হাজারো চাকরিপ্রার্থী তরুণেরও। কিন্তু সিলেটের মতো ছোট জায়গায় এত কিছু নিয়ে ভাবার মানুষের কমতি ছিল। সে জন্য তখন তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন, নিজেরাই এমন কিছু একটা করবেন, যা চাকরিপ্রার্থীদের চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা হলেও কাজে লাগবে।

২০১৩ সালে শুরু হয় ‘জার্নিমেকার ট্রেনিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’। প্রতীম পুরকায়স্থ বলেন, ‘এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তরুণদের প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করি। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল যোগ্য চাকরিপ্রার্থীকে তাঁর যোগ্যতা দেখানোর পথটা বাতলে দেওয়া।’

সেই ধারাবাহিকতায় এখন পর্যন্ত ১৫০টিরও বেশি কর্মশালা পরিচালনা করেছেন, যা ছিল সমসাময়িক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে সাজানো। এসবের মধ্যে আছে ক্যারিয়ার প্ল্যান ম্যানেজমেন্ট, সিভি রাইটিং, ইন্টারভিউ টিপস, স্কেচ ইওর করপোরেট ক্যারিয়ার, ই-কমার্স, নতুন উদ্যোক্তা তৈরি ইত্যাদি। এসব প্রশিক্ষণের সহযোগী হিসেবে আছে সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি সিলেট, নর্থ ইস্ট ইউনিভার্সিটি সিলেট, লিডিং ইউনিভার্সিটি সিলেট, এমসি ইউনিভার্সিটি কলেজ সিলেট, সিলেট মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিসহ সিলেটের আরো বেশ কিছু প্রখ্যাত স্থানীয় প্রতিষ্ঠান।

চাকরিপ্রার্থীদের সাহায্য করতে করতে একপর্যায়ে চাকরিদাতাদের সঙ্গেও কাজ করার সিদ্ধান্ত নেয় জার্নিমেকার জবস। প্রতীম বলেন, “জার্নিমেকার বিজনেস কনসালট্যান্সির মাধ্যমে আমরা দ্বিতীয় ধাপে যাত্রা শুরু করি। এতে কাজ করতে গিয়ে নতুন একটা ব্যাপার উপলব্ধি করি, চাকরি পাওয়ার জন্য যুবসমাজ যেমন হিমশিম খাচ্ছে, তেমনি বড় ব্যবসায়ীরাও হিমশিম খাচ্ছেন নিজের প্রতিষ্ঠানের জন্য যোগ্য প্রার্থী বেছে নিতে। এই সমস্যার সমাধান হিসেবে আমরা ২০১৫ সালে ‘জার্নিমেকার জবস’ (www.journeymakerjobs.com) নামের সিলেটভিত্তিক জব সাইট শুরু করি। সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের ওয়েবসাইটে নিজের অ্যাকাউন্ট খোলা বা চাকরি পাওয়ার জন্য চাকরিপ্রার্থীকে গুনতে হয় না কোনো অঙ্কের টাকা। সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে চাকরিপ্রার্থীদের এই সেবা দেওয়া হয়ে থাকে।”

সহপাঠীর সঙ্গে শাহ মো. আলী হায়দার যোগ করে বলেন, ‘জার্নিমেকার জবস শুরু হয়েছিল খুবই ক্ষুদ্র এক পরিসর থেকে। কোনো রকম একটা ওয়েবসাইট আর তাতে সামান্য কিছু চাকরির ফিরিস্তি নিয়ে। মাত্র চার-পাঁচটি প্রতিষ্ঠান আর চাকরিপ্রার্থীর সিভি অ্যাকাউন্ট নিয়ে শুরু করা আমাদের ওয়েবসাইটটিতে এখন ১২ হাজারেরও বেশি চাকরিপ্রার্থীর অ্যাকাউন্ট আছে।’

 

কাজ করে যেভাবে

তাঁদের ওয়েবসাইটে জমা পড়া সব সিভি থেকে যোগ্যতা অনুযায়ী পছন্দসই কর্মীদের বেছে নিতে পারেন চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানের কর্তারা। অনেক সময় চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানের কষ্ট লাঘব করতে যোগ্য চাকরিপ্রার্থীর তালিকা করে কর্মী বেছে নিতে সাহায্য করে থাকে জার্নিমেকার জবসও। এই সেবার জন্য অবশ্য অর্থ নিয়ে থাকে তারা। সেটা পরিমাণে ৮৫০ টাকা। আর বাছাই না করে দিলে ফি হয় ৫৫০ টাকা। এই তালিকা যদি চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানের পছন্দ না হয়, তাহলে আবারও নতুন করে বাছাইপ্রক্রিয়া করে আরো একটি তালিকা দেয় জার্নিমেকার জবস। তবে সেটার জন্য কোনো চার্জ ধরা হয় না।

অনেক সময় দেখা যায় চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠান নিজেরা ইন্টারভিউ নিতে পারছে না। সে ক্ষেত্রেও জার্নিমেকার জবস চাকরিপ্রার্থীদের ইন্টারভিউ নিয়ে চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা সরবরাহ করে থাকে। সাধারণত ২০ থেকে ২৫ জনের ইন্টারভিউয়ের সময় এই সেবা দেওয়া হয়ে থাকে। এ জন্য অবশ্য বাড়তি অর্থ দিতে হয় চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানকে।

জার্নিমেকার জবস এখন ৪৫০টিরও বেশি চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করছে। এদের বেশির ভাগই সিলেটকেন্দ্রিক। সেসবের পাশাপাশি আছে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের আঞ্চলিক শাখাগুলোও। বেশিদিন হয়নি ঢাকায়ও নিজেদের কার্যক্রম শুরু করেছে জার্নিমেকার জবস। তবে সেখানে তারা কাজ করছে বাছাই করে। চাকরিপ্রার্থীকে বিনা পয়সায় কাউন্সেলিং সেবাও দিয়ে থাকে জার্নিমেকার জবস। প্রতীম পুরকায়স্থ বলেন, ‘পুরো বাংলাদেশের কথা জানি না; কিন্তু আমাদের এই কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, সিলেটের বেকারত্বের পেছনে রয়েছে এখানকার তরুণদের নাক উঁচু ভাব। এই চাকরি করব, ওই চাকরি করব না—এসব ভাবনা-চিন্তা থেকে অনেকেই স্বেচ্ছায় বেকার থাকছেন। আমরা মনে করি, এই ধরনের তরুণদের যদি যথাযথভাবে কাউন্সেলিং করা হয়, তাহলে বেকারত্বের হার অনেকটাই কমে যাবে।’

 

চাকরি মেলে অ্যাপে

যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চাকরিদাতা এবং চাকরিপ্রার্থীদের সুবিধা চিন্তা করে ২০১৮ সালের ২২ নভেম্বর জার্নিমেকার চালু করেছে জার্নিমেকার জবসের মোবাইল অ্যাপ। এই মোবাইল অ্যাপের সাহায্যে খুব সহজে এবং দ্রুততার সঙ্গে চাকরিদাতা ও চাকরিপ্রার্থী নিজেদের কাজ সম্পাদন করতে পারবেন।

গুগল প্লেস্টোর থেকে ৫.৭ মেগাবাইটের অ্যাপটি বিনা মূল্যে ডাউনলোড করা যাবে। ডাউনলোড সম্পন্ন হলে সাইন-আপে অপশনটিতে ক্লিক করুন। একটি অ্যাকাউন্ট ফরম দেখাবে, ফরমটিতে আপনার ব্যক্তিগত তথ্য, শিক্ষাগত যোগ্যতা, চাকরির অভিজ্ঞতা এবং লগ ইন তথ্যগুলো দিয়ে আপনার অ্যাকাউন্টটি সম্পূর্ণ করুন। এরপর আপনার অ্যাকাউন্টটি লগ ইন করুন এবং রিসেন্ট জব অপশনটিতে ক্লিক করার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের চাকরি সম্পর্কে তথ্য পাবেন। সেখানে আপনার পছন্দের চাকরিগুলোতে অ্যাপ্লাই বাটনে ক্লিক করে সহজে আবেদন করতে পারবেন।

‘সেভড জবস’ অপশনে আপনার পছন্দের চাকরিগুলো সেভ করে রাখতে পারবেন। প্রয়োজনমতো আপনার প্রফাইল সম্পাদনা, ছবি সংযোজনও করতে পারবেন।

অ্যাপটির ডাউনলোড লিংক : https://urlzs.com/sp26B

 

আছে প্রাপ্তিও

জার্নিমেকার জবসের পথ চলাটা অল্পদিনের হলেও ২০১৭ সালে অর্জনের খাতায় এসে যুক্ত হয় বাংলাদেশ স্টার্টআপ অ্যাওয়ার্ড। সিলেট বিভাগে সেরা হয়েছে তারা। আর ২০১৮ সালে বাংলাদেশ স্টার্টআপের আইডিয়া প্রজেক্টেও অন্তর্ভুক্ত হয় তারা। ফলে এখন বিনা পয়সায় ‘বাংলাদেশ স্টারআপ’-এর অফিসে নিজের জন্য জায়গা পাচ্ছে জার্নিমেকার জবস। ছয়জন কর্মকর্তা এবং ১০ জন ক্যাম্পাস অ্যাম্বাসাডর নিয়ে জার্নিমেকার এখন ১৬ জনের পরিবার। সিলেটের সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ১০ জন ছাত্র জার্নিমেকার জবসের দূত হিসেবে কাজ করেন। তাঁরা নিজ নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সহপাঠীদের কাছে জার্নিমেকার জবসে আবেদন করা চাকরিগুলোর তথ্য পৌঁছে দেন। আবার আগ্রহী শিক্ষার্থীদের তথ্য জার্নিমেকার জবসের কাছেও পৌঁছে দেন।

 

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

সিলেটভিত্তিক হলেও এখন জার্নিমেকার জবস তাদের স্বপ্নটা বড় করেছে। পুরো বাংলাদেশে নিজেদের কার্যক্রম ছড়িয়ে দিতে যাচ্ছে। এ জন্য বেশ কয়েক মাস ধরেই তারা কাজ করে যাচ্ছে। ‘বাংলাদেশ স্টারআপ’-এর বরাদ্দ করা জায়গায় নিজেদের অফিস গোছানোর কাজ চলছে। কিছুদিনের মধ্যে সেখানে পুরোদমে কাজ শুরু হয়ে যাবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা