kalerkantho

বুধবার । ২৯ জানুয়ারি ২০২০। ১৫ মাঘ ১৪২৬। ৩ জমাদিউস সানি ১৪৪১     

ফেলনা প্লাস্টিকের বিদেশযাত্রা

পরিত্যক্ত প্লাস্টিকের বোতল রিসাইকল করে বানাচ্ছেন পেট স্ট্রেপ। অন্যদিকে প্লাস্টিকের বোতলগুলো সংগ্রহ করে পিট ফ্ল্যাক্স করে রপ্তানি করছেন বিদেশে। শতভাগ রপ্তানিমুখী এই শিল্পের উদ্যোক্তা হাবিবুর রহমান জুয়েল। বিস্তারিত লিখেছেন অনয় আহম্মেদ

৮ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ফেলনা প্লাস্টিকের বিদেশযাত্রা

নিজের কারখানায় হাবিবুর রহমান জুয়েল

লেখলেখির প্রতি ঝোঁক ছিল ছোটবেলা থেকেই। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকার সময় সাহিত্য নিয়েই থাকতেন বেশি। শরৎচন্দ্র তাঁর প্রিয় লেখক। কাজ করেছেন একটি জাতীয় দৈনিকের ফিচার বিভাগে। বই লিখেছেন সাতটি। এখনো সুযোগ পেলে পড়তে বসে যান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করেছেন হাবিবুর রহমান জুয়েল। যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন, তখন থেকেই উদ্যোক্তা হওয়ার ইচ্ছা ছিল। প্লাস্টিক পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। রিসাইকল বা পুনর্ব্যবহারযোগ্য করে পুনরায় পণ্য তৈরি করে বিদেশে রপ্তানি করলে একদিকে যেমন বৈদেশিক মুদ্র আসবে, অন্যদিকে তা পরিবেশের জন্যও ভালো। সেই ধারণা থেকেই শুরু করেন প্লাস্টিক রিসাইকল ব্যবসা।

 

শুরুর কথা

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করার পর চিন্তা করলেন, চাকরি না করে ভিন্ন কিছু করবেন। উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে তৈরি করবেন। সেখান থেকেই ব্যবসার বিভিন্ন আইডিয়া খুঁজছিলেন তিনি। পুরান ঢাকায় ঘোরাঘুরির ফলে একটা সময় দেখলেন, প্লাস্টিক বোতলের রিসাইকলিং হচ্ছে পুরান ঢাকায়। তিনিও সেই আইডিয়া থেকে ২০১১ সালে এই ব্যবসা শুরু করেন। ২০১১ সালের শেষের দিকে ভাটারার সোলমাইদ এলাকায় একটি কারখানা দেন। নাম ‘মুনলাইট পেট ফ্ল্যাক্স ইন্ডাস্ট্রি’। জুয়েল ধীরে ধীরে স্থানীয় (ভাটারা, বাড্ডা, কুড়িল, কড়াইল বস্তি) ভাঙ্গারিওয়ালাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে থাকেন। তাদের থেকে বোতল সংগ্রহ করে রিসাইকলিং শুরু করেন। শুরুর দিকে তাঁর মূলধন ছিল সব কিছু মিলিয়ে ৫০ লাখ টাকা।

বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া একজন হিসেবে ভাঙ্গারিওয়ালাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা খুব কষ্টকর হয়ে যাচ্ছিল। ধীরে ধীরে তাদের সঙ্গেও সম্পর্ক স্থাপিত হয়। ‘দোকানে গিয়ে গিয়ে কথা বলেছি, গল্প করছি। এতে একটা সম্পর্ক তৈরি হয়। তবে শুরুতে অনেকেই ভাবত যে এই ছেলে ব্যবসা করতে আসছে, ও তো বাজারে বেশিদিন টিকবে না। এটা চিন্তা করে তারা আমার কারখানায় মাল সরবরাহ দিত না। তাদের ভরসা দিলাম এবং আস্থা অর্জন করলাম’, জুয়েল বললেন।

 

ভ্যান ঠেলেছি

কারখানার সামনের রাস্তা খারাপ ছিল। নিজে ভ্যান ঠেলে ঠেলে ইনডোর থেকে মাল (প্লাস্টিকের দুমড়ানো বোতল) নিয়ে আসতেন। তারপর পেট ফ্ল্যাক্স তৈরি করতে শুরু করেন। প্রথমে দু-তিন মাস স্থানীয় রপ্তানিকারকদের কাছে বিক্রি শুরু করেন। ২০১২ সালে নিজেই সরাসরি রপ্তানি শুরু করলেন। সরাসরি চীনের বাজারে রপ্তানি করেন। যখন ব্যবসা বড় হতে থাকে, তখন নতুনবাজারের সাইদনগরে আরেকটি কারখানা শুরু করেন। পরিবেশ ইস্যু দেখিয়ে ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে এসে চীন পেট ফ্ল্যাক্স আমদানি বন্ধ করে দেয়। তারপর ভারতে গিয়ে সেখানে রপ্তানির ব্যবস্থা করলেন। ২০১৭ সালে ভারতে পেট ফ্ল্যাক্স রপ্তানি শুরু করেন। তাঁর সহযোগিতায় আরো কয়েকজন পেট ফ্ল্যাক্স উৎপাদনকারী পেট ফ্ল্যাক্স রপ্তানি করে। ২০১৭ সালে তাঁর এক পুরনো চীনা বন্ধু (যাঁর কাছে পেট ফ্ল্যাক্স রপ্তানি করেছেন)  বললেন, ‘আমরা ফ্ল্যাক্স এনে এখানে পেট স্ট্রেপ তৈরি করতাম। তোমাকে যদি প্রযুক্তিটা দিই তুমি কি সেটা বাংলাদেশে করতে পারবে? জুয়েল কোনো কিছু চিন্তা না করেই বলে দিলেন, ‘হ্যাঁ, পারব।’ এরপর তাঁর সেই চীনা বন্ধু মিলে আলাদা একটা কম্পানি দিলেন। ‘আমি বংলাদেশ থেকে বানিয়ে দেব আর সে ওখানে বিক্রি করবে। তারপর সে বাংলাদেশে আসে। ১৪ দিন বাংলাদেশে ছিল। আমরা এই প্রজেক্ট নিয়ে বিভিন্ন পরিকল্পনা করি।’

 

পেট ফ্ল্যাক্স ও পেট স্ট্রেপ কী

বোতলগুলোকে যখন ক্রাশিং বা টুকরা টুকরা করা হয় তখন বলা হয় ‘পেট ফ্ল্যাক্স’। এই ফ্ল্যাক্স দিয়ে পলিয়েস্টার ফাইবার তৈরি হয়। আর এই ফাইবার থেকে সিনথেটিক সুতা তৈরি হয়, যা কাপড় তৈরিতে টেক্সটাইলে ব্যবহৃত হয়। আর পেট স্ট্রেপ হলো প্লাস্টিক বোতল রিসাইকল করে তৈরি করা বাঁধার প্লাস্টিক ফিতা।

 

কিভাবে বানায়

পেট ফ্ল্যাক্স তৈরির জন্য দেশীয় যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে থাকেন জুয়েল। এর মধ্যে রয়েছে ক্রাশিং মেশিন, ওয়াশিং মেশিন, ড্রাই মেশিন, ওয়েট মেশিন। এসব মেশিন রাজধানীর ধোলাইখাল থেকে বানানো। পুরো কারখানার যন্ত্রপাতির মধ্যে শুধু একটি ড্রাই মেশিন চীন থেকে আমদানি করে এনেছেন। ক্রাশিং মেশিন দিয়ে দুমড়ানো বোতলগুলো কুচি কুচি করা হয়। আর ওয়াশিং মেশিন দিয়ে সেসব পরিষ্কার করা হয়। পরে ড্রাই মেশিন দিয়ে সেসব শুকিয়ে নেওয়া হয়। কেউ যদি অটোমেটিক ফ্যাক্টরি করতে চায়, তাহলে পুরো পেট প্রজেক্টের লাইন আনলে ৭০-৮০ লাখ টাকা দরকার। আর দেশি মেশিনারিজ ব্যবহার করলে ছয়-সাত লাখ টাকায় সেসব হয়ে যায়। ওয়াশ দুই রকমের হয়। হট ওয়াশ অ্যান্ড কোল্ড ওয়াশ। তাঁরা কোল্ড ওয়াশ পদ্ধতি ব্যবহার করে থাকেন। বোতল সংগ্রহ করার পর পেট ফ্ল্যাক্স তৈরি করেন। ওখান থেকে তিনটি রঙের ফ্ল্যাক্স হয়—সাদা, সবুজ ও বাদামি। টাইগার, স্পিডের বোতলগুলো বাদামি, আর সেভেন আপের বোতলগুলো সবুজ। সবুজ ফ্ল্যাক্স দিয়ে পেট স্ট্রেপ তৈরি করা হয়। পেট ফ্ল্যাক্স তেরি হওয়ার পর সোনারগাঁ প্রজেক্টে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে হট ওয়াশিং লাইনে প্রথমে হট ওয়াশ করা হয়। হট ওয়াশের পর পেট স্ট্রেপের লাইনের সাহায্যে ইনজেকশন মল্ডিংয়ের মাধ্যমে গলে ফিতা হয়ে বের হয়। এভাবেই পেট স্ট্রেপ তৈরি করা হয়। এসব প্যাকেজিংয়ের কাজে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। ব্রিক, টাইলস, উড, ভারী যন্ত্রপাতি প্যাকিং, গার্মেন্টের কার্টন প্যাকিংয়ে ব্যবহার করা হয়। জুয়েল বলেন, ‘বাংলাদেশের মার্কেটে খুব একটা চাহিদা নেই। এটার মূল বাজার বিদেশের বাজার। বাংলাদেশের মার্কেটে হয়তো ১৫-২০ টন প্রডাক্ট এক মাসে সেল হতে পারে। কিন্তু আমার কারখানার উৎপাদনক্ষমতা মাসে ৪০০  মেট্রিক টন।’

 

কারখানা এখন তিনটি

এলসির মাধ্যমে চীন পেট স্ট্রেপ ম্যানুফ্যাকচারিং মেশিন আনলেন জুয়েল। প্রথমে দুটি পেট স্ট্রেপ ম্যানুফ্যাকচারিং লাইন আনেন।  নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয় জমি কিনে মেশিন বসিয়ে কারখানার কার্যক্রম শুরু করেন। এ বছর আরো একটি পেট স্ট্রেপ ম্যানুফ্যাকচারিং লাইন যুক্ত করেছেন। সেই কারখানার দেখভালের জন্য আছেন একজন চীনা ম্যানেজার। আরো আছেন এক চীনা টেকনিশিয়ানও। পাশাপাশি বাংলাদেশি প্রকৌশলীরাও এখানে কাজ করছেন।  প্রতি মাসে পেট স্ট্রেপ প্রায় তিন কোটি টাকা আর পেট ফ্ল্যাক্স মাসে প্রায় এক কোটি টাকার রপ্তানি হচ্ছে। পেট ফ্ল্যাক্স রপ্তানিতে ভারতের পাশপাশি ভিয়েতনামের সঙ্গে চুক্তি হচ্ছে। তারা পেট ফ্ল্যাক্স ও পেট স্ট্রেপ দুটোই নেবে। জুয়েলের প্রতিষ্ঠানে এখন ২০০ লোক কাজ করছেন।

 

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জুয়েল জানান, তিনি রিসাইকল ব্যবসায় থাকতে চান। এখন পেট অর্থাৎ একটা আইটেম নিয়ে কাজ করছেন। তিনি বলেন, ‘এই বোতলগুলো নদীনালা-ড্রেনে পড়ে থাকত। এগুলো সংগ্রহ করে হাজার হাজার মেট্রিক টন রপ্তানি করেছি। বোতল রিসাইকল করে অন্যান্য প্লাস্টিক পণ্য তৈরি করা সম্ভব, যেটা দেশি বাজারেও চলবে এবং রপ্তানি করাও সম্ভব। এ ছাড়া এডিপি, এইচডিপি, এলএলডিপি, পিভিসি, পিপি, পিএস—এ রকম আরো বেশ কিছু প্লাস্টিক রয়েছে। ভবিষ্যতে ইচ্ছা আছে বড় একটা এলাকা নিয়ে প্লাস্টিক রিসাইকল জোন তৈরি করার, যেখানে সব ধরনের প্লাস্টিককে রিসাইকলযোগ্য করে নানা রকম পণ্য তৈরি করা হবে।’ রাস্তাঘাটে অনেক ধরনের প্লাস্টিক পড়ে থাকে। সেগুলো কিভাবে ব্যবহার করা যায় সে পরিকল্পনাও করছেন তিনি।

 

নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য পরামর্শ

নতুন উদ্যোক্তাদের কোনো ফি ছাড়াই বিনা মূল্যে পরামর্শ দিয়ে থাকেন। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এলে তিনি পরামর্শ দেন। নতুন ব্যবসা শুরু করতে চাইলে করণীয় কী, কেন ব্যবসা করবেন, কী কী ঝুঁকি আছে— এসব নিয়ে পরামর্শ দেন। জুয়েল বলেন, ‘নতুনদের প্রথমে মাইন্ড সেটআপ করতে হবে। তারপর আইডিয়া বাছাই করতে হবে। এরপর বিভিন্ন স্টাডি বা গবেষণা করতে হবে। এরপর শুরু করে ছোট ছোট বিনিয়োগে এগিয়ে যেতে হবে। ঝুঁকি নিতে হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংক ঋণগুলো সহজ করে দিলে নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে। জামানত ছাড়া প্রজেক্ট দেখে লোন দিলে তখন ফলপ্রসূ হবে। পাশাপাশি সহজেই তরুণ উদ্যোক্তাদের লাইসেন্স প্রদান করলে ভালো হবে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা