kalerkantho

সোমবার। ২৭ জানুয়ারি ২০২০। ১৩ মাঘ ১৪২৬। ৩০ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

লিপির ডিজিটাল রসিদ

বেচাকেনায় হাতে লেখা রসিদের ব্যবহার কমছে দিন দিন। অনেক প্রতিষ্ঠান এখন রসিদ প্রিন্ট করেই দিয়ে থাকে। এই কাজের জন্য প্রয়োজন হয় একটা কম্পিউটার, পিওএস সফটওয়্যার, প্রিন্টার আর অনেক কাগজ। এসব ঝামেলা থেকে মুক্তি দিতে আছে ‘লিপি লাইট’ অ্যাপ। জানাচ্ছেন জুবায়ের আহম্মেদ

৮ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



লিপির ডিজিটাল রসিদ

মডেল : রোজা, আলোকচিত্র : মোহাম্মাদ আসাদ

কলেজজীবন থেকেই বন্ধু মুজতাবা নওশাদ ও সায়েম শাফায়েত। পড়াশোনা করেছেন আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের (এআইইউবি) কম্পিউটার প্রকৌশল বিভাগে। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ার সময় থেকেই ফ্রিল্যান্সিং করেছেন। ২০১৪ সালে স্নাতক করে বের হওয়ার পর সায়েম শাফায়েত কাজ নেন এক কানাডিয়ান প্রতিষ্ঠানে। অন্যদিকে বন্ধু মুজতাবা নওশাদ কাজ করেছেন চীনের এক প্রতিষ্ঠান আর জার্মানিতে। ২০১৭ সালে এসে দুই বন্ধু মিলে প্রতিষ্ঠা করেন এনভিল গ্লোবাল ডায়নামিকস লিমিটেড। এই প্রতিষ্ঠান থেকেই তৈরি করেন লিপি সফটওয়্যার।

 

শুরুতে লিপি ফর বিজনেস

লিপি হচ্ছে এন্টারপ্রাইজ সলিউশন। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে শুরু করেন লিপি অ্যাপ। কিছুদিনের চাকরির অভিজ্ঞতা থেকে দুই বন্ধু খেয়াল করলেন, ‘আমাদের দেশের ব্যবসায় সিআরএম, এইচআরএম, কাস্টমার রিলেশনশিপ, রিপোর্ট সিস্টেম—এই সেবাগুলো ব্যবহার করে বড় বড় কম্পানি। তাদের চার-পাঁচটা সফটওয়্যার কেনা এবং চালানোর ক্ষমতা আছে। কিন্তু মাঝারি বা ছোট এন্টারপ্রাইজের কাছে কোনো সফটওয়্যার নেই। তারা হয়তো মূল্য পরিশোধের জন্য বিকাশ বা অন্যান্য অ্যাপ ব্যবহার করে। তাই দুই বন্ধুর মূল লক্ষ্য ছিল এই সংশ্লিষ্ট প্রয়োজনীয় সফটওয়্যারগুলো একত্র করে একটি সফটওয়্যার বানাবেন, যা এন্টারপ্রাইজের সব সলিউশন দেবে। ছোট বা মাঝারি ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠান মাসিক, ষাণ্মাসিক ভিত্তিতে তাঁদের সেবা গ্রহণ করতে পারবে। অর্থাৎ সফটওয়্যার ভাড়া নিতে পারবে। সব সেবা এক সফটওয়্যারেই পাওয়া যাবে। সার্ভিসটি সহজ করার জন্য ওয়েব সিস্টেম ব্যবহার করেছেন এবং খরচ কমিয়ে এনেছেন। ইউজার ইন্টারফেসটাও সাজানো হয়েছে সুন্দর করে।

 

লিপি লাইট

২০১৯ সালের জানুয়ারিতে এসে মুজতাবা ও সায়েম মনে করলেন, তাঁদের আরো গতিশীল হতে হবে। তাঁদের আরেকটি আইডিয়া ছিল—‘ডিজিটাল রিসিট’ বা ডিজিটাল রসিদের। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের নিজেদের রসিদ প্রিন্ট করার জন্য প্রিন্টার লাগে। দাম পড়ে যায় ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা। তারপর আছে কালির খরচ। সফটওয়্যার কেনার খরচ তো থাকছেই। কিভাবে এই খরচ কমিয়ে আনা যায় ওই চিন্তা থেকেই ডিজিটাল রসিদ অ্যাপ ‘লিপি লাইট’। একটা ছোট দোকান চালানোর জন্য যেসব প্রয়োজনীয় ফিচার লাগে সেসবের একটা মৌলিক সংস্করণ হচ্ছে এই লিপি লাইট।

 

ফ্রি অ্যাপ

লিপি লাইট অ্যাপ একদম ফ্রি। যে কেউই তাঁর অ্যানড্রয়েড ফোন থেকে গুগল প্লেস্টোর এই লিংক https://urlzs.com/hP25U থেকে ডাউনলোড করতে পারবেন।

ডাউনলোড হলে অ্যাপ চালু করার পর নিবন্ধনের জন্য নিজের প্রতিষ্ঠানের নাম, ব্যবহারকারীর নিজের নাম, ফোন নম্বর এবং একটা পাসওয়ার্ড দিয়ে রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করতে হবে। অ্যাপটির উদ্ভাবক মুজতাবা নওশাদ বলেন, ‘লিপি লাইট অ্যাপকে বিনা মূল্যের করার একটা উদ্দেশ্য হলো, আমরা চেয়েছি প্রযুক্তি ব্যবহার করার ক্ষেত্রে অর্থ যেন বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে পুরো মাসের অ্যাপের খরচ হবে ১৫ থেকে ২০ টাকা। দেখা যায়, বান্ডল এসএমএস কিনলে ১৫-২০ টাকায় ৫০০ এসএমএস পেয়ে যাবেন। আবার অনেকে ডাটা কিনেও বিনা মূল্যে এসএমএস পেয়ে থাকেন। অর্থাৎ নামমাত্র খরচেই ডিজিটাল রসিদের কাজ হয়ে যাবে। সেই ব্যবসায়ী যদি রসিদ কিনতেন বা প্রিন্ট করে দিতেন, তাহলে এর চেয়ে কয়েক গুণ বেশি অর্থ খরচ হতো।’

 

ডাটা ইনপুট

লিপি লাইট অ্যাপে সময় ব্যয় করে আগে থেকেই ডাটা ইনপুট দিতে হবে না। কোনো পণ্য বিক্রি করার সময় পণ্যের দাম, পরিমাণ, ভ্যাট, সার্ভিস চার্জ, ডিসকাউন্ট ইত্যাদি তথ্য দিয়ে কাস্টমারের নম্বর দিলেই ডিজিটাল রিসিট চলে যাবে। গ্রাহক বা দোকানদার নিজের ফোন থেকেই সরাসরি রসিদ পাঠাতে পারবেন।

 

রসিদ যাবে ই-মেইল আর এসএমএসে

অ্যাপে সব তথ্য দিয়ে ক্রেতার ফোন নম্বর দিলেই ক্রেতার মোবাইল ফোনে এসএমএস কিংবা ই-মেইলে একটি লিংক যাবে। সেই লিংকে ক্লিক করলেই ক্রেতা পেয়ে যাবেন তাঁর রসিদটি। ক্রেতার ইনবক্সে চলে যাবে রসিদটি কে পাঠিয়েছেন, কোথা থেকে পাঠিয়েছেন—এসব তথ্যও। এসএমএস থেকে ই-মেইলে সুবিধা বেশি। কাস্টমারের মেইলে যত দোকান থেকে যত রসিদ আসবে সব ‘লিপি ফর বিজনেস’ অংশে জমা থাকবে। তাই সেসব হারানোর ভয় নেই।

 

বাঁচবে খরচ, পরিবেশও নিরাপদ

আমাদের কাগজ বর্জ্য ২৬ শতাংশ। অন্যদিকে কাগজ উৎপাদনে মোট বিদ্যুত্শক্তির ৪ শতাংশ শক্তি ব্যয় হচ্ছে। আবার বনায়নও কমে যাচ্ছে। কারণ ২০-৪০ শতাংশ বনের গাছ কাটা হয় পেপার উৎপাদনের কাঁচামালের জন্য। লিপি লাইট ব্যবহারে কাগজের রসিদের মতো কাগজ লাগবে না। আবার হাতে লিখেও দিতে হবে না। ফলে খরচ যাবে কমে; পরিবেশও বাঁচবে। এ ছাড়া এক প্রতিষ্ঠানের কাগজের রসিদ অন্য কেউ বানিয়ে প্রতারণা করতে পারে। কিন্তু ডিজিটাল রসিদের সেই সুযোগ নেই।

 

বাঁ থেকে মুজতাবা নওশাদ ও সায়েম শাফায়েত

সংরক্ষিত থাকবে ক্রেতার তথ্য

তাঁরা আরো বলেন, ‘অ্যাপটি ব্যবহারের ফলে ব্যবসায়ীদের কাছে ক্রেতাদের তথ্য থেকে যাবে। একই ক্রেতা তাঁর দোকান থেকে কী কী পণ্য এবং কবে কবে কিনেছেন সে ডাটাও দেখতে পারবেন। বর্তমানে দেখা যায়, বড় কোনো দোকান না হলে ক্রেতাদের তথ্য ওভাবে সংরক্ষণ করা হয় না। ধরুন, আপনি এক অফারে কাপড় কিনলেন, আবার একটা সময়ে নতুন অফার দিল। যদি বড় প্রতিষ্ঠান না হয়, তাহলে ক্রেতাকে অফার সম্পর্কে সেভাবে জানানো হয় না। যদি দোকানদার তাঁর অফার, পণ্য সম্পর্কে আপডেট জানাতে পারে, তাহলে ক্রেতাকে তাঁর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের প্রতি আগ্রহী রাখতে পারবেন। কিন্তু ছোট এন্টারপ্রাইজের ক্ষেত্রে তা সম্ভব হয় না। আমাদের অ্যাপে এমন ব্যবস্থা রেখেছি, যখন দোকানদার ক্রেতাকে রসিদ এসএমএস করেন তখন তাঁর কাছে নম্বর থেকে যায়। পরে সে অফার সম্পর্কে ক্রেতাকে জানাতে পারবেন। এতে তাঁর ব্যবসার সামগ্রিক মুনাফা বাড়ে।’

 

বিক্রয় প্রতিবেদন

ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সেলস রিপোর্ট বা বিক্রয় প্রতিবেদন অ্যাপের মাধ্যমে দোকানদার যেকোনো সময় দেখতে পারবেন। এখন দেখা যায়, বেশির ভাগ ছোট দোকানের বিক্রয় প্রতিবেদন হাতে হাতে করতে হয়। রেজিস্ট্রেশন বই নিয়ে বসে বসে হিসাব করে বের করতে হয়। কিন্তু অ্যাপটি ব্যবহারের ফলে তিনি সহজেই সব রিপোর্ট দেখতে পাবেন। এটা তাঁর ব্যাবসায়িক বিচার-বিশ্লেষণে সাহায্য করবে। কখন কোন পণ্য বেশি চলে, সর্বোচ্চ বিক্রয় পণ্য, বেস্ট সেলিং প্রডাক্টস সহজেই দেখতে পারবেন। তাঁদের আশপাশে কোন পণ্য বেশি চলে সেটাও দেখা যাবে। আমাদের দেশে দেখা যায় এক ব্যবসায়ী এক এলাকায় ১৫ বছর ধরে ব্যবসা করেন; কিন্তু তাঁর আশপাশে কোন পণ্যগুলো বেশি চলছে সেটা জানেন না। এটা জেনেই তিনি পণ্যের চাহিদা বুঝতে পারবেন।

 

সাড়া মিলছে কেমন

লিপি লাইট এক মাসের মধ্যে ডাউনলোড হয়েছে ১০ হাজারের ওপরে। নিবন্ধনকৃত ব্যবহারকারী বা এন্টারপ্রাইজের সংখ্যা সাত হাজারের কাছাকাছি। যাদের ব্যবসা একটু ধীরগতির, যেমন—সিরামিক, হোম ডেকর, মোবাইল ফোন, কিচেন ওয়্যার, কসমেটিকস—এদের মধ্যে সাড়া বেশি। ভবিষ্যতে নতুন নতুন ফিচার যুক্ত করা হবে এই অ্যাপে।

 

ডাটা নিরাপত্তা

শুরু থেকে ডাটা নিরাপত্তার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছেন তাঁরা। স্থানীয়ভাবে সার্ভার ব্যবস্থাপনা করলে খরচ কম হয়, লাভ বেশি। কিন্তু তখন ডাটা সিকিউরিটি বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়ায়। তাঁদের পুরো সিস্টেমটা গুগল ক্লাউডে রাখা। পুরো ডাটা হংকংয়ে থাকে এবং ব্যাকআপ থাকে চেন্নাইয়ে। এভাবেই স্ট্রাকচার করা যে ডাটা ফোন থেকেই এনক্রিপ্ট হয়ে বের হবে। মাঝখানে কেউ দেখতে পারবে না যে কী ডাটা আদান-প্রদান করা হচ্ছে। ফোন থেকে সার্ভার এবং সার্ভার থেকে ফোনে ডাটা ট্রান্সফার। ভবিষ্যতে তাঁদের ইচ্ছা সার্ভিসভিত্তিক বিজনেসের (যেমন জিম, পারলার) জন্য অ্যাপের সেবা দেওয়া। 

 

সরাসরি রিভিউ

অ্যাপটির আরেক উদ্ভাবক মুজতাবা নওশাদ বলেন, ‘গতানুগতিকভাবে অ্যাপে সাহায্য চাইলে সাধারণত পাওয়া যায় না। লম্বা ই-মেইল লিখতে হয়। আমাদের অ্যাপে ফোন নম্বর দেওয়া আছে এবং ফোনটি অ্যাপের একজন উদ্ভাবকের কাছেই থাকে। ফলে গ্রাহকের রিভিউ আমরা সরাসরি পেয়ে থাকি। গ্রাহক ই-মেইল কিংবা ফোন দুইভাবেই তাঁদের রিভিউ দিতে পারবেন। এর মধ্যে আমরা প্রচুর পরিমাণে ই-মেইল পাচ্ছি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা